মা-র দ্বিতীয় স্বামী আমাকে একেবারে কাছে ঘেঁষতে দেননি। বিয়ের পর সেই যে গেছেন, আর কোনদিন আসেনওনি মা আমাকে দেখতে। এখন বুঝতে পারি, ছোটবেলায় সে অভিমানটা কত ছেলেমানুষের মতো করেছি; দ্বিতীয় স্বামীর ঘর থেকে প্রথম স্বামীর পুরনো সংসারে কেউ আসে না–থাক না যতই মায়ার টান–এই সাধারণ কথাটা তখন বুঝিনি। আর মা–র কথা মনেই নেই যে মনে করে কোনো কিনারা হবে। কেবল একটা অবোধ আকুতির মতো, কিছুতেই মনে না পড়া স্বপ্নের মতো, অস্পষ্ট কম্পিত বহু দূরের অনুভূতির মতো মা–র অস্তিত্ব টের পেতাম। এই পৃথিবীর কোনখানে তিনি আছেন। একেক সময় স্পষ্ট দেখতে পেতাম যেন, গ্রামের মধ্যে টিনের বাড়ি একটা, সামনে আঙ্গিনা, আঙ্গিনায় হলুদ খড় শুকোতে দেয়া হয়েছে, কামলা বসে হুঁকো খাচ্ছে, গরু–ছাগল মাটিতে মুখ রেখে ঘুরছে আর চড়া রোদ উঠেছে আকাশ পুড়িয়ে–চারদিক খা খা করছে। তার মধ্যে মা কাজ করছেন। আমার কল্পনায় তাকে দেখতে পেতাম, ট্রেন থেকে গ্রামের একেকটা আঙ্গিনায় হঠাৎ হঠাৎ যেমন নীল তাঁতের ময়লা শাড়ি পরে, মাথায় কাপড় তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে, কী উপুড় হয়ে কাজ করতে, বা গাড়ির শব্দে মুখ ফেরাতে বৌ-ঝিদের দেখা যায়। তাদের আলাদা করে মনে থাকে না, সব মুখ এক হয়ে যায়–সেই কালো শ্যামল রং, দুঃখী, নির্বাক। দেখতে পেতাম, যেন তার চারদিকে কালো কালো ন্যাংটো কী ছেঁড়া প্যান্ট পরা, ধুলো মাখা, নাকের সর্দি গালে চট চট করতে থাকা অনেকগুলো ছেলেমেয়েকে। তাদের পেট ফুলে উঠেছে, হাতে একটা আম, ভন ভন করছে মাছি– চকচকে চঞ্চল চোখে তারা আমাকে দেখছে।
বাতিটা আর জ্বালানো হলো না। সিগারেট খেতে চেয়েছিলাম। থাকগে। সিগারেটের দাম আবার বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্যাক্স, ট্যাক্স আর ট্যাক্স। এক বছরে কটা ক্যাবিনেট ভাঙলো আর হলো? একটা স্টেবল গভর্ণমেন্ট চাই। আমার কিসসু হবে না। একটা লাইন করতে পারতাম, একটা যোগাযোগ থাকতো কোথাও এক মাসে আমারও বাড়ি হতো ধানমণ্ডিতে, গাড়ি হতো, টাকা আসতো বন্যার মতো। ঐ বাড়িগুলোতে কারা থাকে? অমন সুন্দর বাড়ি। আমার বাবা যদি মিনিস্টার হতেন, বেশ হতো। উঠে বসে আবার খুঁজতে হলো সিগারেট। ধরাবার পর মনে পড়ল, একটু আগেই খাবো না ভাবছিলাম। আজ আমার কোনো কিছুই মনে থাকছে না।
জানালার পাট খুলে দিতেই ঝলক দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে এসে পড়ল। বেশ লাগছে শীতটা। নিশাতের কথা ভাবছিলাম। নিশাতকে সুন্দর দেখতে পাচ্ছি, যেন বাতি জ্বালিয়ে ফটোগ্রাফ দেখা হচ্ছে। আর মা–কে।
