জালাল জিগ্যেস করল, কাল তোমার পকেট কাটা গেছে শুনলাম।
আমি বললাম, সে এককাণ্ড শোনো, দাঁড়িয়েছি জিন্নাহ এভেনুতে… উৎসাহের সঙ্গে তাকে সবটা কাহিনী শোনালাম।
সে শুনে খেদোক্তি করল, তোমার মতো গাধা তো একটা দেখিনি। এত টাকা নিয়ে ভিড়ের মধ্যে যেতে আছে?
তখন বললাম, আরে শোন। তোমাদের বলাই হয়নি, আমি বিয়ে করছি।
কাকে? একসঙ্গে জালাল আর তার স্ত্রী জিগ্যেস করল, হঠাৎ খুশিতে লাফিয়ে ওঠা গলায়।
আবার কাকে? নিশাত।
আরে–আরে… ওরা কী বলবে বুঝতেই পারল না। এ ওর মুখ চাওয়া–চাওয়ি করতে লাগল। তারপর একসঙ্গে হেসে উঠল খামোকা।
বললাম, আর আমি কাল পরশু একটু দেশে যাচ্ছি। চাচাদের বলতে হবে না? অনেকদিন তো যাইনি, দেখিনি।
জালালের স্ত্রী বললেন, হ্যাঁ, যাওয়া উচিত। বিয়ের ব্যাপার, তারাই তো আগে জানবেন, আসবেন। কী বল? যেন এটা একটা মতামতের অপেক্ষা রাখে এমনি চোখে তিনি তাকালেন স্বামীর দিকে।
আমি হেসে বললাম, এতদিনে মনটা বেঁধেই ফেললাম। অনেক হলো! আর কত?
নাশতা শেষে ঘরে এসে একা দাঁড়াতেই বুকটা ভার হয়ে গেল আমার। মুখ ফিরিয়ে চোর চোখে দেখলাম বাইরে বারান্দায়। না, দেখা যাচ্ছে না কাউকে। ওদের কাছে তো আমি বলতে পারি না। আসলে আমি যাচ্ছি আমার মাকে দেখতে।
৩. স্বপ্নের মতো জ্যোছনা নেমেছে
স্বপ্নের মতো জ্যোছনা নেমেছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা অস্পষ্ট গাছ আর বাড়িগুলো ক্রমাগত ঘুরছে, যেন একটা বাধনে আটকা পড়ে গেছে ওরা এই বিশ্বের সঙ্গে। সে বাঁধন কিছুতেই আর খোলা যাচ্ছে না। তাই বারবার, গ্রামে গ্রামে, অন্ধকারে অন্ধকারে ফিরে আসছে, গাছ, আবার গাছ, বাড়ি, আবার বাড়ি।
চীনে দোকানে যখন খাচ্ছিলাম আমরা, নিশাত বলছিল, আমার মা থাকলে খুশি হতো। ভাইজানও হবেন।
বিকট হুইসিল দিল আমাদের ট্রেন। গলা বাড়িয়ে দেখি ব্রীজ আসছে। জ্যোছনার মধ্যে অতিকায় একটা খেলনার তো দেখাচ্ছে। এইতো নিচে ছবির মতো দুধে ভরা নদী, নদীর পরে একটা কালো নৌকা, এতটুকু। উদ্দাম শব্দ উঠছে। রাতের স্তব্ধতা খানখান করে লোহার কড়ি বরগায় প্রতিধ্বনি তুলে, দার করে চলেছে আমাদের ট্রেন। একটা শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাত্রা ওপরে স্বচ্ছ আকাশ, নিচে অতল নদী, আকাশটা স্বচ্ছ আর ভঙ্গুর, আর কাছে অথচ দূরে, যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবো, লাফিয়ে উঠলে পৌঁছে যাবো বেহেশতের দরবারে।
আমার তখন ভয় করল খুব। যেন পড়ে যাবো। আমাদের ট্রেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুরতে ঘুরতে তলিয়ে যাবে নদীর অতলে।
মা-র সঙ্গে আর দেখা হবে না আমার।
সড়াৎ সড়াৎ করে সরে যেতে লাগল প্রতিধ্বনিগুলো, পিছিয়ে যেতে লাগল। চাকার নিচে আবার মাটির স্পর্শ বুঝতে পারছি। আবার দুপাশের থোকা থোকা অন্ধকার–মানে গাছ, সবুজ বাতি, আশেপাশে আরো অনেকগুলো লাইন, চিকচিক করছে, জীবন্ত স্রোতের মতো ওরা সচল, মন্থর হয়ে আসছে আমাদের ট্রেন।
