–আম্মা আপনি রাতদিন কি এত ভাবেন?
–কৈ? কিছু ভাবিনা তো?
–উঁহু ভাবেন। আমি টের পাই।
বুড়ি অবাক হয়। রমিজা কি টের পায়? কতটুকু বোঝে ও?
–রইসের জন্যে আপনার মন খারাপ থাকে না আম্মা?
–হ্যাঁ তা থাকে। ছেলেটার যে কি হবে?
–কি আর হবে। আল্লাহ্ আছে। আপনি কিছু ভাববেন না।
রমিজা বিজ্ঞের মত কথা বলে। ও যখন মুরুব্বি সাজে বুড়ির তখন বেশ ভাল লাগে। মেয়েটা একদম সরল। মনটা ভাল। কোন ধরনের কুচিন্তা করে না। বুড়ির মনে হয় ওর চারপাশের মানুষগুলো ঠিক ওরই মত। ওর সঙ্গে ভাঁজে ভাঁজে মিলে যায়। না, ঠিক তা নয়। ধাক্কা কি খায়নি বুড়ি? দেখেনি কি হিংসা, ঝগড়া, রেষারেষি? আসলে এসব বুড়ি ভাবতে চায় না। ভাড়ার ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে রাখে।
তবুও খারাপ লাগে যখন দেখে সলীম রমিজাকে মারে। সলীমের অভিযোগ, ও নাকি কোন কাজের না। বুড়ি ভেবে পায় না কেন? লক্ষ্মী মেয়ে রমিজা। গুছিয়ে সংসারের কাজ করে। ছিমছাম পরিপাটি। কোথাও কোন গলদ নেই। তবুও সলীম ওর ওপর বিরক্ত। অভিযোগের অন্ত নেই। রাত্রিবেলা পাশের ঘর থেকে সলীমের শাসানী এবং ধমকানি কানে আসে বুড়ির। রমিজা যখন গুনগুনিয়ে কাঁদে তখন বুড়ির দম আটকে আসতে চায়। সলীমের আচরণ ওর কাছে বড় অদ্ভুত লাগে। সলীমকে জিজ্ঞেস করতে ওর বাধে। এতদিনে বুড়ির মনে হয় ওর অভিজ্ঞতার বাইরেও অনেক কিছু ঘটে। যে ঘটনাকে বুঝতে যাওয়া বোকামী। বুঝতে না চাইলে যন্ত্রণা। প্রথমদিকে বুড়ি সলীমের আচরণে আপত্তি করেছে। ওর ওপর রাগ করেছে। রাগে কাজ না হওয়ায়। অনুনয়-বিনয় করেছে। কিন্তু কিছুই শোনেনি সলীম। একদিন রেগে গিয়েছিল, তুমি আমার ব্যাপারে বুঝবে না মা। তুমি চুপ থাক। সব ব্যাপারে নাক গলাতে আস কেন?
সলীমের তীব্র ভাষায় থমকে গিয়েছিল বুড়ি। অপমান লেগেছিল। সলীমের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল। দুদিন মন খারাপ ছিল। মনকে অনেক বুঝিয়েছে। ঠিকই বলেছে সলীম। ও বড় হয়েছে ওর ব্যাপারে মাথা ঘামানো একদম উচিত না। কিন্তু রমিজা যখন কাঁদে তখন সইতে পারি না যে! বুড়ি নিজেকে ধমকায়। সইতে হবে। না সয়ে উপায় কি? রমিজাকে নিয়ে যা খুশি করার অধিকার সলীম পেয়েছে।
এখন বুড়ি চুপই থাকে। কিছু বলে না। মাঝে মাঝে রমিজার ক্রটি আবিষ্কারে তৎপর হয়। কেন ও সলীমকে খুশি করতে পারে না? পরক্ষণে নিজেকে আবার শাসন করে। ছিঃ মা হয়ে এমন চিন্তা করা ঠিক নয়। তাছাড়া রমিজাই বা ওকে কি ভাববে? একদিন রাতে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল সলীম। রমিজা কাঁদতে কাঁদতে বুড়ির পাশে এসে শুয়েছিল। বুড়ি ওর সঙ্গে কথা বলেনি। কিন্তু হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়েছিল শুধু স্পর্শ দিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছিল ওকে। শাশুড়ির আদরে বেশি করে কেঁদেছিল রমিজা। তবু বুড়ি জিজ্ঞেস করেনি যে সলীমের