–আমারও ভাল লাগছে না?
একই মিনমিনে ভঙ্গিতে সলীমের মা বলেছিল। সে ঘটনার পুরো ছবিটা গফুরের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু বুড়ি? বুড়ি যে কি পেয়েছে গফুরের তা বোঝার ক্ষমতা নেই। গফুর সে চেষ্টাও করে না।
বুড়ি এখন সাধক পুরুষের মত নিবেদিত চিত্ত। ব্যাপারটার মধ্যে সে সিদ্ধ পুরুষের আলৌকিক ক্ষমতা আবিষ্কার করে। ও এখন মুরুব্বিরা যা বলে সব শোনে। একটুও এদিক ওদিক করে না। খাওয়ার নিয়ম, গোসলের নিয়ম, রাত-বিরেতে বাইরে যাওয়ার নিয়ম কোনটাই বাদ দেয় না ও। মুরুব্বিদের চাপানো নিয়মগুলো বুড়ির মাথার উপর জগদ্দল পাথর। তবু দারুণ শান্ত মেয়ের মত সব পালন করে। একটুও কষ্ট নেই ওর। নিয়ম ভাঙ্গার দুর্বিনীত বেপরোয়া সাহসও নেই আর। গফুর মিটিমিটি হাসে–তুই একদম পাল্টে গেলি বুড়ি?
–পাল্টালাম কৈ? যখন যেমন তখন তেমন তো থাকতে হয়। বু
ড়ি চোখ কপালে ওঠায়।
–ইস একদম লক্ষ্মী মেয়ে। কদিন আগেও পাশের ঘরের চাচী কি বকাটাই না দিল তোকে।
–দেখ ভাল হবে না বলছি। সেততা মেলা দিন আগের কথা।
–ও তাই তো। ঠিক আছে একটু তামুক সাজ বুড়ি।
বুড়ি গম্ভীর মুখে তামুক সেজে আনে। গফুর ওর সঙ্গে রসিকতা করে। কখনো যেটা ওর একদম ভাল লাগে না। গফুর ওর গম্ভীর চেহারা দেখে আর কথা বাড়ায় না। পাছে কোন অঘটন ঘটে যায় সেজন্য বুড়ি এখন ভীষণ নিষ্ঠাবতী। ( ঠিক আট মাস পর বুড়ির ছেলে হয়। মাস পোরে না। মুরুব্বীরা বলে আট মাসে ছেলে হলে সেই ছেলে ভাগ্যবান হয়। বুড়ি অতশত ভাবতে চায় না। শুধু ফুটফুটে সেই ছেলের দিকে তাকিয়ে ও যাবতীয় দুঃখ ভুলে যায়। নিজের মধ্যে ভয়ানক পরিবর্তন অনুভব করে। সে ছোট শিশুর কচিমুখ ওর সমস্ত ভাবাবেগের শিকড় নাড়িয়ে দিয়ে গেল। কানে কানে বলে গেল, জীবনের অর্থ কত দ্রুত পাল্টে যায়। বুড়ি এখন অনেক বেশি আত্মস্থ। অস্থিরতা ওকে মাতিয়ে রাখে না।
ছেলের নাম রাখা হল রইস।
সলীম কলীম তো ছেলে দেখে মহা খাপ্পা। বাচ্চার হাত পা নেড়ে ওরা খুশি হতে পারে না।
–মা তোমাকে বললাম একটা বোন আনতে তুমি ভাই আনলে কেন?
–ঠিক আছে এর পরে একটা বোন আনবো।
–ভাই ভালো না খালি মারামারি হয়।
–আমার কোলে একটু দাওনা মা। কলীম বুড়ির গা ঘেঁষে বসে। ওদের কৌতূহলের অন্ত নেই।
–তুই ফেলে দিবি। দেখছিস না ও কত ছোট?
–ও বুঝেছি তুমি ওকে এখন থেকেই বেশি আদর কর।
–মোটেই না তোকে সবচেয়ে বেশি আদর করি। বুড়ি কলীমের কপালে চুমু দেয়।
–তুমি যখন ঘরে থাকবে না তখন আমি ওকে বাটুল দিয়ে মেরে ফেলব। ঠিক মারব। তুমি তখন ভেউ ভেউ করে কাঁদবে।
–তুই যেমন কাঁদিস অমন না রে?
