–আচ্ছা ঠিক আছে। সময় হলে নিয়ে যাব। তাও যদি তোর মনের সাধ মিটে। গফুরের বুকে মুখ গুঁজে গুটিশুটি শুয়ে পড়ে বুড়ি। খুশি খুশি লাগছে। আজ রাতে গফুরের ইচ্ছের কাছে নিজেকে একদম নিবেদন করে দেয়। একটা কথাও বলে না। একটা আপত্তি না। পলকে অনুভব করে ওর নিজের ভেতরেও কেমন একটা ইচ্ছে সমস্ত রক্তে চলাচল করে। রাতের অন্ধকারের মতো সব আকাঙ্ক্ষাও গাঢ় হয়ে ওঠে। বাইরে লক্ষ্মী পেঁচা ডাকে। হয়তো আকাশে চাদও আছে। বাঁশবন সন্সর করে। ভোররাতে দুজনে ডিঙি নিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়ে। আজকের উদ্দেশ্য আর মাছ ধরা নয়। খালের বুকে নিজের খুশি ছড়িয়ে দেবার বাসনায় বুড়ির তাগিদ ছিলো বেশি। আর গফুরতে উন্মুখ হয়ে থাকে। এমনি করে বুড়ির খেয়ালের স্রোতে ডুবে যাওয়ায় কি যে আনন্দ! কাদার গায়ে খালের জল ছলাৎ ছলাৎ করে। পাড়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কাশবন। লম্বা লম্বা ঘাসের মাথা দেখা যায় পানির তলে। কেমন কাল দেখায় পানি। সে পানিতে নিজের ছায়া দেখতে পায় না বুড়ি। দেখার চেষ্টাও করে না! এখন আর অন্য কিছুতে মন নেই ওর। পাটাতনের ওপর শান্ত হয়ে বসে থাকে। মনে মনে ভাবে, গফুরের এখন শালুক কামড়ে খেতে ইচ্ছে করছে। গফুর যে কি! শালুক পেলে মাছের কথা বেমালুম ভুলে যায়। নৌকায় এলেই ও বেশি চুকচুক করে। গফুর বলে ঘরের চাইতে নৌকায় পেতে সুখ লাগে। ফাঁকা মাঠের দিকে তাকিয়ে বুড়ি হাসে। ডিঙি তরতরিয়ে চলে। গফুর নিশ্চয় কোন নিরাপদ জায়গা খোঁজে। যেখানে নিবিড় আচ্ছাদন প্রাকৃতিক উষ্ণতা দেয়। গফুরের মুখের দিকে তাকিয়ে বুড়ি ওকে বুঝতে চেষ্টা করে। কিন্তু অন্ধকারে কোন ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় না। এখন ওর জলিলের কথা মনে হয়। জলিল ওর স্মৃতিপট দখল করে নেয়। ও কিছুতেই জলিলকে তাড়াতে পারে না। বুড়ির বিয়ে হবার পরই পালিয়ে শহরে চলে যায়। রিকশা চালায়। শহরে নাকি ও বেশ ভালোই আছে! জলিল গাঁয়ে এলে ওর কাছে শহরের অনেক গল্প শোনে বুড়ি। শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে যায়।
জলিল একদিন চুপি চুপি বলেছিল, আমার সঙ্গে বিয়ে হলে তোকে আমি শহরে নিয়ে যেতাম বুড়ি। বুড়ি ওর কথায় রাগ করতে গিয়েও পারেনি। আসলে এটাই হওয়া উচিত ছিল। জলিল পালিয়ে যাবার পর কত জায়গা ঘুরেছে, কত কাজ করেছে। চায়ের দোকান, মানুষের বাসা, হোটেল, মোটর গ্যারেজ ইত্যাদি অনেক জায়গার পর ও এখন রিকসা চালায়। বুড়ির বুক কেমন করে। আচ্ছা জলিল কি ওর মনের মানুষ হতে পারতো? এটা কখনও ভেবে দেখেনি ও। অনবরত জলিল ওর হৃদয়ে লেপ্টে যায়। আস্তে আস্তে জলিল ওর শরীরে প্রসারিত হতে থাকে। বুড়ি শক্ত করে নৌকা চেপে ধরে। দাঁত কিড়মিড় করে।
–তোর কি হয়েছে বুড়ি? কি ভাবছিস যেন?
–জলিলের কথা ভাবছি?
