রামদাসের ঐ কথায় সুখ ছিল না সই। ঐ কথায় কি আর চোখের জল ঠেকিয়ে রাখা যায়। রামদাসের বুকের ওপর মাথা রেখে সারারাত কেঁদেছি আমি। ও আর কোনো কথা বলেনি। অনুভব করেছিলাম রামদাসের বুকের ধুকধুকানি কেবল আস্তে আস্তে কমে আসছে। সুবল দরজার কাছে মাদুর পেতে শুয়েছিল। আমি একলা মানুষটাকে আগলে বসেছিলাম। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। পুরো বর্ষায় অমন বৃষ্টি আর কোন দিন হয়নি। বাতাসে কুপি নিভে যায়। কি যে আঁধার ছিল সই। ভীষণ ভয় করছিল। মনে হচ্ছিল আমিও বুঝি মরে যাচ্ছি। শেষ রাতে রামদাস মারা যায়।
নীতা উদাস চোখে চুপ করে থাকে। ঘটির জলটুকু এক ঢোকে শেষ করে। বুড়ি একদৃষ্টে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
জানিস সেদিন বাকি রাতটুকু আমি বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ রামদাসের গানের মতো লাগছিল। রামদাসের গলা বড় মিষ্টি ছিল সই। আমি পাগল হয়ে উঠেছিলাম। সুবল একবার বাঁকা করে তাকিয়ে বলেছিল, রামদাসকে কি ধুয়ে ফেলছে বৃষ্টির জলে? আমি ওর কথার উত্তর দেইনি। ঐ কথার কি উত্তর দেয়া যায়। তুই বল সই? পরদিন সকালে বৃষ্টি থামলে আমরা দুজনে রামদাসকে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম সোমেশ্বরীর বুকে। তারপর ঝোলাঝুলি কাঁধে নিয়ে যখন বেরিয়ে পড়ি তখন সুবল দোতরা বাজাচ্ছিল।
বললাম, সুবল এখানে তুমিই থাকো। আমি আর কোনদিন ফিরবো না।
–সে আমি জানি। সুবল মুখ না তুলেই বলেছিল।
–তুমি অনেক বেশি বোঝ সুবল।
সুবল আমার কথার জবাব দেয়নি। ফিরেও তাকায়নি। কেন যে ও আমাকে পছন্দ করতো না বুঝতাম না। ওর কাছে থেকে সাড়া না পেয়ে আমি আর দাঁড়াইনি। কোন দিন সোমেশ্বরীর ধারে ফিরেও যাইনি।
এ পথই হলো আমার ঘর। বহুদিন বহু জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি সই কিন্তু সুখ পাইনি। কত আখড়ায় গেলাম। কিন্তু শান্তি কৈ? কেউ কেউ আছে সই পথের ধুলোর মতো। না চাইলেও পায়ে এসে জড়ায়। কেউ আকাশের মেঘ। হাপিত্যেশ করলেও বৃষ্টি হয়ে নামে না। এ করেই তো পথ চলি, মন না চাইলেও চলতে হয়।
নীতা গান ধরে—
সুজন মন আমার
খুঁজে দেখ তুই
তোর মনের মানুষ কই?
নীতা গান গায়, অনেকটা গুনগুনিয়ে, দোতরার শব্দ নেই।
বুড়ি চুপচাপ বসে থাকে। গান শোনার চেষ্টা করে। নীতার সঙ্গে কথা বললেই ওর মন অস্থির হয়ে ওঠে। নীতা বুড়ির জীবনে এক নিষিদ্ধ বাহকের মতো। নিষিদ্ধ জগতের খবর বয়ে নিয়ে আসে। যে খবরে ওর কোনো অধিকার নেই। বুড়ির হঠাৎ মনে হয় ওর মনের মানুষ নেই। গফুর ওর মনের মানুষ হতে পারেনি। ওদের জীবনে কেবল অনুষ্ঠান সত্য। অনুষ্ঠানের জের টেনে একটা মেকি লৌকিকতা বজায় রাখতে হয়। সমাজের নামে, ধর্মের নামে। আর এজন্যেই নীতা যা পারে বুড়ি তা পারে না। নীতার জীবন দক্ষিণা বাতাস। যেদিক খুশি সেদিক বয়। আর বুড়ি? বুড়ি বদ্ধ ঘরের গুমোট গরমে তালপাতার ক্ষীণ বাতাস। কোন দিকেই নড়তে পারে না। ইচ্ছে মতো ছোটাও যায় না। বিয়ে নামক অনুষ্ঠান আর গফুর নামক স্বামী দুটোই এখন বুড়ির জীবনের একমাত্র সত্য। এ গণ্ডির বাইরে বুড়ির আর কিছু করার ক্ষমতা নেই।
হঠাৎ নীতা গান থামিয়ে বুড়ির দিকে অবাক হয়ে তাকায়।
–তুই যেন কি ভাবছিস সই? তোর কি হয়েছে রে?
