–আমি কোন কাজেই লাগব না?
–না, গো, না। কিছু পারবে না।
বড় বেশি সাহসের কথা বলে যুবকরা। বুড়োদের বাদ দিয়ে দিতে চায়। নেংটি পরা ছেলেদের কি এত কিছু মানায়? রমজান আলীকে ধরে বসে ও।
–কি হচ্ছে রমজান ভাই বলতো?
–সে তুমি বুঝবে না। যারা এতকাল আমাদেরটা খেয়েছে এবার আমরা তাদের দেখে নেব। আর চুপ করে থাকব না।
–পারবে? বুড়ি চোখ বড় করে তাকায়।
–কেন পারব না? দেখছ না আমাদের ছেলেরা তৈরি হচ্ছে?
–নেংটি পরা ছেলেদের কি এত কিছু মানায়?
বুড়ির কথায় হো-হো করে হেসে ফেলে রমজান আলী।
–ভালই বলেছ সলীমের মা। মানায় না মনে করেই তো আমরাও এতকাল চুপ ছিলাম। আর তো পারি না। ওরা উঠতে উঠতে আমাদের মাথা ছাড়িয়ে আকাশে উঠে
গেছে।
–কি যে বল বুঝি না?
–বুঝবে না। ঘরে যাও। মাথা ঠাণ্ডা কর। রমজান আলী সোজা রাস্তা ছেড়ে আলপথে নেমে যায়। বুড়ি ঘরে ফেরে।
ওদের কথা বিশ্বাস হয় না বুড়ির। সলীমের কাছে জিজ্ঞেস করে। সলীম গম্ভীর, ভাবনায় মগ্ন। বুড়িকে কিছু বলে না। বুড়ির যেন এ গাঁয়ের সারিতে অপাংক্তেয় হয়ে গেছে। অথচ বুড়ির সেই নিরেট মনটা অনবরত এক লক্ষ্য আবিষ্কারে তৎপর।
বুড়ি কাচারী ঘরের বাঁশের বেড়ার পাশে কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের কথা শোনার চেষ্টা করে। সলীমের কণ্ঠ উত্তেজনায় থমথম করে। ওরা কি যেন বলাবলি করে। কিছু বুঝতে পারে না বুড়ি। তবুও মনে হয় ও নিজেও যেন নিজেকে প্রস্তুত। করছে। একটা কিছু ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি। যে ঘটনা বুড়ি কোনদিন দেখেনি এবং আর কোন দিন দেখবেও না। সেই যে বাইশে ফাগুন রেডিওতে একটা বক্তৃতা হয়েছিল সলীম ওকে ডেকে তা শুনিয়েছিল। বলেছিল, তার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কি দরাজ গলা! সেই কণ্ঠস্বর এখনো গমগম করে হলদী গা জুড়ে। বুড়ি সকলের সঙ্গে অভিভূতের মত শুনেছিল। শুধু এটুকু বুঝেছিল যে একটি মানুষ ওদের সকলের হয়ে কথা বলছে। একদম ওদের হৃদয়ের কথা। হলদী গার মাঠ, ক্ষেত-ফসল, গাছগাছালি, গরু-ছাগল, পাখ-পাখালি এবং মানুষের কথা। সিরাজ মিয়া কথাগুলো ধরে রেখেছে একটা যন্ত্রে। তারপর থেকে সেই কথাগুলো ওরা প্রায়ই শোনে। শুনতে শুনতে ওদের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। সলীম মুখস্থ করে ফেলেছে কথাগুলো। খুব বেশি কিছু না বুঝলেও দুটো লাইন বুড়ির মনে সারাক্ষণ মাতামাতি করে, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম–এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বুড়ির এর বেশি কিছু মনে থাকে না। সলীমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে সলীম বলে দেয়। আবার ভুলে যায় ও। কিন্তু কানের পটে রেশ জেগে থাকে সব সময়। তাতে বুড়ি আচ্ছন্ন হয়ে থাকে এবং সে সূত্র ধরে বুড়ি আরো অনেক কিছু বুঝে উঠতে চেষ্টা করে। সেই বজ্রকণ্ঠের মানুষটাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে বুড়ির।
একদিন সলীমকে ধরে বসে, বঙ্গবন্ধুকে আমাকে একদিন দেখাবি বাবা?