–জলিল? গফুর ভুরু কুঁচকে তাকায়।
–জলিলের কথা ভাবছিস কেন?
–এমনি। মনে এলো তাই।
বুড়ি খান-খান হাসিতে ভেঙে পড়ে। চরাচরের অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। গফুরের হাতের বৈঠা থেমে যায়। সেই পরিচিত তেঁতুল গাছটার কাছে এসেছে ওরা।
–কি ভয় পেলে নাকি?
–কত ধরনের রসিকতা যে তুই জানিস বুড়ি?
গফুর হেসে সহজ হবার চেষ্টা করে। ডিঙি বাঁধার জন্যে লাফ দিয়ে নামে। বুড়ি মনে মনে হাসে। গফুরের কাছে ওটা রসিকতা হয়েই থাক। ও আবার নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়।
পৌষ মেলার দুদিন আগে নীতা এসে হাজির। সঙ্গে তার সঙ্গী চরণদাস। বেঁটেখাটো ফর্সা, মোটা মানুষটি। মুখে হাসি লেগেই থাকে। গানের গলা ভাল না। ফ্যাসফ্যাস করে কণ্ঠ। দোতরার টুংটাং শব্দে বুড়ি ঘর থেকে ছুটে আসে। ধানের মাড়াই। হচ্ছে উঠোনে। পা ফেলার জায়গা নেই। বুড়ি চরণদাসকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। নীতা হাসে।
–অমন করে দেখছিস কি সই? মনের মানুষ খুঁজে পেয়েছি রে।
–ওমা, তাই নাকি।
বুড়ি ফিক করে হেসে ফেলে। ধান মাড়াইয়ের পাশ দিয়ে ওদের ডেকে এনে বারান্দায় বসায়। কামলাগুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। নীতা পোঁটলা-পুঁটলি নামিয়ে পা ছড়িয়ে বসে। ধূলি-ধূসরিত পা। রুক্ষ চুল বাতাসে ওড়ে। গায়ে-পিঠে ঠিকমত কাপড় নেই। সব এলোমেলো। জোরে একটা শ্বাস টেনে বলে, কাঁচা ধানের গন্ধে মন ভরে গেলো সই। তোর মতো সারা বছর এমন ধানের মধ্যে থাকতে পারলে জীবনে আর কিছু চাইতাম না।
–তোকে কি কারো ধরে রাখার সাধ্যি আছে সই। পথে পথে না ঘুরলে তোর জনমই বৃথা।
নীতা মুখ নিচু করে হাসে।
–জল দে সই।
বুড়ি পানি আনতে যায়। চরণদাস দোতরা বাজায়।
–তোমার সই মন্দ না।
–মনে ধরেছে বুঝি?
–মনে ধরলেই বা কি এসে যায়?
চরণদাস মুখ টিপে হাসে। বুড়ি ঘটি-ভরা পানি নিয়ে আসে। নীতা অর্ধেকটা খেয়ে চরণদাসকে দেয়। চরণদাস এক চুমুকে বাকিটা শেষ করে। বুড়ি হাঁ করে থাকে।
–ভাগাভাগি কেন? আর দেব?
–আমরা অমন করেই খাই। নইলে পেট ভরে না।
নীতাকে আজ একদম অন্যরকম লাগে। এই নীতাকে বুড়ি যেন চেনে না। বুড়ির সঙ্গে ওর অনেক তফাৎ।
–যাবি না সই পৌষ মেলায়? তোকে নিতে এলাম?
–যাব সই যাব। সলীমের বাপ গরুর গাড়ি ঠিক করতে গেছে। বুড়ির চোখে-মুখে খুশির রেণু ছড়িয়ে যায়।
–ও তুই গরুর গাড়িতে যাবি? আমার চরণ দুখানাই ভরসা। সঙ্গে আমার চরণদাসও রয়েছে।
চরণদাসের দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসে নীতা। চরণদাস চোখ টিপি দেয়। তারপর আবার দোতরার ওপর ঝুঁকে পড়ে। বুড়ি ওদের ভাবসাব দেখে অবাক হয়। ভালও লাগে। মনে হয় গফুর না হয়ে জলিল হলে হয়ত ওর জীবনটা এমনই হতো। কামলারা হেই হেই করে গরু তাড়াচ্ছে। ধান মাড়াই হচ্ছে। এ সময়টা ভীষণ ব্যস্ত থাকে বুড়ি। ছবিগুলো ওর মনের মধ্যে ওলোট পালোট খায়।