নীতা দরদ দিয়ে বুড়ির সঙ্গে কথা বলে।
–আমি যদি তোর মতো হতে পারতাম।
–যা এ জীবন আবার কেউ চায় না কি। তোর কত সুখ! তুই কেনো আমার মতো ভবঘুরে হতে যাবি। তোর মতো জীবন পেলে আমি আর কিছু চাইতাম নারে? এমন গোছানো সংসার, স্বামী, ছেলে
–ছেলে? বুড়ির কণ্ঠ যেন চিরে যায়।
নীতা একটু বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে। ব্যাপারটা ও জানে। বুড়ি কষ্ট পাবে এটা ও ভাবেনি। বুড়ি আঁচলে চোখ মোছে। নীতা ওকে খুশি করার জন্যে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, আসছে পৌষ মেলায় তাকে আমি শ্রীনাইল ধাম নিয়ে যাব সই। কেশা বাবার নামে মানত করলে নির্ঘাৎ তোর ছেলে হবে। কেশা বাবা সিদ্ধপুরুষ। কত লোক যে ওখানে যায় না দেখলে তোর বিশ্বাস হবে না। ওখানে গেলে পরাণটা একদম শীতল হয়ে যায় রে সই।
নমিতার মতো ভক্তিতে গদ্গদ করে নীতার কণ্ঠ। একই বিশ্বাসের আবর্তে নীতাও দোলায়িত। বুড়ির মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করে এখনই ছুটে যেতে। নমিতার ক্ষীণ সূত্র নীতা আরো পাকাপোক্ত করে দিল। বুড়ির মন হালকা হয়ে যায়। এখন এই দুর্বল সময়ে ওর মন সবসময় একটা অবলম্বন খুঁজে বেড়ায়। কেউ কিছু বললে সেটা অনবরত স্বস্তির ঝরণা বইতে থাকে। মনের গুমোট কেটে যায়। বুড়ির কষ্ট আর ঘুণপোকা হয়ে হৃৎপিণ্ড কেটে ঝাঁঝরা করে না।
–তুই হাত-মুখ ধুয়ে নে সই। আমি খাবার ব্যবস্থা করি।
নামিয়ে রাখা তরকারির হাঁড়িটা আবার চুলোয় চাপায় বুড়ি। তড়িঘড়ি করে রান্না শেষ করে। কলাপাতা কেটে এনে নীতাকে ভাত খেতে দেয়। নীতা বাসনে খায় না। মাগুর মাছের ঝোল দিয়ে গরম ভাত, সেই সঙ্গে ডিমাই শাকের ভাজি। অপূর্ব লাগে নীতার। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায় বলে খাওয়াটা সব সময় ঠিক হয় না। তাছাড়া ভিক্ষের চালে কি ভাত হয়? হয়তো জাউ। নীতা মনে মনে হাসে। খাওয়ার জন্যে ওর লোভ নেই। কতোদিন ভাত না খেয়ে কাটিয়ে দেয় তার কি হিসেব রাখে! তবে বুড়ি ওকে খুব যত্ন করে খাওয়ায়। কখনো না খেয়ে যেতে দেয় না। আর বুড়ির হাতের রান্নার জন্যে নীতার জিভে জল গড়ায়। কি যে ভালো লাগে! খেয়েদেয়ে পান মুখে দিয়ে নীতা দোতারা আর পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