সলীম হেসে ফেলে।
–কেমন করে? ঢাকা অনেক দূরের পথ। তাছাড়া আমিও তো দেখিনি তাঁকে। কেবল মনে মনে একটা মুখ বানিয়ে নিই।
–আমিও বানাই সলীম।
বুড়ি উৎসাহ ভরে বলে।
–কিন্তু দেখিনি বলে এক একবার এক একরকম হয়ে যায় রে।
–ঠিকই বলেছ। যেবার গঞ্জে এলো বক্তৃতা করতে ওখানে যেতে পারলাম না অসুখ ছিল বলে। আর বুঝি দেখা হবে না?
–হবেরে হবে। বেঁচে থাকলে ঠিকই হবে।
বুড়ির উৎসাহে ভাটা পড়ে না। হলদী গার এখানে সেখানে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেলে সলীমের বৌ-র পাশে এসে বসে। আজকাল সলীম রমিজাকে আর মারে না। রমিজার বাচ্চা হবে। ও মা হবে। বুড়ি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বুড়ির মত সাধনা করতে হয়নি ওকে, অনায়াসে মা হয়ে যাচ্ছে। রমিজার মেজাজ আজকাল খুব ভাল অনায়াসে মা হয়ে যাচ্ছে। একটা কিছু পেতে যাচ্ছে এ বোধ ওকে সুখ দেয়। বুড়ি ওর পরিতৃপ্ত মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে। ওকে এখন ভীষণ ভাল লাগে বুড়ির। রমিজার পাশে এসে বসলে ও সস্নেহে বুড়ির দিকে তাকায়।
–আম্মা আপনার কি হয়েছে? মুখ একদম শুকিয়ে গেছে?
–রোদে ঘুরেছি কিনা তাই অমন দেখায়। সত্যি সারা গায়ে যেন কি হয়েছে রমিজা?
–কি আবার হবে? আপনাকেও ওদের ভূতে পেয়েছে।
রমিজা খুকখুক করে হাসে। ওর হাসির একটা ঢঙ আছে।
হাসতেই থাকে রমিজা। ওর এই হাসি সলীম সহ্য করতে পারে না। রেগে যায়।
–হাসিস না রমিজা। হাসির কথা নয়।
–আমার অতশত ভাবনা নেই আম্মা তাই হাসি। এ বাড়ির সবাই যেমন গম্ভীর হয়ে গেছে তাই আমি একাই হাসি। রইস আমার হাতে দুধ খায়নি। সে কি রাগ কিছুতেই খাবে না। আপনার জন্য বসে রয়েছে।
রইস-রইস-রইস।
বুড়ির ছেলের কথা মনে হয়। এই ছেলের জন্যে বুড়ির কত আকাঙ্ক্ষা ছিল। এক সময় ছেলের জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। আজ আর তড়িঘড়ি করে ছেলের কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করল না। বেশ কিছু দিন ধরে রইসের দিকে তেমন খেয়াল দিচ্ছে না। ও একা একা ঘুরে বেড়ায়, নয় বারান্দায় বসে থাকে কিংবা উঠোনে বাঘার সঙ্গে খেলা করে। যেহেতু রইস কথা বলতে পারে না তাই ওর কোন অভিযোগ নেই। বুড়ির অবহেলা ও নীরবে মেনে নেয় কিংবা বুড়ির আদর সোহাগও নীরবে উপভোগ করে। রইস একদম একলা। কারো সঙ্গে ওর কোন যোগাযোগ নেই। বুড়ি হাঁটুতে থুতনি রেখে চুপচাপ রমিজার পাশে বসে রইল। বৃষ্টিবাদলা না থাকলে রমিজা উঠোনের চুলোয় রান্নাবাড়ি করে। রান্নাঘরের চাইতে বাইরে রাঁধতেই নাকি ওর ভাল লাগে। রমিজা গগনে আগুনে ভাত ফোটায়। শুকনো পাতা দাউদাউ জ্বলে, বাতাসে সেটা আরো দপদপিয়ে ওঠে। বুড়ি একদৃষ্টে আগুন দেখে। টগবগ করে ফুটে ওঠা ভাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবনা এসে জড়ো হয়। হলদী গাঁও তো এমন টগবগ করে ফুটছে। আগুন দিল কে? এ আগুনে কোন পাতিলের ভাত সেদ্ধ হবে?
