বুড়িকে বুঝতে পারে না গফুর। বুড়ির ভাসা ভাসা চোখ দুটো কল্পনার উচ্ছ্বাসে মুগ্ধ। যেহেতু বুড়ি জাগতিক সব ব্যর্থতা ও শূন্যতাকে একপাশে রেখে সুখের খাঁচা বুনতে পারে সেহেতু ওর চোখের তারা সহজেই ভেসে ওঠে। ও এখন মরুভূমিতে স্বপ্নের ফুল ফুটিয়ে চলেছে। ক্লান্তিহীন সে উৎসবে গফুরের কোন আমন্ত্রণ নেই। গফুর এখন পথের ধারে একলা। বুড়ির উৎসবে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে–বুড়ির উল্লাসমুখর হদয়ে ময়ূর নৃত্যের মতো।
–ওগো তুমি কি খুশি হওনি? বুড়ি আচমকা প্রশ্ন করে।
–একথা কেন বুড়ি?
–তোমার চোখ-মুখ কেমন শুকনো দেখাচ্ছে?
–ও কিছু না!
গফুর হেসে সহজ হবার চেষ্টা করে। বুড়িও আর প্রশ্ন করে না।
একটু পরেই গরুর গাড়ির ঢুলুনীতে ঘুমিয়ে পড়ে ও। গফুর দ্বিধান্বিত মন নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। শ্রীনাইল ধামের বুড়ো নিমগাছের ক্ষুদ্র বিশ্বাসের অঞ্জলি কি বুড়ির অনুর্বর জীবনকে ধন্য করতে পারবে? ছয় বছরের ব্যর্থ প্রহর গোনা কি শেষ হবে? নমিতার বিশ্বাস কি বুড়ির বিশ্বাসকেও মহীয়ান করবে?
ঘুমন্ত বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে গফুর কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। তাকিয়ে দেখে জনস্রোত। এখনো যাওয়া-আসা চলছে। দুদিন ধরে মেলা হবে। সবার লক্ষ্য এক–পৌষমেলা উপলক্ষে শ্রীনাইল ধাম। সবার বিশ্বাস এক বুড়ো নিমগাছে বাবার নামে সোয়া পাঁচ আনার পুঁটলি বাঁধলে আকাক্ষিত বস্তু পাওয়া যায়। কত দূর দূরান্ত থেকে লোক আসে। কত জনে সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে এই মেলার জন্যে। আশায় বুক বেঁধে রাখে। তাই ছুটছে সবাই। ছোটার শেষ নেই। আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণ চাই। আকাঙ্ক্ষার পরিণতি চাই।
গফুর অনেক দূরের তাল গাছের মাথায় তাকিয়ে থাকে। ওর শরীর ভেঙে আসছে। ইদানীং কেমন চট করে ক্লান্ত হয়ে যায়। এই মুহূর্তে গফুরের বড় বেশি খুঁকো টানতে ইচ্ছে করে।
৪. গাঁয়ে ফিরে বুড়ি
গাঁয়ে ফিরে বুড়ি বেশ একটা পবিতৃপ্তির ভাব নিয়ে দিন কাটায়। গফুর লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে দেখে। দেখতে ভালো লাগে। ঘাসের বুকে রঙিন প্রজাপতির কথা গফুরের মনে হয়। সংসারটা বুড়ির উচ্ছাসে একটা সবুজ মাঠ হয়ে গেছে। গফুরের। অশুভ আকাঙ্ক্ষা মিথ্যে হয়েছে দেখে ও আশ্বস্ত। বুড়ির মধ্যে সে হতাশা এখন নেই। মন খারাপ করে মুখ কালো করে দিন কাটায় না। চুপে চুপে কাঁদে না। সবার কথা ভুলে গিয়ে পুকুরঘাটে বসে থাকে না। যখন তখন গফুরের কাছে এসে দাঁড়ায়। ছেলেমানুষী করে। গফুরের মনে হয় বুড়ি এখন বাতাসে আঁচল ওড়ায়। ওর পালে হাওয়া লেগেছে। ছুটে ছুটে কাজ করে। সলীম কলীমকে আদরে ভরে তোলে। কলীম
একদিন অবাক হয়ে বলে, মা তুমি এত খুশি কেন?
অকস্মাৎ লজ্জা পায় বুড়ি।
–দূর পাগল খুশি কৈ রে?
