বুড়ির বুক ভার হয়ে থাকে। ও কাউকে ওর বুকটা খুলে দেখাতে পারে না। সেখানে বেদনার পাহাড় গড়ে উঠেছে। কখনো রইসকে বুকের মধ্যে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। ওকে বেশি করে আঁকড়ে ধরে। রইসের যেমন মা, তেমন রইস ছাড়াও বুড়ির পৃথিবী অন্ধকার।
রইসের তিন বৎসর বয়সে বুড়ি আর গফুর আর একবার শ্রীনাইল ধামে যায়। কেশাবাবার নামে মানত করে নিম গাছের ডালে পুঁটলি বাঁধে। এবার আর গফুরকে সাধাসাধি করতে হয়নি। বুড়ির প্রস্তাবে হেসেছিল।
বলেছিল, তুই না বললেও আমি তোকে নিয়ে যেতাম বুড়ি। জানি তোর ইচ্ছার তৃপ্তি হয়নি।
–ছি ওকথা বলতে নেই।
–সত্যি করে বলতো রইসকে নিয়ে তুই খুশি হয়েছিস?
–বাপ হয়ে এমন কথা বলতে নেই।
বুড়ি সরাসরি উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। এসব প্রশ্নের উত্তর হয় না। একটা পঙ্গু ছেলে তার মাকে ক্লান্তিহীন যন্ত্রণা ছাড়া আর কিইবা দিতে পারে? গফুর তা বোঝে। বোঝে বলেই বুড়ির মুখ থেকে কিছু শুনতে চায়।
শ্ৰীনাইল ধামে যাবার সময় গফুরের মনে হয়েছিল কে যেন সারাপথ জুড়ে এক বিরাট কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে। গতবারের মত বুড়ি এবার আর তেমন উৎফুল্ল নয়। পথের কষ্টে একটুতেই ক্লান্ত হয়ে যায়। উপরন্তু রইস বিরক্ত করে। কান্নাকাটি করে। মেঠো পথে হাঁটতেও কষ্ট হয়। কয়েকবার পথের মাঝে গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিয়ে তারপর মেলায় পৌছে ও। কোন রকমে নিম গাছে পুঁটলি বেঁধে ঘরে ফেরার জন্যে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মেলায় সারাদিন ঘোরাঘুরি করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও অনুভব করে না। বুড়ির চোখে-মুখে ক্লান্তি ছাড়া আকাঙ্ক্ষার কোন উজ্জ্বল আলোর রেখা আবিষ্কার করতে পারে না গফুর। ওর খুব খারাপ লাগে। মনে হয় বুড়ি হারিয়ে যাচ্ছে ওর জীবন থেকে। অথচ এবার ওর মনে কোন দ্বিধা ছিল না। ও ছিল সাধক পুরুষের সাধনার মত নিবেদিত চিত্ত। বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোন আশঙ্কা গফুরকে পিছু টেনে রাখেনি। গফুর আবার বুড়িকে ওর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে চায়। চায় বুড়ির সাহচর্যের ঘনিষ্ঠ উত্তাপ, নির্মল আনন্দ আর বেড়ার মধ্যে আটকে থাকা ঘর-ঘর খেলার সুখ।
তা কিন্তু না ফল হয়নি। জীবনের সোনার গোলাপ আর ফুটল না। সঙ্গত কারণেই রইস বুড়ির জীবনে আরো অপরিহার্য হয়ে ওঠে। গফুর সারাদিন বাইরে থাকলে, সলীম কলীম স্কুলে গেলে রইস ছাড়া পাশে আর কেউ থাকে না। মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ায় ছেলে–পুকুরঘাটে, রান্নাঘরে, চেঁকিঘরে, সুপোরি বাগানে। রইস কথা বলতে পারে না বলেই একা একা কথা বলা বুড়ির অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। এ জিনিসটা আগে ওর মধ্যে ছিল না। মনে হয় ওর মধ্যে একটা দিক পরিবর্তন হচ্ছে। ছেলেকে কেন্দ্র করে একটা অদলবদল ঘটছে। একা একা কথা বলতে দারুণ ভয় লাগে। সুপোরি বাগানে। লাল টকটকে সুপপারি কুড়োতে কুড়োতে বুকের ঝরনা খুলে যায়।
