আমরা উঠি-রে সই। এখুনি রওনা করা দরকার। নইলে আবার ঠিকমত পৌছতে পারব না। জানিস তো পথে পথে কত জায়গায় বসতে হয়।
বুড়ি ঘরে গিয়ে ডালা ভর্তি মুড়ি আর গুড় নিয়ে আসে।
–তোর তাড়া আছে। আমার তো রান্না হয়নি সই। এখন এই খা।
–খাও ঠাকুর। সই আমাদের পেসাদ দিয়েছে।
নীতা এক মুঠি মুড়ি গালে পুরে।
সই আমাদের যা দেয় তাতেই মন ভরে যায়। চরণদাস মুখ তোলে না। লম্বা বাবরি ঘাড়ের ওপর ছড়িয়ে থাকে। টুংটাং করে দোতরা বাজায়। যেন চরণদাসের অন্য কোন দিকে মন নেই। বুড়ি চরণদাসের দিকে তাকিয়ে থাকে।
–কি গো ঠাকুর তুমি যে আমার সইয়ের দিকে মুখ তুলেই চাইছ না?
–তোমার ঠাকুর রসের নাগর নয়? বুড়ি খিলখিলিয়ে হাসে।
–দিল তো সই তোমাকে ঠুকে? নীতা চরণদাসের হাঁটুতে চাপ দেয়।
চরণদাস কপালের উপর এসে পড়া চুল হাত দিয়ে পিছনে ঠেলে বড় বড় চোখে বুড়ির দিকে তাকায়। সে দৃষ্টিতে বুড়ি হকচকিয়ে যায়। কিছুটা ব্রিত বোধ করে। চরণদাসও চোখে চোখ রেখে বলে, সে কি আর যেখানে সেখানে পড়ে সই? জায়গামত পড়লে যে রস শুকিয়ে যায়।
–ওমা তাই নাকি? তোর মনের মানুষ চুপচাপ থাকলে কি হবে সই কথার তীর তৈরি করে রাখে। জায়গা মত ছুড়ে মেরে একদম ঘায়েল করে দেয়।
চরণদাস কিছু বলার আগে বুড়ি রণেভঙ্গ দিয়ে পালায়। ওরা দুজনে হাসতে থাকে।
নীতা ফিসফিসিয়ে বলে, যেখানে রস ফেলেছো সেটা জায়গামতো হয়েছে তো?
–একদম। না হলে কি আর সঙ্গে নিয়ে পথে পথে ঘুরি।
চরণদাস একমুঠি মুড়ি গালে পুরে এবং মুড়ি খেতেই মনোযোগী হয়ে ওঠে। নীতা এক মনে মুড়ি চিবোয় আর ধান মাড়াই দেখে। এ দৃশ্যের সঙ্গে ওর জীবনের কোন যোগ নেই। কেবল ভিক্ষে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। গোলা ভরা ধান কি নীতা জানে না। পরক্ষণে ও হেসে ওঠে। এ বন্ধন ও চায় না। এর চেয়ে পথে পথে ঘোরাতেই। আনন্দ বেশি। সব কাজ কি আর সবার সাজে? চরণদাস অবাক হয়, হাসছিস যে?
–এমনি।
–বল না কি?
–ভাবলাম বুড়ির মতো সংসার আমি করতে পারব না।
–আর বুড়িও তোর মতো পথে পথে ঘুরতে পারবে না।
–ঠিক। দুজনেই হাসে।
–এই যে সই এবার তাহলে উঠতে হয়।
–যা-বি? আবার কবে আসবি? বুড়ির কণ্ঠে ব্যাকুলতা ফুঠে ওঠে।
–মেলায় তো তোর সঙ্গে দেখা হবে।
–হবে তো?
–হ্যাঁ-রে হবে। আমি তোকে খুঁজে নেব। তুই কিছু ভাবিস না। এবার তোর মনের সাধ পুরবে সই। তুই দেখিস আমার কথা ফলে কি না?
