–কি হলো আম্মা?
–খেতে মন লাগে না রে।
বুড়ি ভাত নাড়াচাড়া করে। রইস গপগপিয়ে খায়। ওর পেটে ভীষণ ক্ষিদে। বুড়ি ওর দিকে চেয়ে থাকে।
সন্ধ্যায় সলীম কলীম ফিরে আসে। দুজনের মুখ শুকনো। সারাদিন কিছু খায়নি।
–কোথায় ছিলি তোরা?
–মিটিং শুনতে গিয়েছিলাম।
সলীমের সংক্ষিপ্ত উত্তর। বুড়ি দুজনকে ভাত বেড়ে দেয়। খেয়েদেয়ে বারান্দায় বসে ওরা। সারাদিনের ক্লান্তিতে হঠাৎ করে ঘুম আসে না। রমিজা রান্নাঘরে থালাবাসন গোছগাছ করে। বাঁশবাগানের মাথার ওপরের গোল চাঁদ থেকে আলো চুইয়ে পড়ছে। বুড়ির মনে হয় কি সুন্দর রাত। ঝিরঝিরে বাতাস বইছে। বহুদিন হলদী গাকে এমন মোহনীয় মনে হয়নি ওর। ওর ইচ্ছে করছে এমন চাঁদের আলোয় মাঠঘাট প্রান্তর একবার ঘুরে আসতে। আহা কি সুন্দর এই হলদী গাঁ।
–ইচ্ছে করে ডাক ছেড়ে বুক ফাটিয়ে গান গাই?
গা না কলীম?
বুড়ি উৎসাহ দেখায়।
কিন্তু তেমন করে আসছে না মা?
কলীম উঠোনে পায়চারি করে। বিড়ি ধরায়। বাঘার পিঠ চাপড়ে দেয়। রমিজা এসে ওদের কাছে বসে। সারা দুপুর ঘুমিয়েছে বলে রইসেরও ঘুম নাই। ও বুড়ির পিঠের সঙ্গে মিশে বসে আছে।
–আজকের রাতটা কি যে সুন্দর!
চুপচাপ থাকা সলীমও ওইটুকু না বলে পারে না। নারকেল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কলীম গুনগুনিয়ে গান গায়। কখনো কিছু শব্দ জোরে উঠে আসে। আবার নেমে যায়। কণ্ঠ। সলীম বসেই থাকে। আজ ওর ঘুম পায় না। রমিজা হাই তোলে না। ওরও ঘুম পায়নি। আর বুড়ির চোখ থেকে তো ঘুম পালিয়েছে। এক সময় রইসও উঠোনে নেমে যায়। পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে। বাড়ির সামনের জমরুল গাছ পর্যন্ত হেঁটে আসে। বাঘা ওর পিছু পিছু ঘোরে। বুড়ির পরিবারের সবাই। আজ ভরা পূর্ণিমা সাক্ষী করে কিছুটা এলোমেলো, কিছুটা উদভ্রান্ত সময় কাটায়।
চোত মাসের দশ তারিখে ওদের কমদামী ট্রানজিস্টারে করে ঢাকার খবর এলো। মিলিটারি নেমেছে ঢাকার রাজপথে। তখন চৈত্রের আকাশ মুঠো মুঠো রোদ ছড়িয়ে। যাচ্ছে মাঠেঘাটে। রমিজা গরম ভাত নামিয়েছে চুলো থেকে। আর সলীম চেঁচাচ্ছে। একটি অখ্যাত, অবজ্ঞাত ছোট্ট গ্রাম হলদী গাঁয়ের সলীম চিৎকার করছে ক্ষোভে, আক্রোশে। বুড়িকে ধরে ঝাঁকুনি দেয় কয়েকটা। শপথ নেয় অদ্ভুত বলিষ্ঠ কণ্ঠে। বুড়ি কেবল অবাক হয়ে তাকায়। কোন কিছু বোঝার ক্ষমতা ওর নেইও। যে ছেলে মাকে কোনদিন পাত্তা দেয়নি সে ছেলে আজ মা-কে ধরে চেঁচাচ্ছে। বৌ-কে, এমনকি ওর পেটের সন্তানকে সাক্ষী করে কেমন শক্ত শক্ত কথা বলছে এক প্রত্যয়নিষ্ঠ আবেগে। বুড়ির মুখ থেকে কোরানের আয়াতগুলো যেন ভক্তি সহকারে নিঃসৃত হয় সলীমের কণ্ঠ তেমনি ভক্তিতে, আবেগে, শপথে গমগম করছে। সলীমের এ চেহারা বুড়ি কোনদিন