আজকাল প্রতিদিনই নতুন মনে হয় বুড়ির। সকালের আড়মোড়া ভাঙতে কোন আলস্য নেই। চমৎকার ঝরঝরে লাগে। দরজা খুললেই এক ঝলক সতেজ বাতাস। ফুসফুসের মধ্য দিয়ে ঢুকে এক দৌড়ে পুরো শরীর স্নিগ্ধ করে ফেলে। বুক ভরে শ্বাস টেনে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে হাঁস মুরগির খোয়াড়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। একটানে দরজা খুলে দেয়। কলকলিয়ে বেরিয়ে আসে ওরা। গোয়ালে যায়। গরুটার গলায় হাত বোলায়। বাছুরটার গা চাপড়ে দেয়। সব কিছুতে এখন আনন্দ। সারাদিন কেমন করে যে কাটে টের পায় না। বাঁশবনের মাথার ওপর দিয়ে ঝকঝক বালিহাঁস উড়ে যায়। উঠোনে ছায়া পড়ে। অসম্ভব সুন্দর হলুদ গলাটা সকালের রোদের মত লাগে। কোথায় যেন আলগা রঙে ঝরণা বইছে। অথচ ধরতে পারছে না বুড়ি। সে রঙ এবার বন্যা হবে। সে বন্যা নতুন পলিমাটি বয়ে আনবে। উর্বরা শ্যামল মাটিকে ঐশ্বর্যশালী করবে। বুড়ি খালের ধারে যায়। মনে হয় মৃদু-স্রোতের ছোট খালের শরীর বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে পানির রেখা; জলের বুকের কেলি। বদলে যাচ্ছে সবুজ শ্যাওলার মাথা নাড়া, পারের মাটির সখী-খেলা। বদলে যাচ্ছে মাটির গতর। হৃৎপিণ্ডের ধুকধুক শব্দধ্বনি। কেমন যেন উদ্দাম হয়ে উঠতে চাইছে খালের শরীর। চিরকালের চিরচেনা নৌকা বাওয়া, মাছ ধরা খালটা কত দ্রুত পাল্টে গেল। যেন বাক বদলাতে চায়, যেন স্রোতে বিশাল কিছু বয়ে আনতে চায় কিংবা দুকূল ভাসিয়ে সাগরে যেতে চায়। বুড়ি খালের পানিতে হাত ভেজায়, গালে ডলে, চোখে মাখে, মাথায় দেয়। যদি পানি তাকে কোন নতুন কথা বলে দেয়? যদি বলে কেন হলদী গাঁয়ের প্রাণ বদলে যাচ্ছে। কোন অমোঘ শক্তির টানে হলদী গাঁ তার আপন স্বরূপের বাইরে পা বাড়াচ্ছে? কে তাকে এমন সাহসী, বেগবান এবং যৌবনবতী করে তুলল?
বুড়ি স্টেশনের দিকে চলে যাওয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছোটবেলায় কতদিন জলিলের হাত ধরে ঐ রাস্তা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে স্টেশনে গেছে। ঐ রাস্তার ধুলোমাটি, লজ্জাবতী লতা, ভাঁটফুল, কচুপাতা, লম্বা ঘাস সব কিছুই তো ওর মুখস্থ। কোনটাকে বুড়ি না চেনে? অথচ এখন মনে হয় ঐ রাস্তাটা একদম অচেনা। কোনদিন এই পথে হাঁটেনি। এই পথে হাঁটতে দারুণ সাহস লাগে। ধুলো-ওড়ানো কাঁচা রাস্তাটা রোদের সোহাগে ঝক্ঝক্ করে। কেমন বুক চিতিয়ে হা হা করছে। যেন ডাকছে, এস একবার দেখে যাও। দেখ কোথায় নিয়ে যাই। কত লোক আসা-যাওয়া করছে রাস্তা দিয়ে। কেউ ওর দিকে ফিরেও তাকায় না। সবার পায়ের চলার গতি দুর্বার হয়ে উঠেছে। ঐ মাটির সঙ্গে মানুষগুলোর পায়ের আশ্চর্য মিল। ঐ মাটি ওদের সঙ্গে কি কথা বলে? কি মন্ত্র শিখিয়ে দেয়? ঐ রাস্তা যদি বুড়িকে বলে দিত হলদী গাঁয়ের প্রাণ কেন বদলে যাচ্ছে? এই টগবগিয়ে ওঠা প্রাণটা কে এতদিন ঘুম পাড়িয়ে দীঘির বুকে লুকিয়ে রেখেছিল? ঐ রাস্তা কেন বুড়িকে এখুনি বলে দিচ্ছে না যে হলদী গার। লোকগুলো কোন লক্ষ্যের দিকে যাত্রা শুরু করছে?
