সলীম কলীম না থাকলে বাড়িটা নিঝুম হয়ে থাকে। বুড়ি কখনো আপন মনে বব করে। ও রইস, রইসরে তোকে কি আমি এমন করে চেয়েছিলাম। ওই হাবা ছেলেটা একবারও মা বলে কি ডাকতে পারিস না? তোর কাছ থেকে মা ডাক শোনার জন্যে আমার প্রাণটা ফেটে যায় রে? কত সাধ ছিল মনে, কত সাধ্যি-সাধনা করলাম? বোবা ছেলেটা তোর মুখ দিয়ে কথা ফোটাতে পারলাম না? এমন চুপ হয়ে থাকিস কি করে? মাগো মা? রইসরে ও রইস একবার মুখটা খোল বাবা? আমার সোনার ছেলে বুকের মানিক সাত রাজার ধন? একবার হাঁ কর আমি তোর কাছ থেকে একটু শব্দ শুনি? এই আমি তোর মুখের কাছে কান রাখলাম। বল বাবা বল? একবার বল? মা বলে প্রাণ খুলে ডাক দে? সেই ডাকে মাঠ-ঘাট বন-প্রান্তর আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠুক? সেই ডাকে গাঁয়ের সব মানুষগুলো দৌড়ে তোর কাছে ছুটে আসুক? অবাক হয়ে দেখুক তোর শক্তি, তোর ক্ষমতা? প্রমাণ হোক তুইও হাঁক ছাড়তে পারিস। ও রইস, রইসরে তোকে নিয়ে আমি কি করব? তুই কোন্ কাজে লাগবি? হাল বাইতে পারিস না, মাছ মারতে পারিস না, সংসার দেখতে পারিস না। আঃ বুকটা আমার কেমন যে করে। আমি চাই তুই একটা কিংবদন্তি হয়ে যা রইস, রইসরে?
বুড়ি হঠাৎ করে রইসকে আঁকুনী দেয়। খামচে ধরে ওর দুই কাঁধ। রইস ফ্যালফ্যাল করে মা-র দিকে চেয়ে থাকে। তারপর ওর চোখ দিয়ে জল গড়ায়। ও শব্দ করে কাঁদে না। সে অশ্রুর দিকে তাকিয়ে থমকে যায় বুড়ি। রইসের মাথাটা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠে।
সংসারের আকর্ষণ বুড়ির শিথিল হয়ে আসে। সাদা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সলীম কাছে এসে বসে।
–মা তুমি কি এত ভাব?
–কই রে? বুড়ি হেসে ফেলে।
–হ্যাঁ ভাব। অন্য ঘরের চাচি খালার মত তুমি সংসার কর না। সারাদিন ব্যস্ত থাক না। ঝগড়া কর না। এত চুপচাপ থাক কেন মা?
–আমি ভাবছি তোর বিয়ে দিয়ে বৌ আনব ঘরে। সে এসে সংসার দেখবে। আমার এবার ছুটি।
–হ্যাঁ, তাহলে তো তোমার পোয়াবারো। যেটুকু সংসারে ছিলে তাও থাকবে না। সেটি হবে না।
–আমার তো বয়সও হয়েছে সলীম। তুই মত দিয়ে দে। আমি মেয়ে দেখি। তোরা সারাদিন বাড়ি থাকিস না। ঐ বোবা ছেলেটাকে নিয়ে আমার একলা কি করে যে কাটে সে তোরা কি বুঝবি? তুই না করিস না বাবা?
বুড়ি সলীমের হাত চেপে ধরে। সলীম মুখ নিচু করে থাকে। তারপর মাথা নাড়ে।
–ঠিক আছে দেখ। কিন্তু তোমার মনের মত হওয়া চাই। বৌ দিয়ে তুমি কষ্ট পাবে সে আমার সইবে না।
সলীম মা-র সামনে থেকে পালিয়ে যায়। বুড়ির খুশি লাগে। ইচ্ছে করে পুকুরে ঝাঁপিয়ে কিছুক্ষণ সঁতার কেটে আসতে। ওর ঘরে লোক আসবে। বাড়তি একজন মানুষ। বুড়ি এখন মানুষ চায়। চারদিকে অগণিত থৈ-থৈ মানুষ।
এর মাঝে একদিন নীতা বৈরাগিনী আসে। বুড়িকে দেখে চোখ কুঁচকে তাকায়।
–তোকে দেখে মনে হচ্ছে আমাদের বয়স হয়েছে সই। বুড়ি ম্লান হাসে।
–বেলা তো অনেক হলো। নীতা পা ছড়িয়ে বসে। আজ ও একা।
–তোর মনের মানুষ কৈ সই?