একেকদিন হুহু করত মনটা–খুব যখন আনন্দ হতো, তখন। তখন সব আনন্দকে ব্যথায় মুচড়ে দিত মায়ের স্মৃতিটা। চমকে উঠতাম তখন। মনে হতো, আমার কথা শুনে মা খুব খুশি হতেন। ম্যাট্রিক যেবার পাশ করলাম, এত খারাপ লাগল। একটা গরম কোট ভালো ফিট করেছিল আর মানিয়েছিল চমৎকার হলে থাকতাম তখন–তীরের মতো মা–র কথা মনে পড়ল। আরেকদিন স্টেশনে একটা পরিবারকে আপার ক্লাশ ওয়েটিং রুমে ঢুকতে দেখলাম বাচ্চাগুলো এত সুন্দর আর চঞ্চল আর লাফাচ্ছিল—-আমার মুখটা হাসিতে ভরে গেল, তখন মনটা খুব খারাপ করল হঠাৎ।
আশ্চর্য! কতবার আমার জ্বর হয়েছে, কই মাকে একটুও মনে পড়েনি। আমার রুমমেট একটু অসুখ হলেই খালি বাড়ি যেতে চাইতো মাকে দেখতে। এম.এ. পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলো, তখনো না। আশ্চর্য নয়? দুঃখের সঙ্গে কোনো যোগ নেই আমার মা–র। অথচ মাকে যখনি মনে হয়েছে, যেন চোখে দেখতে পেয়েছি দুঃখী, মলিন এক মহিলা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
ঘুম থেকে উঠে দেখি বেলা আটটা বেজেছে। খচ খচ করছে দুচোখ এখনো। মনে হচ্ছে, আরো খানিকটা ঘুমোলে ভালো লাগত। কিন্তু নটার মধ্যে না পৌঁছুলে কাজি সাহেব রাগ করবেন। বলবেন, আমি কটায় উঠি জানো? পাঁচটা। পাঁচটায় তোমাদের মাঝরাত হয়।
রুমির কথা মনে পড়ল অহেতুক। আর তক্ষুণি মনে হলো, কাজি সাহেবকে দিয়ে নিশাতের ভাইজানের কাছে প্রস্তাব পাঠাবার কথা ভাবছিলাম। সেটা খুব সহজ হবে না। খুব অস্বস্তি লাগল। জালালকে পাঠাব? মন্দ হয় না। কিন্তু কাজি সাহেব তো আজ হোক কাল হোক জানতে পারবেনই। রুমির জন্যে কাল্পনিক ভয়টাকে প্রশ্রয় দেবার কোনো মানেই হয় না। আমি একেক সময় এমনসব কাণ্ড করতে পারি। কাজি সাহেবকেই বলব। বরং তাকে পাঠানোই সবদিক দিয়ে সুন্দর হবে। আমার সিনিয়র, নাম আছে, গাড়ি আছে। বিয়ের প্রস্তাব, একটু আভিজাত্য হলে চমকার মানায়।
আজ নিশাতকে কলেজে টেলিফোন করে বলতে হবে। ভাবতে ভাবতে খুব হালকা লাগল ভেতরটা। নিশাতের সারারাত কেমন করে কেটেছে সেইটে কল্পনা করতে ডুবে গেল আমার মন। টুথ ব্রাশে পেস্ট লাগালাম, ঠাণ্ডা পানিতে আমার চোখ থেকে ঘুম ধুয়ে গেল, জালালের ছেলেমেয়েরা পড়তে না বসার দরুণ বকা খাচ্ছে, জালাল আমার হাতে খবর কাগজের ভেতর শীটটা দিল, চায়ে একটা পাত ভাসছে, সেটাকে চামচে কিছুতেই তুলতে পারছি না– সারাক্ষণ নিশাতের কথা মনে পড়তে লাগল। কাল এলোমেলো কী সব স্বপ্ন দেখেছি যেন একটা জায়গায় অনেকগুলো বেলুন উড়ছিল, তারপর আর মনে নেই। আবার দেখলাম সিনেমা শুরু হয়ে গেছে, আমি তবু বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, কেন যেন ঢুকতে পারছি না, অথচ খারাপ লাগছে না একটুও, আমার যেন কোনো উদ্বেগই নেই। তারপর কী হলো জানি না। দেখলাম একটা গাড়ি মাঠের ভেতর দিয়ে খেলনা ট্রেনের মতো যাচ্ছে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই, হুইসেল নেই, একজন প্যাসেঞ্জারও নেই–সবগুলো কামরা খালি।