দেখেনি। সলীমকে অনেকদিন রাগতে দেখেছে কিন্তু সে রাগের সঙ্গে এ রাগের অনেক তফাৎ। এ বিক্ষোভ যেন অন্য কিছু। অন্যরকম। সলীম যেন সামনে শত্রু রেখে রুদ্র আক্রোশে বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে। একসময় ট্রানজিস্টার বন্ধ করে কোথায় যেন ছুটে বেরিয়ে যায়। কলীমকেও সঙ্গে নেয়। ওদের কাণ্ড দেখে বিরক্ত হয় রমিজা। পেটের। ভেতর শত্রুটা নড়াচড়া করে। বেচারীর ভরা মাস। শরীর ভাল নেই। মেজাজ খিচড়ে থাকে।
যতসব আজগুবী কাজবাজ। কোথায় ঢাকায় কি হলো তার দেখা নেই। ওনারা এখানে চিৎকার শুরু করলেন।
রমিজা গজগজ করে ভাতের হাঁড়ি শিকার ওপর উঠিয়ে রাখে। আড়চোখে বুড়ির দিকে তাকায়।
–ও আম্মা আপনার কি হলো?
বুড়ি উত্তর দেয় না। চুপচাপ বসে থাকে। জয় বাংলা শব্দটা উথাল পাতাল করে। বুড়ির শরীর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। সলীম কলীম ঐ ডাক ডাকতে ডাকতেই বেরিয়ে গেছে। এখন সেই শব্দ দুটো বুড়িকে জাপটে ধরে রেখেছে। হাত পা কেমন অবশ লাগে। হাঁ করে রমিজার দিকে তাকিয়ে থাকে।
–দেখছেন কি আম্মা? ও আম্মা?
–রমিজা আয় আমরা ওদের মত জয় বাংলা বলে হাঁক দিয়ে উঠি।
–তাতে কি হবে?
–আহ্ রমিজা তুই কিছু বুঝিস না। বুঝতেও চাস না।
–সেই ভাল বাপু, অতশত আমার সয় না।
বুড়ি দাওয়া থেকে নেমে আসে। ইচ্ছে করে সবার মত সারা গা মাতিয়ে তুলতে। জলপাই গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। গাছের সঙ্গে কথা বলে–জলপাই গাছ সবাই বলে আমি কোন কাজে লাগব না। কেন লাগব না? লাগালেই লাগতে পারি। আমার ইচ্ছে করে কিছু করতে। হলদী গাঁ আমার বড় প্রিয়। ছেলেবেলা থেকেই তো এর ঘাস লতাপাতা, ধুলোমাটি, জলকাদা আর লেংটিপরা মানুষগুলো আমার আপন হয়ে আছে। জলপাই গাছ–আমার বড় সাধ হলদী গার জন্যে আমি মরে যাই। মরে গিয়ে হলদী গাকে বলি, হলদী গাঁ তোর জন্যে, শুধু তোর জন্যে আমার পরাণটুকু দিলাম। এ পরাণ আমি আর কারো জন্যে রাখিনিরে। এটা তোরই।
বুড়ির বিড়বিড়ানি থেমে যায়। দূরের মাঠে ছেলেরা জটলা করছে। এতদূর থেকে কথা শোনা যায় না। বাতাসে কান পেতে রাখে। যদি কিছু ভেসে আসে। বুড়ির গলার কাছটা শুকিয়ে এসেছে। শুকনো বুকের আবেগ নিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। মাথার উপর কুটুম পাখি ডাকে। ঝরা পাতা মচমচিয়ে বেজি ছুটে পালায়। কোন কিছুতেই বুড়ির খেয়াল নেই।
দিন সাতেকের মধ্যে পোড় খাওয়া মানুষ হয়ে ফিরে আসে জলিল। সবাই গোল হয়ে ওর কাছ থেকে ঢাকার খবর শোনে। ওর বৌ আর মেয়ে দুটো মারা গেছে। সেই শোকে দিশেহারা। তবু জলিলের পেশিবহুল পেটানো শরীরটা শক্ত হয়ে ওঠে।
–আমাদের এর প্রতিশোধ নিতে হবে সলীম। আমরাও ছেড়ে দেব না।
