গফুর হেসে ওর আশংকা উড়িয়ে দেয়।
ওতে কিছু হয় না। বিশ্বাসটাই আসল। তুই যেমন কেশা বাবাকে ধ্যানজ্ঞান করেছিস ওতেই হবে।
গফুরের কথায় বুড়ি আশ্বস্ত হয়। গফুর এখানে এসে মাতামাতি করেনি। কোন কথাও বলেনি। বুড়ির বিশ্বাস ভক্তিকে উপেক্ষা করে অবহেলায় উড়িয়ে দিতে পারেনি। যদিও নিজের মধ্যে বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোন ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছিল না। বিশ্বাসের চাইতে যুক্তি প্রবল হয়ে উঠলে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায় ও। গফুর মনে মনে বুড়ির জন্যে আপস করে।
কেশাবাবার ধামে মানত করার পর হালকা হয়ে যায় বুড়ির মন। গফুরের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে মেলা দেখে। মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা, কাগজের পাখি, রকমারি খাবার। আরো কত কি নিয়ে বসে আছে! সলীম লীমের জন্যে কাঠের ঘোড়া আর হাতি কেনে। মাটির পাখিও নেয়। কলীমের বায়না ছিল বাঁশি। বুড়ি কেনে হাত-ভর্তি কাঁচের চুড়ি, নাকের নোলক, কানফুল। খুশির অন্ত নেই ওর। গফুরের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি কি নেবে?
–আমি? আমি আর কি নেব?
–তুমি একটা গামছা নাও আর একটা খলুই।
–খলুই? খলুই দিয়ে কি হবে? তুইতো আর মাছ ধরতে যাস না?
–এই জন্যেই তো নেবে। আমি গেলে তো আর মাছ ধরা হয় না। শূন্য খলুই ঘরে ফেরে।
–তাই তো, ঠিক বলেছিস। তবু শূন্য খলুই আমার জন্যে ভালই ছিল বুড়ি।
বুড়ি গফুরের চোখে একপলক দৃষ্টি ফেলে অন্যদিকে মুখ ফেরায়। গফুরের কণ্ঠে ওর মন ছুঁয়ে যায়। তারপর দুজনে মিলে গামছা আর খলুই কেনে। ঘুরতে ঘুরতে দেখে বিরাট এক কড়ই গাছের নিচে নীতা আর চরণদাস দলবল নিয়ে আসর জমিয়ে তুলেছে। বুড়ি থমকে দাঁড়ায়। কত আবেশভরে গান গাইছে নীতা। চোখ দুটো বোজা, টুংটাং দোতরা বাজায় চরণদাস। বুড়ির মনে হয় এ নীতা সইকে ও চেনে না। সেই পরিহাস প্রিয় চটুল নীতা এ নয়। ও এখন অন্য জগতের বাসিন্দা। এ জগৎ বুড়ির একদম অপরিচিত; এ জগতের মর্মও ও বোঝে না। হঠাৎ মনে হয় কেশাবাবার ধ্যানে নীতাকেই মানায়, বুড়ি এখানে বড্ড বেমানান। নীতার মত সব ভুলে ডুবে যাওয়া মন বুড়ি কোথায় পাবে? নীতার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। বলবে, সই তোর মত আমাকে করে নে। নইলে আমার মনের আশা বোধহয় পুরবে না।
গফুর ওর হাত ধরে টানে, চল। বেলা পড়ে যাবে।
বুড়ি মন্ত্রমুগ্ধের মত বলে নীতা?
–ও এখন তোকে চিনবে না। দেখছিস না ধ্যানে রয়েছে।
–ধ্যান বুঝি? গান গাইছে তো?