আসলো। যেন প্লাটফরমে নামলেই দেখতে পাবো মাকে। উৎসুক হয়ে জানালার বাইরে তাকাতেই বুকের ভেতরটা থমথম করে উঠল আমার। এ যে কী অনুভূতি না ভয়, না আনন্দ, না বেঁচে থাকা, না কিছু। কিছু না, এবং একসঙ্গে সবকিছু।
নিশাত আমার বউ হবে এই আনন্দটার মতো স্পন্দিত বিশাল যেন আর কিছু হয় না। সে রাতে শুয়ে শুয়ে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। যেন এক্ষুণি একটা বিকট চিৎকার চিরে ফেলবে আমার হৃদয়টাকে।
আমার সমস্ত কিছু যেন আরেক জীবনে, অন্য কারো জীবনে ঘটে গেছে। অতীতের কিছুই আমার নয়, তবু সেই অতীতটা দুঃসহ বেদনার মতো পাকিয়ে পাকিয়ে, মৃত্যুমুখে অজগরের মতো আছড়াতে আছড়াতে আমার ভেতরে মাথা কুটে মরছে।
কুলির মাথায় সুটকেস দিয়ে পথ জিগ্যেস করে পথ চলতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণের জন্যে জ্যোছনা ঢাকা পড়েছে শাদা মেঘে। আমার খুব শীত করছে। জাম্পারটা পরেছি, তবু।
কে জানে কীভাবে আমাকে ওরা নেবে। চিঠি লিখে দিয়েছিলাম। কাজেই আচমকা হাজির হবার নাটকীয়তা থেকে বাঁচা গেছে। তবু ছাব্বিশ বছরের ব্যবধান কি সহজ হয় এত সহজে? মাকে আমি বলব নিশাতের কথা। আমার ওপরে কেউ নেই, আমার অপেক্ষা করতে হবে না কারো মতামতের। তবু স্বাধীনতা শূন্য ঠেকল, নিশাত যখন বলল আমার বউ হবে। কেউ থাকুক যার কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে আমি বলতে পারি–এই করছি, আমাকে নিষেধ করো যদি ভালো না লাগে; বলতে পারি–আমাকে দোয়া করো, যদি ভালো মনে হয়।
সেদিন সারারাত মা-র কথা আমার মাথায় ঘুরেছে অন্ধ একটা পাখির মতো, কিন্তু বুঝতে পারিনি। সকালে যখন উঠলাম তখন চোখ খচখচ করছিল। কাজি সাহেবকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠাবার কথা, তাঁকে বলা হলো না। নিশাতের সঙ্গে বসে বিস্তারিত আরো অনেক কিছু কইবার শোনবার কথা, তাও হয়নি। সবার চেয়ে বড় হয়ে, বড় করে দেখা দিলেন আমার মা। যেন তাকে যতক্ষণ না বলতে পারছি, তার মতামত না শুনতে পারছি, তাঁর দোয়া না পাচ্ছি, ততক্ষণ আমার আর স্বস্তি নেই।
দেখা হলো অনেক পরে। অন্ধকারের ভেতরে বসে থাকতে থাকতে যখন আমি আর বুঝতে পারছিলাম না আমার জীবন্ত অস্তিত্বকে, তখন মা এসে দাঁড়ালেন আমার স্বপ্নের ছবিকে খানখান করে।
বাড়ির সামনে বিরাট আঙ্গিনা। একপাশে পুকুর। ঘাটে শান বাঁধানো বসবার জায়গা। চৌচির হয়ে ফেটে আছে, আর ভেতরে শুয়ে আছে কালো রেখার মতো অন্ধকার। পুকুর থেকে উঠে আঙ্গিনা পেরিয়ে বাড়ির দিকে মুখ করলে বড় বড় চালাঘর চোখে পড়ে। খড়ে ভর্তি। গন্ধটা সুন্দর। খসখস করছে। ভূতের মতো শুয়ে আছে তার পরে লোক।
