এক সময় যৌবনের দিন ফুরিয়ে যায়। শীতে বর্ষায় বসন্তে টুপটাপ পাতা অনবরত ঝরে। বিরোধহীন দিনগুলো নির্বিবাদে গড়ায় ওদের। জলিল কয়েকবার গায়ে এসেছে একবারও দেখা করেনি বুড়ির সঙ্গে। ওর মেয়ে হয়েছে দুটো। কারো কারো কাছে জলিলের কথা জিজ্ঞেস করে বুড়ি। ও নাকি ভালই আছে। শহরে একটা দোকান। করেছে। এখন আর রিকশা চালায় না। গফুরের স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। হাঁপানি ধরেছে। ওকে। জমজমাট কাশি। রাতে ঘুমোতে পারে না। ঘোলা চোখে বুড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর জন্যে খারাপ লাগে। বুড়ির শরীর এখনো ভাঙেনি। ও কোমর সোজা করে হাঁটে। গফুরের হাঁটতে কষ্ট হয়! কিছুই ভালো লাগে না। মনে হয় দিন ফুরিয়েছে। তখুনি বুকের ভেতর আকাঙ্ক্ষা চড়চড়িয়ে বাড়ে। যৌবনের দিন ফিরে পেতে ইচ্ছে করে কেবল। পায় না বলে মেজাজ খারাপ থাকে। সবার সঙ্গে রাগারাগি করে। রইসকে দুমদাম পিটুনি দেয়। বুড়ির সঙ্গে খেকিয়ে কথা বলে। ও রাতদিন সেবা করে। গফুরের মন ভরে না। সব সময় খুঁতখুঁত করে। একদিকে অসুস্থ স্বামী, অন্যদিকে পঙ্গু ছেলে দুয়ের মাঝে ও হিমশিম খায়। কখনো সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে। জলিলের কথা মনে হয়। জলিল ওর সঙ্গে আর দেখা করে না। অনেকদিন ও গাঁয়ে আসে না। শহরে জলিল বেশ গুছিয়ে বসেছে। জলিলকে দেখার বড় সাধ হয়। যখন ও কাছে আসতো তখন অত টান ছিল না। দূরে সরে গিয়ে জলিল বুড়িকে উদাস করে দিয়েছে। এখন ওর মনের মধ্যে ব্যাকুল আর্তনাদ।
বুড়ি বুঝতে পারে না যে বুড়ো বয়সে গফুর কেন এত বদলে গেল? যে মানুষটা ওর জীবনের চারদিকে একটা বেড়া রেখেছিল সে এখন বেড়া ভাঙা পাগলা ঘোড়া। ওকে তছনছ করে দিতে চায়। ওর জীবনে এখন পারিবারিক শান্তি নেই। গফুর ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া বুড়িকে আক্রান্ত করে রাখে। রইসকে নিয়ে ক্ষেতে লাল শাক তুলতে গেলে ওর সঙ্গে কথা বলে, বুঝলি রইস তোর বাপটা একটা আস্ত হারামী। মাগো মা এমন লোক আমি দেখিনি। হতো যদি আমার জলিলের সঙ্গে বিয়া তাহলে ঠিক হতো। এখন শহরে থাকতে পারতাম রে রইস। উঃ কি যে মজা হতো। কেমন করে গাড়ি যায় ভো বাজিয়ে দেখতে পেতাম। দেখতাম শহরের মানুষকে। রইসরে তুই বড় হয়ে শহরে একটা চাকরি নিবি। তারপর আমাকে নিয়ে যাবি শহরে। ছয় মাস রাখলেই হবে। কি রে পারবি না? অমা হাঁ করে দেখছিস কি?
রইস অবাক হয়ে মার দিকে তাকিয়ে থাকে। চট করে একটা লাল শাকের মাথা ভেঙ্গে বুড়ির দিকে এগিয়ে দেয়। রইসকে বুকে তুলে কেঁচড় ভর্তি লাল শাক নিয়ে ঘরে ফেরে। রান্না ঘরের দাওয়ায় পা ছড়িয়ে শাক বাছতে বসে। ঘর থেকে গফুরের কাশির শব্দ আসে। বুড়ি, বুড়ি করে কয়েকবার ডাকে। ও সাড়া দেয় না। দিতে ভালো লাগে না। গফুর ডেকে ডেকে চুপ করে যায়।
৫. বেশ অনেক দিন অসুখে ভুগল গফুর
বেশ অনেক দিন অসুখে ভুগল গফুর। রইসের ঠিক তেরো বছরের মাথায় দুদিনের জ্বরে মারা গেল। কোনো কিছু ভাবার বা বুঝে উঠার অবকাশ ছিল না বুড়ির। অসুস্থ অবস্থায় ভীষণ জ্বালিয়েছে গফুর। কিন্তু মারা যাবার পর কেমন নিথর হয়ে গেল। বুড়ি। একটা লোকের অস্তিত্ব যখন নিঃশেষ হয়ে যায় সে তখন পরিবার পরিজনের সবাইকে অনুভবে গতিশীল করে। সে কারণেই গফুরের প্রতি প্রবল আকর্ষণ না থাকা সত্ত্বেও বুড়ির বুকের ভেতরের সবুজ বন হলুদ হয়ে যায়। লাল গোলাপের পাপড়িগুলো অকালে বাতাস ছাড়াই ঝরে যেতে থাকে। বুড়ি একলাফে বেশ বয়স্ক হয়ে যায়। মাথার চুল সাদায় ভরে ওঠে।