ও রইস, রইসরে তুই আমার একটা হাড়-জ্বালানি, পরাণ-পোড়ানি পোলা হলি রে। তোরে নিয়ে আমার দুঃখ ছাড়া সুখ নাই। তবু ভাল, তুই আছিস। না থাকলে তো সারা জীবন হা-হুতাশ করতাম। তুই আমার কানা ছেলে পদ্মলোচন।
বুড়ি শব্দ করে হেসে ওঠে। একটা লাল সুপোরি রইস মুখে পোরে। ও সেটা কোচরে পুরে রইসকে কোলে উঠিয়ে নেয়। বুকে জড়িয়ে ধরে চুমায় চুমোয় অস্থির করে তোলে। রইস হাত পা ছুড়ে নিচে নামতে চায়। বুড়ি সজোরে জাপটে ধরে। ও তখন কেঁদে ফেলে। বুড়ি দুম করে ওকে মাটির ওপর বসিয়ে দেয়।
–মায়ের আদর তোর সয় না। হতভাগা ছেলে। * বুড়ির চোখ ছলছল করে। আঁচলে চোখ মুছে নেয়। রইস গুটিগুটি পা ফেলে বুনো আগাছার মধ্য থেকে একটা সুপোরি উঠিয়ে আনে। বুড়ির দিকে তাকিয়ে হাসে।
ওরে দুষ্টু ছেলে মার সঙ্গে ইয়ার্কি হচ্ছে? আবার সুপপারি কুড়ানো হয়েছে। মাগো কত আমার উপযুক্ত ছেলে। হ্যাঁ রে রইস আমার বুড়ো বয়সে তুই আমাকে ভাত দিতে পারবি না? ওরে রইস বড় হলে মাকে কি তুই এখনকার মত ভালবাসবি না কি বৌর ন্যাওটা হয়ে যাবি?
রইস বুড়ির হাঁটু জড়িয়ে ধরে। দুহাত বাড়িয়ে কোলে উঠতে চায়। ও রইসকে বুকে তুলে কোচড় ভর্তি সুপপারি নিয়ে ঘরে ফেরে।
মাঝে মাঝে অবাক হয় গফুর। আশ্চর্য ধৈর্য বুড়ির। কোন দিন ছেলের গায়ে হাত তোলে না, একটুও বিরক্ত হয় না। সারাক্ষণ যেন দেয়াল তুলে আগলে বেড়ায়। এখন বড় আনন্দের সময় রইসের।
গফুর হুঁকো টানতে টানতে বলে, তুই বড্ড বেশি সইতে পারিস বুড়ি? এমন মা
আমি আর দেখিনি?
–আমি না সইলে ওর কে আছে বল?
গফুরের প্রশ্নের উত্তরে থমথম করে বুড়ির কণ্ঠ।
ছেলেটা কেন এমন হল বলত বুড়ি?
ও একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সুপপারি কাটায় মন দেয়। গফুরের হুঁকো থেকে গুড়গুড় শব্দ হয়। এক সময় সুপোরি কাটা থামিয়ে গফুরের মুখের দিকে তাকায়, ওগো আমার বোধহয় কোন পাপ ছিল।
গফুরের হুঁকো টানা থেমে যায়।
–না বুড়ি না। সব বাজে কথা।
বুড়ি ফিকে হাসে।
–মুরুব্বিরা তো বলে।
–ধুত! ওদের আবার কথা। ওরা মানুষের দোষ ধরতে পারলে বাঁচে।
* গফুর আবার হুঁকো উঠিয়ে নেয়। বুড়ি সুপপারি কাটে। কেউ কথা বলে না। কেবল কিছু শব্দ হয়। শব্দটা ছড়িয়ে যায় বাতাসে। বাইরে ঘুটঘুটে রাত। আজ অমাবস্যা। ছেলেরা ঘুমিয়ে গেছে। বুড়ি কুপি উস্কে দিয়ে উঠে যায়। গফুর বুড়িকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে হাজার রকম চেষ্টা করে। জানে ও আগলে ধরে না রাখলে বুড়ি ভেঙে যায়। ওর চোখ দিয়ে জল গড়ায়। চুপচাপ গিয়ে পুকুরঘাটে বসে থাকে। আসলে পাপ নয়। পাপের কথায় গফুরের বিশ্বাস নেই। পবিত্র ফুলের মত বুড়ি। পাপের স্পর্শ কেন থাকবে ওর জীবনে। ও তো কোথাও কোন ফাঁকি দেয়নি। কাউকেও ঠকায়নি। তবুও কেন যে এমন হয়ে যায় জীবনটা!