–আসেনি। বলল আমি বেরুতে পারব না। তুই ভিখ মেগে নিয়ে আয়। ও এখন এমনই করে।
–কেন চিড় ধরেছে বুঝি?
–এক রকম তাই। বড় জ্বালায়। ভাল লাগে না। একদিন ছেড়ে ছুড়ে চলে আসব।
বুড়ি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
–হাঁ করে দেখছিস কি? চাট্টি খেতে দে। যাই। ফিরতে দেরি হলে আবার রেগে। যাবে। এ বুড়ি ভাত আনতে যায়। মনে মনে ভাবে, নীতা যেন একটু বদলে গেছে। ও আর। আগের মত নেই। তখন ও নিজের সঙ্গে কথা বলে, ও বুড়ি তুই কি কম বদলেছিস? তুই তো আর আগের মত নেই। এমনি হয়রে বুড়ি। এমনি হয়। কেউ চিরকাল একরকম থাকে না।
–ও সই কৈ রে ভাত দিবি না?
ও আবার তৎপর হয়। ভাবনায় মগ্ন হয়ে হাত শিথিল হয়ে এসেছিল। ভাতের * সানকি আর জলের গ্লাস নিয়ে আসতেই নীতা খেকিয়ে ওঠে।
–তুই একদম ভারী হয়ে গেছিস। বাব্বা চাট্টি ভাত খাওয়াবি তাও আবার তাগাদা। দিতে হয়। নাহ্ তুই যেন কেমন হয়ে গেছিস সই?
নীতার কলাপাতায় ভাত ঢেলে দিতে দিতে স্নান হাসে বুড়ি। কথা বলে না। নীতা তাড়াহুড়ো করে খায়। বুড়ি এক কোচড় চাল দেয় ওকে।
–বাঁচালি সই। আজ আর দোরে দোরে যেতে হবে না।
নীতা কৃতজ্ঞতার হাসি হাসে। ওর শরীরটা গাছ-গাছালির আড়ালে মিলিয়ে যাবার পরও বারান্দায় খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকে। নীতা একটা দমকা ঘূর্ণির মত আসে। কিছুক্ষণ ধুলো উড়িয়ে সব কিছু এলোমেলো করে আবার চলে যায়। উঠোনে এঁটো কলাপাতা গড়ায়। বুড়ি সেদিকে তাকিয়ে থাকে। না, নীতা আর কিছুই ফেলে যায়নি। অথচ কেন যে মনে হচ্ছে সারা বাড়ি জুড়ে নীতা দবদবিয়ে হাঁটছে। সে শব্দ বুড়িকে অস্থির করে তুলেছে।
দুমাসের মধ্যেই ঘটা করে সলীমের বিয়ে হয়। সলীমের বৌ রমিজা, ছোটখাটো মিষ্টি মেয়ে। হাসি-খুশি। প্রথম দেখাতেই ভাল লাগে। বিয়ের পরদিন বুড়ি ওকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওদের বাড়ির সীমানা দেখাল।
–বুঝলে বৌমা এখন থেকে এসব তোমার। আমি আর কেউ না। আমাকে চারটে খেতে দিও তাতেই হবে।
রমিজা কথা বলে না। ঘোমটার ফাঁকে উৎসুক চোখ মেলে রাখে।–
-জায়গাটি তোমার মনে ধরেছে বৌমা? রমিজা মাথা নাড়ে।
–পারবে না সামাল দিতে।
–আপনি দেখিয়ে দিলে পারব।
–অমা দেখ মেয়ের বুদ্ধি। আবার আমাকে জড়ানো হচ্ছে। আমি আর নেইগো মেয়ে। এবার আমার ছুটি।
বুড়ি রমিজার থুতনি নেড়ে আদর করে। মাথার ঘোমটা টেনে ফেলে দেয়।
–এত ঘোমটা দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকলে সংসার দেখবে কে?