সঙ্গে কি হয়েছে। শেষ রাতের দিকে সলীমের মৃদু শাসানীতে ঘুম ভেঙে যায়। দেখে ওকে বিছানা থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বুড়ি সাড়াশব্দ না করে চুপ-চাপ শুয়ে থাকে। তখন বুড়ির মনে হয়েছিল ব্যাপারটা একান্তভাবেই ওদের দুজনের। সেখানে বাইরের কারো কিছু করার নেই। তারপর থেকে ওদের ব্যাপারে আর মাথা ঘামায়নি। সলীম যখন রমিজাকে মারে তখন পুকুর পারে বসে থাকে। নইলে পড়শীর ঘরে চলে যায়। ভীষণ কথা বলে। হাসে, অন্যমনস্ক হওয়ার ভান করে। যদিও মন পড়ে থাকে রমিজার কাছে। সলীম বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে ফিরে আসে। রমিজার মাথা বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। রমিজা কোন কথা বলে না। বুড়িও না। এজন্যে মাঝে মাঝে বুড়ি অবাক হয়। রমিজার মুখে কোন অভিযোগ নেই। সলীমের বিরুদ্ধে কিছু বলে না। বড় নীরবে সয়ে থাকে।
এদিক থেকে কলীম অনেক শান্ত, রাগ কম। বুড়ি মনে মনে ভাবল কলীমের একটা বিয়ে দিতে হবে। ওর এখন বিয়ের বয়স হয়েছে। আসলে যত শান্তই হোক বিয়ে দিলে ও নিজেও হয়ত বউকে মারবে। কোন কোন পুরুষ আছে যারা বউর ওপর বীরত্ব দেখাতে ভালবাসে। বাইরে সমকক্ষ পুরুষের সঙ্গে পারে না বলে ঘরে তাদের যত আস্ফালন। অবশ্য কলীম এমন নাও হতে পারে। ও খুবই ভাল ছেলে। কলীমের প্রতি বুড়ির পক্ষপাতিত্ব আছে। মনে মনে কলীমের জন্যে মেয়ে খুঁজতে খুঁজতে ওসমান মৃধার মেয়েটা চোখে পড়ে যায় বুড়ির। কলীমের সঙ্গে বেশ মানাবে।
রাতে খাবার সময় দুভায়ের সামনে কথাটা পাড়ে। সলীম সারাদিন বাড়ি ছিল না। কোথায় কোথায় ঘুরেছে কে জানে। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়বে। অন্য সময়তো ওকে ধরাই যায় না। দুদণ্ড বসে কথা বলার জো নেই। সংসারের কাজের কথাও শুনতে চায় না। বলতে গেলেই, পরে হবে মা বলে বেরিয়ে যায়। বুড়ির মাঝে মাঝে রাগ হয়। কি এত রাজকাজে ব্যস্ত ও? সলীম খুব তাড়াতাড়ি ভাত খাচ্ছে। বেশিক্ষণ বসে থাকতে চাইছে না। সলীমকে উদ্দেশ্য করে বুড়ি বলে, কলীমের একটা বিয়ে এবার দিতে হয় বাবা? দুভায়ে একসঙ্গে আপত্তি করে।
–এখন না মা?
–কেন? এখন নয় কেন? আমি মরলে হবে?
বুড়ি রেগে যায়। উত্তর দেয় সলীম।
–তুমি আজকাল বড় তাড়াতাড়ি রেগে যাও মা।
–তাতো বলবি। তোরা এখন বড় হয়েছিস না?
–শোন, মাথা ঠাণ্ডা কর। তুমি তো কিছু জান না, দেশের অবস্থা এখন একদম ভাল না।
–ওমা দেশের আবার কি হলো? জ্বর এলো নাকি? বুড়ি হেসে ওঠে। রমিজাও খুকখুক হাসে। রেগে যায় সলীম।
–আঃ মা যা বোঝ না তা নিয়ে হাসাহাসি করো না। আমাদের সামনে একটা কঠিন সময় আসছে। . সলীম ঢক করে পানি খায়। কলীমও মুখ নিচু করে খেয়ে যায়। বুড়ি ভাত নাড়াচাড়া করে। ওদের খাওয়া হলে, ও আর রমিজা খাবে। জিহ্বার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। অকস্মাৎ পুরো ঘরে নীরবতা নেমে আসে।
