–এত সুপপারি কি হবে?
–সকিনার ছেলের আকিকা হবে। ওরা কাটতে দিয়ে গেছে।
–শুনলাম শ্রীনাইল ধাম গিয়েছিলে?
–হ্যাঁ। কেশাবাবার ধামে মানত করে এলাম।
বুড়ির মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে! জলিল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, আসলে মানত করে কিছু হবে না। ডাক্তার দেখানো দরকার। গফুর ভাইকে বললো তোমাকে শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে।
–ডাক্তার? ডাক্তার কেননা? আমার তো কিছু হয়নি?
–সে সব মেলা কথা। আমিও অতো বুঝি না। আমার এক দোস্তকে দেখেছি ওর বউকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। ডাক্তার দেখেটেখে বলেছে ওদের কোন দিন ছেলেমেয়ে হবে না। ডাক্তাররা সব বুঝতে পারে।
জলিলের এমন আজগুবি কথা বুড়ি কিছু বুঝতে পারে না। হাঁ করে চেয়ে থাকে। ওতো জানে কেবল অসুখ করলেই লোকে ডাক্তারের কাছে যায়।
–কি সব আজেবাজে কথা।
–আজেবাজে নয় বুড়ি। খাটি কথা।
–থাকগে আমি শুনতে চাই না। বুড়ি রেগে যায়। সুপপারি কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে ফেলে।
–উঃ মাগো।
বুড়ি আঙুল চেপে ধরে উঠে যায়। ন্যাকড়া ছিঁড়ে আঙুল বাঁধে।
–দেখি বুড়ি কতোটা কেটেছে?
–না।
ও পুকুর ঘাটে এসে দাঁড়ায়। জলিলের কোন কিছু করার থাকে না। বুড়ির আচরণে বিরক্ত হয়। এসেছিল বুড়ির সঙ্গে ওর বিয়ে নিয়ে কিছু হাসি-তামাসা করবে। বুড়ি খুশি হবে। জলিলের মনতো খুশিতে টইটম্বুর। সব আনন্দ এমন করে মাটি হলো দেখে ও আর দাঁড়ায় না। কিছু কেনাকাটার জন্যে বাজারের দিকে যায়।
ঘাটের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে বিরক্ত হয় বুড়িও। জলিল এলেই এমন এক একটা কথা বলে যাতে বুড়ির সমস্ত অনুভূতি ওলোটপালোট হয়ে যায়। সেই কথাগুলো বুড়ি তার পারিপার্শ্বিকের জীবনযাপনের সঙ্গে মেলাতে পারে না। তখন বুড়ির কষ্ট বাড়তে থাকে। বুকের ভেতর যন্ত্রণার স্রোত প্রবলবেগে গর্জন করে। ও নিঝুম হয়ে যায়। কথা বলতে ভাল লাগে না। কাজ করতে ভাল লাগে না। কারো সঙ্গ অসহ্য ঠেকে। বুড়ি আজও পুকুর পাড়ে ঘুরে বেড়ায়। কলাগাছের আড়ে আড়ে প্রায় খালের কাছাকাছি যায়। ডৌয়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে খালের বুকে জোয়ার আসা দেখে। এই জোয়ার আসা দেখতে ওর ভীষণ আনন্দ। আস্তে আস্তে খালের বুক কেমন করে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে বিরক্তি ভুলে যায়। ও আবার আগের ধ্যানে নিমগ্ন হতে পারে। জলিলের আজেবাজে কথাগুলো জোয়ারের জলে ভাসিয়ে দেয়।
ধুমধাম করে জলিলের বিয়ে হয়। দুদিন পর ও বৌ নিয়ে শহরে চলে যায়। বুডির মন খারাপ হয়ে থাকে। কখনো চোখে জল এসে পড়ে। নিজেকে শাসন করে কুলিয়ে উঠতে পারে না। এর মধ্যে বুড়ির খুনখুনে বয়সী মা মারা যায়। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার দরুণ ওর মা-র মৃত্যু বাড়ির সকলের কাছে স্বস্তির কারণ হয়। সে মৃত্যু ওকেও তেমন ঘায়েল করে না। বরং মার কষ্টটাই ওর বেশি খারাপ লাগতো। তবু বুড়ি ডাক ছেড়ে কাঁদলো। ওর মনে হলো ওর জীবন থেকে একটা শীতল ছায়া সরে গেল। মার মৃত্যুর চাইতেও জলিলের বিয়ে বুড়ির মনে বড় বেশি দাগ কাটলো। বুড়ি কিছুতেই ভুলতে পারল না। যেন জীবনের সীমানা বদল হয়ে গেল। মানসিক আশ্রয়হীন হয়ে খোলা প্রান্ত রে ঝাঁ ঝাঁ রোদের দুপুরে উদোম, গায়ে ছিটকে পড়ল। বুড়ির সব অবলম্বন যেন নিঃশেষ।
যাবার আগে জলিল একদিন ঘাটলায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমার বউ কেমন বুড়ি?
