–আসি রে সই?
–কোথায় যাবি এখন?
নীতা হেসে উত্তর দেয়, মনের মানুষের খোঁজে। যতদিন না পাই ততদিন খোজারও শেষ নেই। পথে পথে ভিক্ষে করি আর গান গাই। মনের মানুষ না হলে চলে নারে। একলা পথ চলা বড় কষ্ট। পথের কষ্ট তোকে বুঝতে হয় না বুড়ি।
নীতা মন খুলে হাসে। চলতে চলতে গান ধরে—
বন্ধু আমার নির্ধনিয়ার ধন।
তারে দেখিলে জুড়ায় জীবন যৌবন।
দেখিলে মরণ রে–।
০৩. নীতা ধূলো-ওড়া পথ দিয়ে চলে যায়
নীতা ধূলো-ওড়া পথ দিয়ে চলে যায়। কিন্তু তার ফেলে যাওয়া কথাগুলো সারাদিন বুড়িকে ব্যস্ত করে রাখে। পুকুরে গোসল করতে নেমে থমকে থাকে বুড়ি, তেঁতুল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গামছা দিয়ে চুল ঝাড়তে গিয়ে থমকে যায় বুড়ির হাত। চুলোর তরকারি নাড়তে গিয়ে চুপ হয়ে যায় বুড়ি। বারান্দায় বসে বসে আবোল-তাবোল ভাবে। দেহে অবসাদ, ক্লান্তি জড়িয়ে ধরে। প্রতিটি স্নায়ু প্রার্থিত উত্তেজনার অভাবে ঝিমিয়ে যেতে চায়। কি যে জ্বালা! গফুর হাটে গেছে। ফিরবে সন্ধ্যায়। সলীম কলীম ভাত খেয়ে কোথায় খেলতে চলে গেছে। বুড়ির কিছু ভালো লাগে না। খাওয়া-দাওয়ার পর নকসীকাঁথা বিছিয়ে সেলাই করতে বসে। নকসিকাথার রঙিন সুতো বুড়ির হৃদয়ের পরতে নকসা বুনে চলে। কত উজ্জ্বল সুখস্বপ্ন বুড়িকে মাতিয়ে রাখে।
তখুনি সলীম কলীম ছুটতে ছুটতে আসে।
–মা, মা? মা জাননা সখিনাবু না কোথা থেকে একটা ছোট ছেলে এনেছে। এই এতটুকু?
কলীম হাত দিয়ে দেখায়। ও ছোট বলে ওর উত্তেজনা একটু বেশি। সলীম একটু ধীরস্থির।
কলীম বুড়ির গলা জড়িয়ে ধরে।
–মা তুমি আমাদের জন্য একটা বোন আন না?
–আনবো, আনবো। এখন ছাড়।
–জানো মা ছেলেটা না কেমন করে কাঁদছিল। ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া……
কলীম অনুকরণ করে দেখায়। ওদের কাণ্ড দেখে বুড়ি না হেসে পারে না।
–আমাদের জন্যে কবে বোন আনবে মা? সত্যি করে বল?
–দেখি কবে আনা যায়। বললেই কি আর হুট করে আনা যাবে? দিনক্ষণ ঠিক করে শুভদিন দেখে তবে আনতে হয়। বুঝলি বোকা ছেলে?
বুড়ি কলীমের থুতনি নেড়ে আদর করে।
–সত্যি আনবে তো? তিন সত্যি কর?
–এই করলাম। সর এখন খেলগে যা।
কলীমের আবদার সবচেয়ে বেশি। যখন তখন বুড়িকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। সলীম ঠাণ্ডা। অতোটা আদর আবদারের মধ্যে নেই। ওরা যেমনি ছুটতে ছুটতে এসেছিলো তেমনি ছুটতে ছুটতে চলে যায়। ওরা হাঁটে না। এক পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে যেন। কেবলই লাফায়। ছোটা ছাড়া কথা নেই। বুড়ির মনে হয় ছোটবেলায় ও নিজেও অমনি ছুটতো। ছুটতে না পারলে ভালো লাগতো না। ছি-বুড়ি খেলায় কেউ পারতো না ওর সঙ্গে। বাই বাই করে যে ছুটতে ডানে বামে তাকাতো না। কতদিন গাছ-গাছালির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে যে ব্যথা পেয়েছে। কখনো হাত-পা কেটে গেছে। কোন দিন সেগুলো আমলই দেয়নি। কেটে গেলে শিয়ালমুখা দাঁতের তলে চিবিয়ে লাগিয়ে দিত। রক্ত বন্ধ হয়ে যেত। জলিল বলত, তুই বড় শক্ত মেয়ে বুড়ি। কেমন করে যে সইতে পারিস? আমার কাটলে কেঁদেকেটে হুলস্থূল বাধাতাম। মাগো কাটাকুটি আমি সইতে পারি না।
বুড়ি হেসে গড়িয়ে পড়ত, তোর ছেলে হওয়াটাই ভুল হয়েছে জলিল। তুই তাহলে বুড়ি হয়ে যা, আমি জলিল হই।
–কি যে আজগুবী কথা। জলিল হলে তুই কি করবি?
–বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতাম। আর কোন দিন ফিরতাম না।
–আমিও তাই করব।
জলিল উদাস হয়ে বলেছিল।
–তুই পারবি কাঁচকলা।
–দেখিস পারব। তবে তোর মতো অত তেজ আমার নাই বুড়ি। তুই যেন কেমন।
বুড়ি ভেবে দেখলো এখন আর সেই তেজ নেই ওর। ও এখন পালাতে চায় না, চায় বন্ধন। চায় মাতৃত্বের গৌরব এবং অহংকার। সলীম কলীম চলে যেতেই বুড়ির মনের সুতো ছিঁড়ে যায়। গত বছর বিয়ে হয়েছে সখিনার। বছর না ঘুরতেই ছেলে হলো। বুড়ি কাথা গুটিয়ে উঠে পড়ে। সমস্ত দুপুরটা ওর শূন্য জীবনের ওপর হাঁসফাঁস করছে যেন। ও উঠোনে নেমে দাঁড়ায়। কোথায় একটা ঘুঘু একটানা ডেকে যাচ্ছে। নির্জন দুপুরে ঘুঘুর ডাক বুড়ির বুকের ভেতর কটুকটু শব্দ করে।
রাতের অন্ধকারে গফুরের কাছে কথাটা বলতেই গফুর হেসে চুপ করে যায়। বুড়ির বেদনাকে ও সবসময় সহানুভূতির সঙ্গেই দেখেছে। কখনো রাগ করে, বিরূপ মনোভাব। প্রকাশ করে অথবা পাড়াপড়শীর মতো বুড়ির বন্ধ্যাত্বকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে বিরক্তি প্রকাশ করেনি। ওর আকাঙ্ক্ষাকে একান্ত স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছে। সন্তান কামনা গফুরের মধ্যে থাকলেও সেটা তত প্রবল নয়। দুটো ছেলে তার রয়েছে। বুড়ির না হলেই বা কি? বরং এই ভালো। বুড়ির এই সপ্রতিভ গফুরকে ভয়ানক আনন্দ দেয়। ছেলে হলেই তো বুড়িকে আর এখনকার মতো এমন করে কাছে পাওয়া যাবে না। আজও গফুর বুড়ির কথার কোন উত্তর না দিয়ে পাশ ফিরে শোয়। ঘুমুবার চেষ্টা করে। ওর ধারণা সন্তান যদি হয় এমনিতে হবে। ঐসব মানত-টানতে কিছু হবে না। গফুরের নির্বিকার আচরণে ওর মনটা যেন কেমন করে। ঘুম আসে না।
গফুরের পিঠে হাত দিয়ে ঠেলা দেয়। ডাকে।
–কিছু বলছ না যে?
–ঝাড়ফুক, তাবিজতুমার, গাছগাছালির ওষুধ সবই তো হলো আর কত করবি বুড়ি?
–এইবার শেষ। আর কখনো তোমাকে বলব না।
বুড়ির কণ্ঠ করুণ শোনায়। বেঁচে থাকার শেষ তৃণটুকু আঁকড়ে ধরার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
–তুই কিছু জানিস না বুড়ি। শ্রীনাইল ধাম পাক্কা ছয় মাইলের পথ। তিন মাইল হেঁটে, তিন মাইল গরুর গাড়িতে। বড় কষ্ট। পারবি না যেতে।
–খুব পারবো। তুমি দেখে নিও। ওগো তুমি না কর না। বুড়ির কণ্ঠ মিনতিতে ভেঙে পড়ে। সেই কণ্ঠস্বরে এমন একটা সমর্পিত আবেদন ছিল যে গফুর আর না করতে পারেনি।
