সলীম আজকাল গাঁয়ের একজন মাতব্বর গোছের লোক হয়েছে। ও এখন অনেক বোঝে। বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারে। বুড়ির চোখের সামনে দিয়ে ছেলেটা বদলে গেল। বুড়ির ভালই লাগে। পেটের ছেলে না হলে কি হবে সলীম লীমের সঙ্গে ওর একটা আত্মিক যোগ আছে। সে যোগ নাড়ি-ছেঁড়া ছেলের চাইতে কম না। বুড়ির বুকের মধ্যে অহংকার জন্মায়। কাচারীঘরে সারাক্ষণ লোকজন আসা-যাওয়া করে। কখনো জোরে, কখনো ফিসফিসিয়ে কি সব কথাবার্তা বলে ওরা। বুড়ির মনে ভাবনা জোটে। কি হলো দেশটার? কৈ বুড়ির এত বছরের জীবনে হলদী গাঁ-র কিছু হয়েছে। বলে তো মনে পড়ে না। মৌসুমী ফসল বোনা, সময়ে ফসল কাটা। কোন বছর ভরা গোলা, কোন বছর অভাব। কখনো আকাল, দুর্ভিক্ষ। প্রবল খরা কিংবা বন্যা। এর বাইরে তো এ গাঁয়ে বড় রকমের কিছু ঘটেনি। তাছাড়া প্রাকৃতিক কিছু হলে বুড়ি টের পায়। শুধু দৃষ্টিতে নয়, ইন্দ্রিয়েও টের পায়। এ ব্যাপারে ওর জুড়ি নেই।
খেয়ে উঠে সলীম চলে যায়। সেদিকে তাকিয়ে বুড়ির মনে হয় সলীম বেশ একটা পুরুষ হয়েছে। ছেলে-ছোকড়া ভাবটা ওর মধ্যে এখন কম। আর কিছুদিনে সেটাও ঝরে যাবে। কলীম খেয়ে উঠতে যাবে তখন ওকে ধরে বসে বুড়ি।
–হ্যাঁ রে বাবা কি হয়েছে দেশটার? জন্মাবার পর থেকে তো কিছু হতে দেখলাম।
–কোন দিন হয়নি বলে কি এখন হবে না মা?
–তা বলবি তো কি হয়েছে?
–সে মেলা কথা তুমি বুঝবে না মা।
–তোদের মুখে এই এক কথা। বুঝবো না কি? বোঝালেই বুঝবো?
রমিজা পাশ থেকে চট করে বলে, আমাদের বোঝাবে কি আম্মা কলীম ভাই নিজেই জানে না কি হয়েছে।
–হ্যাঁ, জানি না তোমাকে বলেছে। দেখ এবার আমাদের একটা যুদ্ধ করতে হবে। দেশ স্বাধীন করতে হবে।
–ওমা এ আবার কি কথা? স্বাধীন আবার কি রে?
বুড়ি চোখ গোল করে তাকায়। সুযোগটা নেয় কলীম।
–এজন্যে তো বললাম কিছু বুঝবে না।
–যতসব আজগুবি কথা। আসলে একটা কিছু নিয়ে থাকতে না পারলে তোমাদের দুভায়ের ভাল লাগে না। মাগো কত যে তোমরা পার।
রমিজা ফোঁড়ন কেটে থালাবাসন গুছিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। কলীম ওর কথার উত্তর দেয় না। বিড়ি টানবে বলে উঠোনে নামে। একটু পরে ভেসে আসে ওর কণ্ঠের গান। বুড়ি ভাবনায় পড়ে। হাত পা ছড়িয়ে বারান্দায় বসে থাকে। যখন কোন সমস্যায় পড়ে তখন গফুরের কথা বেশি করে মনে হয়। দূরের তারার দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশের বুকে ফুটিফাটা জ্বলে তারারা। বাঁশবনের মাথার অন্ধকার নিবিড় হয়ে ওঠে। যুদ্ধ কি? যুদ্ধ কখনো দেখেনি বুড়ি। গফুরের সঙ্গে বিয়ের কদিন পর শুনেছিল দেশ স্বাধীন হয়েছে। তখন কোন যুদ্ধের কথাবার্তা হয়নি। গাঁয়ের লোক এমন গম্ভীর হয়ে যায়নি। সলীমের মত থমথমে আচরণ করেনি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে তখন গাঁয়ের ছেলেরা সবুজের ওপর সাদা রঙের চাঁদতারা মার্কা পতাকা নিয়ে লাফালাফি করছিল। গাছের আগায় বেঁধে দিয়েছিল। মোটকথা একটা দারুণ ধুমধাম হয়েছিল। সবার মনে ফুর্তি ছিল। কিন্তু এখন কেন স্বাধীনতা মানে যুদ্ধ? সলীম কলীম কেন এমন বদলে গেল? কি হল দেশটার? নিশ্চয় সাংঘাতিক কিছু। নইলে বিয়ে পর্যন্ত বন্ধ করে দেবে কেন ওরা।