বুড়ি হাসতে থাকে। সলীম কলীমের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। মুখে যত কথাই বলুক কলীমই রইসকে পছন্দ করে বেশি। ঘরে কেউ না থাকলে চুপিচুপি আদর করতে আসে। আর বেশি আদর করতে গিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে কাঁদিয়ে দেয়।
যত দিন যায় বুড়ি লক্ষ্য করে রইস যেন ঠিক স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে না। ওর দৃষ্টির মধ্যে আর দশটা ছেলের চপলতা নেই। ও কেমন বোকা হাবার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ওর সামনে শব্দ করলেও চমকায় না। ও বুক চেপে ধরে। দম আটকে আসতে চায়। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না তবু খটকা লাগে। এত সাধের ছেলে কি ওর বোবা আর কালা হল!
তবু ধৈর্য ধরে বুড়ি। কাউকে কিছু বলে না। নিজে নিজেই ছেলেকে বিভিন্নভাবে লক্ষ্য করতে থাকে। যতই দিন যায় বুড়ির ভয়টা গুটিসুটি পাকিয়ে ওঠে। আস্তে আস্তে আশঙ্কাটা সত্যে পরিণত হয়। বুড়ি একদিন আর্তনাদ করে ওঠে।
–ওগো দেখতো রইস আমার ডাকে সাড়া দেয় না কেন?
গফুর অনুভব করে বুড়ির ডাকটা সব হারানোর বেদনায় মুহ্যমান। ওর সর্বস্ব যেন খোয়া গিয়েছে। গফুরও ব্যর্থ হয়। না রইসের কোন রকম চেতনা নেই। ও আপন মনেই হাত-পা নেড়ে খেলে। হাসে। বাবা মা ভাইদের ডাকে ওর কিছু যায় আসে না। শব্দও করে না। রইসের হাবভাব লক্ষ্য করে গফুরও নিরাশ হয়। বুক ভার হয়ে থাকে। হ্যাঁ ঠিকই, পাশের ঘরের রমজান আলীর মেয়েটির মত ও সপ্রতিভ নয়। গফুরের মনে হয় সব অপরাধ ওর নিজের। বুড়ির মুখের দিকে ও চাইতে পারে না।
দিন যতই গড়াল ততই বুড়ির আকাঙ্ক্ষা নিঃশেষ করে দিয়ে রইস আর কথা বলল। হাবা-বোবা ছেলেটা বুড়ির সুখের খাচার দ্বিতীয় ভাঙন। ওর মনে আর কোন নতুন ভাবনার জন্ম হয় না। অন্য কোন কিছুতে মনোনিবেশ করতে পারে না। সব কিছু ঝেড়ে ফেলে রইসকে নিয়ে মেতে ওঠে। রইসই বর্তমানে ওর সব আনন্দের উৎস। ওর পঙ্গুত্ব, ওর অসহায়ত্ব বুড়ির মাতৃত্বকে আরো বেশি উদ্বেল করে। অনুভব করে ছেলেটা ওকে ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। এমনকি গফুরের প্রতিও ওর বিশেষ কোন আকর্ষণ নেই। গফুর কোলে নিতে চাইলেও যায় না। কেঁদেকেটে নেমে আসে। একদিন গফুর ওকে জোর করে আদর করতে গিয়েছিল বলে নাকের ডগার ওপর খামচে দিয়েছিল। রাগে গফুর ওকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।
–তোমার ছেলে তুমিই নাও।
বুড়ির খারাপ লেগেছিল। নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল গফুরকে। ফুসে উঠেছিল ও নিজেও।
–ছেলে আছে বলে ওর মর্ম তুমি বোঝ না।
গফুর রাগে আর কথা বলেনি। প্রায় সাত আট দিন কথা বন্ধ ছিল দুজনের।
কলীমের অনেক উৎসাহ ছিল রইসকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বোবা হওয়ায় কলীমও দমে যায়। কখনো রেগে ওঠে, মা ও কথা বলে না কেন? আমার একটুও ভাল লাগে না। ইচ্ছে করে দুটো ঘুষি লাগিয়ে দেই।