০৬. গাঁয়ের শেষ মাথার বড় শিমুল গাছ
গাঁয়ের শেষ মাথার বড় শিমুল গাছের নিচে গিয়ে বসে বুড়ি। ওখানে বসে স্কুলঘরের মাঠে ছেলেদের হৈচৈ খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। ছেলেগুলোর মধ্যে সেই অকারণ ছেলেমানুষী দুষ্টুমির চপলতা নেই। ওরা যেন কেমন নতুন ঢঙে কথা বলে। ওরা কেবলই উত্তেজিত হতে থাকে। ওরা এ গাঁয়ের বেড়িটা ভেঙে দিতে চাইছে। ওদের গায়ে এখন অসুরের শক্তি। নেংটি পরা টিংটিং-এ ছেলেগুলো যে এমন দামাল হতে পারে তা বুড়ি ভাবতেই পারে না। পেট ভরে ভাত খেতে পায় না যারা ওরা আবার লড়বে কি? কিন্তু ওদের দিকে তাকিয়ে বুড়ির মন ভরে যায়। রইসের মুখটা মনে পড়ে। রইস যদি ওদের মত এমনি করে দামাল হতে পারত? এ চঞ্চল শক্তিমান ছেলেগুলোর পাশে নিজের পঙ্গু অসহায় ছেলেটার কথা মনে করে বুড়ির বুক ভার হয়ে গেল। না, ও কোন কাজেই লাগবে না। ওকে কোথাও লাগানো যায় না। হলদী গাঁয়ের নতুন। সম্ভাবনায় জেগে ওঠা প্রাণের জোয়ারে রইস অপ্রয়োজনীয়। একেবারেই তুচ্ছ। মাথার ওপর শিমুল গাছের ছায়া বড় হতে হতে অনেক বড় হয়ে যায়। তৃষ্ণার্ত মন নিয়ে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরা যদি বলে দিত কেন হলদী গাঁ এমন করে বদলে যাচ্ছে? কেন ওরা ডাঙ্গুলি আর মার্বেল খেলা ছেড়ে দিয়ে বড়দের মত ভাবুক হয়ে গেছে? ওদের প্রাণে এখন কোন বাতাস বইছে? ওরা কেন বন্দুক ছোড়া শিখতে চাইছে? কোন বন্দি দেশের রাজপুত্র হয়ে গেল ওরা? কোন সাম্রাজ্য জয় করবে বলে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে? ওরা কি চায়? কি নেই ওদের? কোন প্রয়োজনে ওরা রক্তের হোলি খেলায় মাতবে? উঠতে গিয়েও বসে পড়ে আবার। উঠতে ভাল লাগছে না। এ জায়গাটা খুব প্রিয় বুড়ির। এখানে বসে হলদী গাকে বড় আপন করে দেখা যায়। যে দেখায় উপরের খোলস ঝরে গিয়ে ভেতরের প্রাণ ঝলমলিয়ে ওঠে। অভাব-অনটন, দুঃখ দারিদ্র্য, নিপীড়ন, বঞ্চনা হলদী গাঁর সমৃদ্ধ প্রাণকে জীর্ণ মলিন করে রেখেছে। এ মলিনতা বুড়িকে স্পর্শ করে যায়। ঝিরঝিরে বাতাস বইছে চারদিকে। ফাগুনের গুমোট গরম কখনো হঠাৎ করে উবে যায়। তখন বেশ লাগে। বুড়ির আশপাশে অনেক পাখি। ওড়ে। দূরের গাছে হলুদ বউ কথা কও এক মনে ডাকে। এক ঝাঁক পরাণচমকানি মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। বুড়ি পা ছড়িয়ে বসে।
হঠাৎ মনে হয় শিমুলের গোটা আচমকা ফেটে গিয়ে যেমন তুলোগুলো দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে তেমনি হয়েছে হলদী গায়ের অবস্থা। গাঁয়ের মানুষগুলোর বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা শিমুল বীজ ফাগুনের গরম বাতাসে আচমকা ফেটে গেছে। মানুষগুলো ছুটছে। ছুটছে একটা লক্ষ্যের দিকে। সে লক্ষ্য ঐ শিমুল তুলোর মত সাদা ধবধবে। উজ্জ্বল। শিমুলের লাল ফুলের বীজ থেকে যেমন ঐ উজ্জ্বলতার জন্ম হয় এও তেমনি। রক্তলাল ফুলের মত মানুষগুলোর চেহারা এখন রক্তাভ। কেবল ফোটার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। বুড়ির বুক যেন কেমন করে। মানুষগুলোর মুখের আশনাই বুকের মধ্যে তুলোর। মত হালকা ধবধবে সাদা হয়ে যায়। বুড়ি ছটফট করে। ওরা কেন কেউ কিছু বলছে না ওকে? কি যে হচ্ছে সারা গা জুড়ে? বাইরের ডবকা ছেলেগুলো সামনে গেলে ভাগিয়ে দেয়। বলে, তোমাদের মতো বুড়োদের দিয়ে কোন কাজ হবে না। এ এক কঠিন সময়।