সূচোল হয়ে ওঠে বুড়ির ভাবনা। খরা বা বন্যার মত এ ঘটনা নয়। পুড়িয়ে বা ভাসিয়ে দিয়ে যায় না প্রকৃতি। এর সঙ্গে মানুষের যোগ আছে। সেজন্যে সলীম কুলীম ভাবনায় পড়ে, তৈরী হয়। প্রস্তুতি নেয়। বুড়ির সামনে সমস্যার নতুন দিগন্ত-দুয়ার খুলে যায়। সেটা ওর মগজে ঘুরপাক খায়। সে আবর্ত ওর ইন্দ্রিয়কে তীক্ষ করে তোলে। কি যেন গন্ধ পায় বাতাসে। ওর মনে হয় পোষা কুকুরটার ঘেউ ঘেউ শব্দও যেন কেমন। একটু অন্যরকম। চিরকালের চিরচেনা নয়। যে কোন সচেতন বুদ্ধিসম্পন্ন লোক তা বুঝতে পারবে। বুড়ি হলদী গাঁয়ে ঘুরে বেড়ায়। অনুভব করে হলদী গাঁয়ে চিরকালীন শান্ত সংযত কর্মপ্রবাহে জোয়ার এসেছে। মুখ বুজে সয়ে যাওয়া, ঘা খেয়ে মাথা নোয়ান মানুষগুলোর কণ্ঠে এখন ভিন্ন সুর। চোয়ালে ভিন্ন আদলের ভঙ্গি।
বুড়ি গরু বাঁধতে এসে রমজান আলীর দিকে তাকিয়ে থমকে যায়।
–রমজান ভাই কৈ যাও?
–বাজারে। মনসুরের দোকানে ট্রানজিস্টারে খবর শুনবো। এবার সাংঘাতিক একটা কিছু হবে সলীমের মা। আমরাও ছাড়ব না।
–কি হবে রমজান ভাই?
–এখন আসি। পরে কথা হবে।
বুড়ি কিছু ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারে না। কেন এমন হল দেশটার। বাঘা আজকাল কারণ অকারণে ঘেউ ঘেউ করে। বাঁশবনে শত্রু লক্ষ্য করে দৌড়ে যায়। ফিরে এসে বুড়ির পায়ের কাছে বসে গরগর শব্দ করে। জিহ্বা বের করে লম্বা শ্বাস নেয়। বুড়ি মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
–তোর এত অস্থির লাগে কেন বাঘা? তোর কি হয়েছে? তুই কি কিছু বুঝতে পারিস? ছোটবেলা থেকে কত কিছুই যে বুঝতে চেষ্টা করেছি পারিনি। এখন আমি বুঝতে চাইরে বাঘা। আমার শরীরটা অন্য কথা বলে। আমিও ধরতে পারছিরে বাঘা, এ খরা বা বন্যা নয়। এ অন্য কিছু, একদম অন্যরকম।
–আম্মা যে কি কুকুরের সঙ্গেও কথা বলে।
রমিজার কথায় বুড়ি লজ্জা পায়। সত্যি মাঝে মাঝে আশপাশের সব কিছু একদম ভুলে যায়। তখন মনে হয় নিজের মনটাই বড় সঙ্গী। নিজের সঙ্গে আপন মনে কথা বলাতেও কম সুখ না, খেলাটা জমে ওঠে। তখন আর কিছু খেয়াল করতে পারে না। আসলে বাঘাতে উপলক্ষ মাত্র।
–আম্মা আপনার কি হয়েছে? আপনিও কি ওদের মত হয়ে গেলেন?
রমিজার হাসিতে বুড়ির রাগ হয়। ওর মুখের দিকে তাকায় না। মেয়েটা ভেঁপো হচ্ছে। সব কিছুতে নাক গলাতে আসা! ওর কি দরকার শাশুড়ির দিকে এত খেয়াল করার? বুড়ি রাগের চোটে বাঘার গায়ে এক লাথি দিয়ে ওকে উঠিয়ে দেয়। তারপর রইসকে নিয়ে পুকুরঘাটে চলে যায়।
