ফাগুন শেষে চোত এল। চোত মানেই তো সূর্যের আগুনে খেলা। খা-খা করে গাঁয়ের বুক। মাটি বড় চড়া, রোদের তাপে ফেলা যায় না। বুড়ি এখন বেশি বেরুতে পারে না। বেরুলে গায়ে আগুনে-বাতাসের হলকা লাগে। পায়ের নিচে ঠোসকা পড়ে। কেমন হাঁফ ধরে যায়। খালের পানি চিকচিক করে। ও রমিজার সঙ্গে গল্প করে।
জানিস রমিজা আমার জীবনে হলদী গা-কে এমন গরম কোন দিন দেখিনি। রোদ তো নয় যেন গনগনে আগুনের হাঁপরের মুখটা কে খুলে দিয়ে রেখেছে। বাইরে বেরুনোর জো নেই।
–আপনি এত ঘোরাঘুরি করবেন না আম্মা। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে আপনার শরীর কেমন হয়ে গেছে। শেষে একটা অসুখ না বাধলে বাঁচি। কাল থেকে যেন আপনাকে বাইরে না দেখি।
–তা কি হয়? ঘুরতে আমার মন চায় রে। দেখিস না ওরা কেমন মেতে উঠেছে।
–থাক, ওরা মাতুক। আপনার দরকার নেই।
রমিজা বুড়িকে ছোট মেয়ের মতো শাসন করে।
–না রে রমিজা এমন কথা বলিস না। ওরা যখন জয় বাংলা বলে চেঁচিয়ে ওঠে মনে হয় আমার প্রাণটা ধরে কে যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেল। এমন ডাক আর হয় না রমিজা। রমিজারে তুই অনেক কিছু বুঝিস না। আয় আমরা চিৎকার করে বলি, জয় বাংলা।
রমিজা হাঁ করে বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বুড়ির মুখ যেন এক পবিত্র জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
–জানিস রমিজা সবকিছু ভুলে যাই কিন্তু এই ডাকটা আমি ভুলি না। কখনো ভুলি। ভুলতে আমি পারি না। কেন এমন হয় বল তো?
–আমি জানি না আম্মা।
–আমি দেখি রে এই ডাক হলদী গাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমার এত বছরের জীবনে আর কোন ডাকে হলদী গাঁয়ে এমন জোয়ার দেখিনি রমিজা। আহা কি যে ভাল লাগে। মনে হয় মরে যাই। এখন মরে গেলে আর কোন দুঃখ নাই।
–আম্মা আপনি এত ভাবেন কেন?
বুড়ি ওর সঙ্গে আর কোন কথা বলে না। নিজের মধ্যে ডুবে যায়। রমিজা শান্ত চুপচাপ মেয়ে। এতসব হট্টগোল পছন্দ করে না। তাছাড়া ওর শরীরও ভাল নেই। ভেতরের প্রাণের লক্ষণ ছটফটিয়ে বাড়ছে। ও রমিজাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। বুড়ি আকাশ দেখে। রমিজা বলে ভাবেন কেন? এতসব কর্মকাণ্ডের ভেতর থেকে কেউ কি না ভেবে পারে? চৈত্রের আকাশ উজ্জ্বল নীল। বাঁশবনে ছাতার পাখি ডাকে। সেটা থামলে কুটুম পাখি ডেকে ওঠে। বুড়ি কান পেতে শোনে।
–কুটুম পাখি ডাকে রমিজা?