সলীম সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। ও আরো ধীর স্থির এবং গম্ভীর হয়েছে। সাংসারিক বুদ্ধিও খুব। অল্প কয়দিনেই সব গুছিয়ে ফেলে। জমিজমার হিসেব বোঝে চমৎকার। ধানের গন্ধে ও ছটফট করে। রাতে ঘুমোতে পারে না। ধান মাড়াইয়ের সময় সারারাত বারান্দায় বসে কাটিয়ে দেয়। সলীমের সব কিছু বুড়ির ভাল লাগে। রইস নির্বোধের মত বারান্দায় বসে থাকে। কখনো উড়ে যাওয়া পাখির দিকে তাকিয়ে হাততালি দিয়ে হেসে উঠে। বাঘার গলা জড়িয়ে ধরে। কুকুরটার সঙ্গে ওর ভারি ভাব। কুকুরটাও বেশির ভাগ সময় রইসের সঙ্গে সঙ্গে কাটায়। ওর আদর নেয়। ওর দিকে তাকালে বুড়ির আনন্দ নষ্ট হয়ে যায়। ও এখন বুড়ির সঙ্গে সুপপারি বাগানে যায় না কিংবা শাক তোলে না। বুডিও ডাকে না। বুড়ি আরো একলা হয়ে যায়।
কলীম চড়া গলায় গান গায়। ভাটিয়ালী সুরের আমেজ ওর গলায় অদ্ভুত আসে। বুড়ি মাঝে মাঝে মনোযোগ দিয়ে শোনে। ভাললাগে। বাপের মতো স্বভাব হয়েছে ওর। ভোর রাতে উঠে ডিঙি নিয়ে মাছ ধরতে যায়। ডাকাডাকি করে মাকে ওঠায়। জালটা আর খলুইটা যাবার সময় হাতে বুড়িরই তুলে দিতে হবে। নইলে ও কিছুতেই যাবে না। সন্ধ্যা রাতে বুড়ি জাল, খলুই ওর জন্যে গুছিয়ে রাখে। তাতে হয় না। ও বলে, তুমি আমার হাতে জাল তুলে না দিলে মাছ পাব না। বুড়ি জানে, এটাই কলীমের স্বভাব। ছোট থেকেই ওর ওপর এমনি আবদার করে আসছে। ভোর রাতে উঠতে অবশ্য বুড়ির খারাপ লাগে না। কলীম সুপারি বাগানের আড়াল থেকে চিৎকার করে, মা, মাগো আসি। তারপর লাফিয়ে ডিঙিতে ওঠে। তখন শুরু হয় গান। গান গাইতে গাইতে ও যখন আঁধারে মিলিয়ে যায় তখন অদ্ভুত একটা রেশ জেগে থাকে বুড়ির মনে। ভেসে আসা গানের ক্ষীণ সুর ধরে ও অনুভব করে এমন অনেক ভোর-রাত ওর নিজের স্মৃতির কৌটায় জমা আছে। একটুও নষ্ট হয়নি। একটুও দাগ পড়েনি। তবে গান গাইত না গফুর। বুড়ি সঙ্গে থাকত বলে। কেবল ওর হাতটা ধরে দ্রুত সুপারি বাগান পেরিয়ে যেত। কোন দিন সুপপারি বাগানের মাঝখানে জড়িয়ে ধরে চুমু খেত। বাদুরের পাখা ঝাপটানীতে ভয় পেয়ে গফুরের বুকের সঙ্গে মিশে যেত। বুড়ি কৌটার ঢাকনাটা বন্ধ করে দেয়। ভাবে, ছেলেদের জীবন এবং পারিপার্শ্বিকতায় কোন অসঙ্গতি নেই। সব ঠিক আছে। হাল বাওয়া, ধান বোনা, ধান কাটা, ধান মাড়াই, মাছ ধরা, ডিঙি বাওয়া। শুধু গফুর নেই। আর গফুর নেই বলে বিরাট কোন পরিবর্তন হয়নি। ওদের জীবনে ঝড় ওঠেনি। দারুণ রদবদলে দিকভ্রষ্ট হয়নি কেউ। কেবল একটা ছায়া আর উঠোনে পড়ে না। কাঁধের উপর জাল ফেলে কিশোরী বউয়ের হাত ধরে খালে যায় না। জলের সঙ্গে ভালবাসার খেলা গড়ে তোলে না। অনেক রাতে হাট থেকে ঘরে ফিরে বুড়ির নাম ধরে ডাকাডাকি করে না। এইসব ভেবে বুড়ির বুক যখন চেপে আসে তখন জলিলের কথা ভাবে। জলিলের ভাবনায় বুকের ভেতর অন্যরকম স্রোত অনুভব করে। সে স্রোতে ভেসে যায় পার্থিব যাবতীয় পঙ্কিলতা। জলিল মানেই অলৌকিক ঈশ্বর। বুড়ির নিরবচ্ছিন্ন প্রবহমান আনন্দ। যে আনন্দ ব্যতিক্রমী স্রোতে প্রবাহিত হয়ে ওকে অপার্থিব সুখ দেয় এবং প্রতিদিনের সংসারের বাইরে নিয়ে যায়।