–ওই একই কথা। ওদের গানই ধ্যান।
–তাই তো।
বুড়ি এতক্ষণে বুঝতে পারে। ঐ গানই নীতার একমাত্র অবলম্বন। অত লোকের মাঝ থেকে নীতাকে ডাকা সম্ভব হয় না। বুড়ি গফুরের সঙ্গে চলে আসে। দোতরার টুংটাং ধ্বনি ওর মনটাকে নরম করে রাখে। নীতার নির্লিপ্ত মুখটা ছবি হয়ে আটকে থাকে মনের পটে। মনে মনে বলে, নীতার বিশ্বাস, নমিতার বিশ্বাস আমার জীবনকে ভরিয়ে তুলুক।
সারাদিন মেলায় ঘোরাঘুরি করে বুড়ির মনে হয় একটা নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছে। মুক্তছন্দ বিহঙ্গের মতো এমন করে কোন দিন বুড়ি নিজেকে একান্ত আপন করে পায়নি। বুড়ির নিজস্ব কতগুলো মুহূর্ত ছিল। এক একটা দিনতো ওর কাছে স্বপ্নের মতো। তাই মনে হয় আজকের এই দিনটি ওর একলার। শুধু ওর নিজের। আর কারো না। আর কোন লোকের নয়। পৌষমেলার শত শত নারী-পুরুষের অন্তরে বুড়ি কেবল নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। শুকনো ধুলো-ওড়া দিন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তরে বাতাসের কনকনে স্পর্শ, মেলার হৈচৈ কোন কিছুই বুড়িকে ক্লান্ত করে না। ক্লান্ত হয় গফুর। ধুলোয় চোখ-মুখ ঝাঝা করে। কাশতে কাশতে গলা চিরে যায়। তাছাড়া এত লোকের ঠেলাঠেলিতে ও আরো বিরক্ত হয়ে ওঠে। শীতের মিষ্টি আমেজময় রোদও আজ কেমন। পানসে ঠেকে। মেজাজ তেতে উঠলে গফুরের শরীরের ভেতরটা রি রি করে। তবু বুড়ির অনাবিল আনন্দঘন উজ্জ্বল মুখাবয়ব গফুরকে বিমুগ্ধ করে। অনেকদিন পর বুড়ি যেন কৈশোরের লাবণ্য ফিরে পেয়েছে। আর সে কারণেই গফুর ওর মেজাজের ঘোড়াটার লাগাম টেনে রাখে। ভেবে অবাক হয় এমন তেজ বুড়ি কোথায় পেল? গফুর কেন জোর। করেও এই তেজ ধরে রাখতে পারছে না? কেন বারবার মনের সুতো ছিঁড়ে যায়?
–ওগো তুমি কি ভাব?
–কিছু না রে বুড়ি। চল ফিরে যাই।
–এখনও তো বেলা পড়েনি। বুড়ির কণ্ঠে আপত্তি।
–ছোট দিনের বেলা। ফিরতে আঁধার নামবে!
–নামুক!
বুড়ি ঘাড় বাঁকা করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। গফুর হেসে ফেলে।
–ঠিক আছে চল ভাত খাই।
রাস্তার পাশে বেড়ায় ঘেরা ছোট এক হোটেলে ঢুকে ভাত খায় দুজনে। তার পরই ঘুম পায় গফুরের। কিন্তু বুড়ির বায়না ম্যাজিক দেখবে। অগত্যা ম্যাজিকের জন্যে বসতে হয় গফুরকে। গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসার সঙ্গে সঙ্গে ঝিমিয়ে আসে শরীর। মাঝে মাঝে বুড়ির ছেলেমানুষী হাততালি ওকে সচকিত করে তোলে কেবল।
ফেরার পথে বুড়ির চোখে ঝিলমিল করে আলোর নাচন। আলের উপর দিয়ে হাঁটা পথটুকু লাফিয়ে লাফিয়ে পেরিয়ে যায়। বার বার পেছনে পড়ে যায় গফুর। এত ক্লান্ত ও বুঝি আর কোনদিন হয়নি। মাঠ পেরিয়ে গরুর গাড়িতে ওঠার পর হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। গাড়ির ক্যাচর ক্যাচর শব্দের সঙ্গে শীতের রুক্ষ দিন বার বার হতাশ করে দিচ্ছিল গফুরকে। বুকের ভেতর স্বপ্নের নীল পাখিটা আর গান গায় না। গফুরের মনে হয় কি যেন এখানে রেখে যাচ্ছে। শ্রীনাইল ধাম ওর সমস্ত সুখটুকু কেড়ে রেখে ওকে দেউলে করে দিয়েছে। এখন বুড়ির দিকে তাকাতে ভয় হচ্ছে ওর। যদি ব্যর্থ হয় দিন গোনার প্রহর? তাহলে সেই নিরুত্তাপ জীবনহীন বুড়িকে নিয়ে ঘর করবে কেমন করে ও? একটা আতঙ্ক বুকে তীরের মত বিধে থাকে। কোনক্রমেই তাকে আর টেনে বের করা যায়। না। গফুর উদাসী দৃষ্টি মেলে রাখে রুক্ষ মাটি, শুকনো গাছ, হলদে পাতা, বিবর্ণ ঘাসের বুকে। গরুর গাড়ির প্রাণহীন পথ চলা বুড়ির আশাহীন ভবিষ্যতের মতো।