–নির্ঘাৎ আমার বাপের বাড়ির লোক আসবে। উঃ কতদিন যে বাবাকে দেখিনি। ছোট বোন দুটো এলে আরো ভাল হয়। ওরা আমাকে যা ভালবাসতো। আমাকে ছাড়া ওদের এক মুহূর্ত চলতো না। সারাক্ষণ আমার পিছে পিছে ঘুরতো।
রমিজার খুশিভরা মুখ চেয়ে দেখে বুড়ি। বাবার বাড়ির কথা শুনলে রমিজার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ও তখন অন্য এক জগতে চলে যায়। বাবার বাড়ির স্বাদ বুড়ি পায়নি। ওর কাছে শ্বশুর বাড়িও যা বাবার বাড়িও তা ছিল। বুড়ির মনে হয় মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে। গফুর কবে মরে গেছে সেই স্মৃতিও ঝাপসা হয়ে এসেছে। সলীম কলীম কোনদিন ছোট ছিল কি না তাও আজ আর মনে নেই। ঝিমুনি আসে। ঝা-ঝ দুপুর ঘুমের আমেজ ঘনিয়ে আনে। দাওয়ার ওপর রমিজা ঘুমিয়ে গেছে। রইস ঘরে। সলীম কলীম এখনো ফেরেনি। বেলা গড়িয়ে যায়। ওরা ফেরেনি বলে কেউ দুপুরের ভাতও খায়নি। রমিজাকে খেতে বলেছিল বুড়ি। ও খায়নি। সলীমের আগে ও খায় না। ওদের অপেক্ষায় বসে থাকে বুড়ি। বাঁশের খুঁটিটার সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে। শুলে ঘুম এসে যেতে পারে। বারেবারে তন্দ্রা ছুটে যায়। মনে হয় কলীম যেন উঠোনের মাথা থেকেই চিৎকার করছে। বলছে, মা ভাত দাও। ওর যেন তর সইছে না। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। কলীম ভীষণ ক্ষুধার্ত। বুড়ি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। চোখ খুলে। দেখে কেউ কোথাও নেই।
বুড়ি বিহ্বল হয়ে যায়। কে ডাকে অমন মা মা করে? কার প্রাণ ফেটে যাচ্ছে মা ডাকের জন্যে? কে অমন চিৎকার করে ভাত চায়? বুড়ি কান খাড়া করে চেয়ে থাকে। পুরো হলদী গা যেন চিৎকার করছে ভাতের জন্যে। আকালে, বন্যায়, খরায় এমন চিৎকার ও অনেক শুনেছে। শুধু তাই নয় এমন চিৎকার ও অহরহ শোনে। এই চিৎকারই হলদী গাঁর নিয়তি। চিৎকার করতে করতে হলদী গার লোকগুলোর মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মরে। বুড়ির অস্থির লাগে। মনে হয় কতগুলো শব্দে ওর চারপাশটা গমগম করছে, মা ভাত দাও–মা ভাত দাও। ভাত দাও-ভাত দাও-ভাত দাও। অন্তর ছটফট করে।
বুড়ি উঠোনে নেমে আসে। কাচারীঘর ফাঁকা। সামনে এসে দাঁড়ায়। রাস্তা বরাবর যতদূর চোখ যায় চেয়ে থাকে। কেউ কোথায়ও নেই। মাঠের ধারে গরু বাঁধা। দুএকটা ছাগল চরে বেড়ায়। বুড়ি আরো একটু এগিয়ে বড় জলপাই গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। অনেক দিনের পুরোনো প্রকাণ্ড গাছটা ডালপালা ছড়িয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন বিরাট একটা সরাইখানা। যে কেউ এসে দুদও জিরিয়ে নিতে পারে। সেখানে দাঁড়িয়েও বুড়ি আপ্রাণ চেষ্টা করে লোক দেখার। না কেউ কোথাও নেই। হঠাৎ করে হলদী গাঁ যেন জনমানব শূন্য নিঝুমপুরী হয়ে গেছে। সব লোকগুলো কোথায় গেল? বুড়ি বাঁশবাগান থেকে গরুটা খুলে বাড়ির আঙ্গিনায় নিয়ে আসে। কিছুদিনের মধ্যেই গরুটা বিয়োবে। রমিজা ঘুম থেকে উঠে চুপচাপ বসে থাকে। রইসও বারান্দায় এসে বসেছে।
–কেউ ফিরেনি আম্মা?
–নারে। তোর আর না খেয়ে থাকা ঠিক না। চল আমরা খেয়ে নিই।
রান্নাঘরে বসে তিনজনে ভাত খায়। সাদা ফকফকে ভাতের দলা হঠাৎ করে বুড়ির কাছে কেমন শক্ত মনে হয়। বারবার পানি খায়।