–চাঁদের মত। শহরে তো নিচ্ছ। ধরে রাখতে পারবে তো? বুড়ি বাঁকা করে তাকিয়েছিল।
–এমন কথা কেন?
–এমনি বললাম।
বুড়ি হঠাৎ খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছিল।
–তোমাকে কখনোই বুঝতে পারি না।
জলিল মুখ কালো করে চলে গিয়েছিল। শহরে যাবার দিন আর দেখা হয় নি। এখন ঘুরেফিরে সেকথা মনে হয়। বুড়ি বুঝতে পারে না এত জটিলতা ওকে আক্রান্ত করে রাখে কেন?
ওদের বিবাহিত জীবনের সাত বছর কেটে যাবার পর ঠিক আট বছরের মাথায় বুড়ি সন্তানসম্ভবা হয়ে ওঠে। লক্ষণগুলো সব একে একে যতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ও ততই অস্থির হয়। যেদিন বুঝলো যে হ্যাঁ সত্যিই ওর ভেতরে পরিবর্তন এসেছে সেদিন দৌড়ে গফুরের কাছে আসে। গফুর কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়েছিল। বুড়ি এক টানে কথা সরিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর বুকে।
–কি হয়েছে তোর বুড়ি?
–দাঁড়াও বলছি।
বুড়ি পাগলের মত গফুরের বুকে মুখ ঘষে। বুড়ির এমন বেহিসাবি উচ্ছাস গফুর আর কোনদিন দেখেনি। কখনো এমন করে এত কাছে এসে ও ধরা দেয়নি। ওর যে কখন কি হয় বোঝা মুশকিল। আজ আবার কি হলো? অনেকটা সময় বুড়িকে শান্ত হতে দিয়ে গফুর আস্তে আস্তে ওর মুখ তুলে ধরে।
–কি হয়েছে বলবি তো? কিছু না বললে বুঝবো কি করে যে তোর সুখ না দুঃখ?
–ওগো বাবা দয়া করেছে।
–সত্যি?
–হ্যাঁ, আমি ঠিকই বুঝতে পারছি।
বুড়ি উত্তেজনায় হাঁফায়। এবার গফুরের পালা। খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে ও নিজেও। হঠাৎ মনে হয় খুশিটা শুধু বুড়ির একলার নয়। ওর নিজের ভেতরেও যে এত আনন্দ ছিল খবরটা না শোনা পর্যন্ত ও টের পায়নি। লজ্জায়, আনন্দে উদ্ভাসিত বুড়ির মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে গফুর। খুব সহজে সন্তান পেয়েছিল বলে সলীমের মা এমন করে খুশি হয়নি। আর দশটা সহজ পাওয়া বস্তুর মত ছিল সাদামাটা। বাচ্চা পেটে এসে গেছে চার মাস পর্যন্ত এটা সে নিজেও টের পায়নি। খবরটা জানার পর। গফুর ভীষণ বিরক্ত হয়েছিল।
–ধুত্ কি যে ঝামেলা?
–সলীমের মা মিনমিন করে বলেছিল, তুমি খুশি হও নি?
–না, একটুও না!
গফুর চেঁচিয়ে উঠেছিল।