–তাই যেন হয়।
বুড়ি মনে মনে বলে। ওরা ঝোলাঝুলি কাঁধে বেরিয়ে যায়। ওদের অপসৃয়মাণ দেহ পথের বাঁকে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে বুড়ি। এই ধান মাড়াই, গরু, কাজের লোক, সজনে গাছ বুড়ি ভুলে যায়। পুকুর ঘাটে গিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে হঠাৎ করে এই পরিচিত সব কিছু কেমন বিস্বাদ হয়ে যায়। জঘন্য, নোনাধরা এই ঘর-সংসার। বুক ভেঙে যায়। চোখ ফেটে জল আসে। ঘরে ফিরে কথায় মুখ গুজে প্রাণ খুলে কাঁদে বুড়ি।
পরদিন বুড়িকে নিয়ে রওনা হয় গফুর। পথের কষ্ট বুড়ির কাছে কোন কষ্ট বলেই মনে হয় না। গফুরের মনে হয় ওর ভেতর এখন একটা দৈবশক্তি সঞ্চারিত হয়েছে। সব কষ্ট উপেক্ষা করার জীয়নকাঠি পেয়েছে। গরুর গাড়ির দুলুনির সঙ্গে ভাবনা মিলিয়ে চুপচাপ বসে থাকে বুড়ি। পথের দিকে দুচোখ মেলে রাখে। হলদী গাঁ-র বাইরে এই প্রথম ওর যাত্রা। গাঁ-র বাইরে গাঁ আছে। মাঠের বাইরে মাঠ। সেই মাঠের উপর দিয়ে দৃষ্টি চালালে কোথাও আটকায় না। পথের বাঁকে নতুন পথ বেরিয়ে যায়। সে পথ কত নাম না জানা দিকে চলে গেছে। ও কেবল অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। গাঁর বাইরে গায়ের রূপ বদলে যায়। পরিচিত গাছ গাছালি, একই ধরনের ঘর-বাড়ি তবুও বুড়ির মনে হয় সব গাছের রঙ আলাদা, সব ঘরের আদল আলাদা। কোন কিছু চিনতে পারছে না ও। বুড়ি বুক ভরে এই অচেনা জায়গায় শ্বাস নেয়। গন্ধেও পরিচিত হলদী গা-টা কোথাও আর খুঁজে পাচ্ছে না ও। বুক ভরে যায়। ও একটা নতুন জায়গায় আসতে পেরেছে। এই আনন্দকে সম্বল করে ও কৈশোরে ফিরে যায়। ক্রমেই শ্রীনাইল ধাম এগিয়ে আসে।
গরুর গাড়ির রাস্তা একসময় শেষ হয়। মাঠের আল ধরে পায়ে হাঁটা পথ। ক্লান্তি নেই বুড়ির। ধান কাটা হয়ে গেছে। নেড়া মাঠ ধূ-ধূ করে। হাঁটতে ভাল লাগে ওর। ছোটবেলায় এমনি মাঠে মাঠে কত ঘুরে বেড়িয়েছে। নাড়ার আগুন জ্বালিয়ে ছোট হাঁড়িতে রস জাল দিয়েছে। মিষ্টি আলু পুড়িয়ে খেয়েছে। শৈশব আর কৈশোর বুড়ির জীবনের লুকানো গুহার মণি-মানিক্য। মাঝে মাঝে সে গুহার দরজা খুলে সেই চাকচিক্য নাড়াচাড়া করে। স্বপ্নের ঘোরে পথ চলতে গিয়ে হোঁচট খায় বুড়ি। পেছন থেকে ধরে ফেলে গফুর।
–একটু দেখে শুনে হাঁটতে হয় তো? ভীষণ লজ্জা পায় ও।
–কেমন করে যে হয়ে গেলো।
বুড়ি একমনে মানুষের পথচলা দেখে এগিয়ে চলে। যতই শ্রীনাইল ধাম এগিয়ে আসে ততই মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কাল কাল মাথা অগণিত হয়ে ওঠে। দূরে মেলার ঘরের চালা দেখা যায়। একটা মৃদু গুঞ্জনও ভেসে আসে। ধান ক্ষেতের আল ছাড়িয়ে বুড়ি সমতলে এসে ওঠে। খালি পা ধূলিধূসরিত হয়ে যায়। গফুর ওকে পেছন থেকে ডাক দেয়, আস্তে চল বুড়ি।
বুড়ি আবার লজ্জা পায়। চলার গতি কমিয়ে দেয়। বুড়ো নিমের চিরল পাতায় ওর স্বপ্ন-রঙিন মনের পট আঁকা হয়ে যায়। ও আবেগে কাপড়ের পুঁটলিটা বুকের কাছে চেপে ধরে।
ধামে গিয়ে ভক্তিভরে বাবার নামে মানত করে নিমগাছে পুঁটলি বাঁধে। ধুলো মাখে সারা শরীরে। তবে অন্যসব নারী-পুরুষের মতো মাটিতে গড়াগড়ি দেয় না। ভীষণ সংকোচ লাগে ওর। কিছুতেই নিজের সঙ্গে পেরে ওঠে না। নিজের মনকে কয়েকবার শাসন করে। মনে মনে বলে, বিশ্বাসে ফুটো রাখতে নেই। তবুও হয় না। নিঃশব্দে ধুলো মেখে উঠে আসে। গফুরকে বলে, আমি যে গড়াগড়ি করলাম না ফল পাবো তো?