–হ্যাঁ তুমি অনেক ভাল হয়ে গেছ। এখন আর আগের মত বক না।
–তোকে আমি কখনো বকি?
–আগে একটু একটু বকতে এখন তাও না। বল না মা তোমার কি হয়েছে। বুড়ি উত্তর দিতে পারে না। ব্ৰিত বোধ করে। পাশ কাটাবার চেষ্টা করে।
–আমার বুড়ো বাপের মত প্রশ্ন শুরু করেছে। যা খেলগে যা।
–না বললে যাব না। কিছুতেই যাব না। কলীম জেদ করে।
–এখন খেলতে গেলে বিকেলে কিন্তু নাড় বানিয়ে দেব।
–সত্যি তো?
–হ্যাঁ সত্যি।
কলীম চলে যায়। গফুর মিটমিটিয়ে হাসে।
–তোমার হাসি দেখলে গা জ্বালা করে।
বুড়ির মুখ লাল হয়ে ওঠে। গফুর আরো জোরে জোরে হাসে। হাসতে হাসতে বুড়ি কে জড়িয়ে ধরে। শ্রীনাইল ধামে যাবার আগের দিনগুলোর বুড়ির জঘন্য বিষন্নতার নিচে গফুর তলিয়ে যাচ্ছিল যেন। ওখান থেকে ফিরে আসার পর আবার মাথা উঁচিয়ে উঠেছে। বুড়ি এখন আশ্চর্য সতেজ আর প্রফুল্ল। এমন কি কলীমের বেশি আবদারে মাঝে মাঝে রান্না ঘরের পাশে মারবেলও খেলে। পড়শিদের সঙ্গে এখন গভীর হৃদ্যতা। গফুরের মনে হয় বুড়ি কি নমিতার মতো এক গভীর বিশ্বাসের আকাঙ্ক্ষাকে বুকে লালন করছে। এখন বুড়ির বুকের মধ্যে এক নিষ্ঠার স্রোত বয়ে যাচ্ছে।
দিন গড়ায়। মাস গড়ায়। মাস আটেক কেটে যায়। বুড়ি তবু বিশ্বাস হারায় না। গফুর একদিন ঠাট্টা করে।
–তোর বাবাতো দয়া করছে না বুড়ি?
বুড়ি গফুরের মুখ চেপে ধরে।
–ছি বাবার নামে এমন করে বলে না। একদিনে কি আর সব হয়? জানো না সবুরে মেওয়া ফলে। ধৈর্য ধরলে ঠিক ফল পাব।
–হ্যাঁ ভাল। আস্থা রাখা ভাল।
গফুর মনে মনে আশ্বস্ত হয়। বুড়ির ছেলেমেয়ে হোক বা না হোক গফুরের কিছু আসে যায় না। কিন্তু বুড়িকে যে নতুন করে পাওয়া গেছে এটাই লাভ। এ উপরি পাওনার মূল্যও তো কম নয়। ও মনে মনে শ্রীনাইল ধামের কেশাবাবাকে কৃতজ্ঞতা জানায়। বাবা তাকে দয়া করেছে ঠিকই।
এর মাঝে জলিল আসে শহর থেকে। ওর বিয়ে ঠিক করেছে ওর মা। বৌ খুব সুন্দরী। বৌ নিয়ে শহরে চলে যাবে। জলিলের বাবা নাই। মা-ই সব। আর মায়ের ও একই ছেলে। জলিলকে দেখেই বুড়ি বিষন্ন হয়ে যায়। জলিল কিছু বলার আগেই বলে, তোমার বিয়েতে আমি যাব না জলিল?
জলিল বিস্মিত হয়। ছোটবেলায় দুজন দুজনকে তুই বললেও এখন কেউ কাউকে তুই বলে না। বুড়ির মুখের দিকে চেয়ে জলিল কিছুই আঁচ করতে পারে না।
–তোমার কি হয়েছে বুড়ি?
–কিছু না।
–তবে আমার বিয়েতে কি দোষ হলো?
–কিছু না।
জলিল কি বলবে ভেবে পায় না। দুজন কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটায়। বুড়ি একমনে কুটুস-কুটুস সুপোরি কাটে। বুড়ির মতো এমন চিকন করে সুপপারি আর কেউ কাটতে পারে না। বিয়ে, উৎসবে ওর খাটুনি বেড়ে যায়। ডালা ডালা সুপারি কাটতে কাটতে কোমর ব্যথা হয়।
