বললাম, আমাকে তো খুশি লাগবেই। চোখ দেখান শীগগীর।
কেন?
টাকা তুলে নিয়েছে। শতিনেক। এই তো আধঘণ্টাও হয়নি।
পকেট মেরেছে?
হুঁ।
ইস। তিনশ? কী করে?
জানলে কি আর নিতে পারতো? কপাল খারাপ। আমি এত কশাসলি চলি।
লুঙ্গিটা আলনা থেকে নিয়ে চেয়ারের ওপর রাখলাম। দরোজা থেকে চলে গেলেন বন্ধু-স্ত্রী। তার মুখটা আমার চেয়েও অনুতাপে কালো দেখাল।
মুখ ধুয়ে বলে এলাম, আজ আর খাবো না। দাওয়াত ছিল। বলতে ভুলে গেছি।
এতগুলো টাকা হারিয়েও মনটা খারাপ নেই। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে অবাক হলাম। যেন অনেক বড় কিছু একটা পেয়েছি। আনন্দে ভেতরটা আলো হয়ে আছে। নিশাত রাজি হয়েছে, তাই? আমি যেন জানতামই নিশাত রাজি হবে। না, সে আনন্দও নয়। কিছুতেই মনে পড়ছে না এ রকম একটা কিছু; কিন্তু। কী সেটা? অনেকক্ষণ ভাবলাম। অনেকক্ষণ। তারপর হঠাৎ চমক ভাঙ্গল। দেখি, এতক্ষণ কিছুই ভাবছিলাম না। একেবারে শাদা, শূন্য নিরবলম্ব লাগছে নিজের অস্তিত্বকে।
আজ পানি আনতে ভুলে গেছি। উঠে দাঁড়িয়ে রান্না ঘরের কুঁজো থেকে জগ ভরে নিয়ে এলাম। ঘরের ভেতর থেকে জালাল ডেকে উঠল, কে?
আমি।
আবার নিস্তব্ধ হয় গেল রাত্রিটা।
আমি এখন মাসে চারশ থেকে পাঁচশ করে পাই। আর নিশাত কি তিন সাড়ে তিনশ পায় না? কলেজে লেকচারারদের মাইনে কত, আমার ধারণা নেই। নিশাতকেও কখনো বলতে শুনিনি। তাহলে দুজনে সাত থকে আটশই হ.ব। মন্দ কী? কজন আছে মাস গেলে ঘরে এতগুলো টাকা তুলতে পারে? বেশ চলে যাবে আমাদের সংসার। সংসার আর কী? আমরা দুজন শুধু। দুজনের আর কতই বা লাগবে? জমানো আছে পৌনে চার হাজার আমার। বিয়ের পর একটা বছর গেলে দুজনে অন্তত আরো হাজার চারেক জমাতে পারবো। ভাইজানের বাড়ির পাশের জায়গাটা তো খালিই পড়ে আছে নিশাতের নামে। সেখানে বাড়ি করতে পারব। বছর খানেক কষ্ট করতে হবে। তারপর এককামরা দুকামরা করে আস্তে আস্তে দালান তোলা যাবে। একটা কামরা হলেই থাকতে শুরু করা যাবে। এক তলা। ইংরেজি এল-এর মতো করে তুলবো। এ–এর ছোট মাথাটায় থাকবে আমার চেম্বার। আজকাল সুন্দর প্রিন্ট বেরিয়েছে, দোর–পর্দা করা যায়। সোফার রংটা হবে ধূসর– বর্ষার আকাশের মতো। বেশ লাগে রংটা। একটা শার্ট কিনেছিলাম ঐ রকম– রংটা টিকল না। জাপানি ইম্পোর্ট বলেছিল।
কিন্তু নিশাত যে বলছিল ওর স্কলারশিপটা বোধ হয় হয়ে যাবে। বিলেতে দুবছর থাকতে হবে। আমার মনেই ছিল না। সেটা বরং আরো ভালো যাক ও বিলেত। ফিরে এলে নাম হবে। ইউনিভার্সিটির কাজটা হয়ে যাবে হয়ত তখন। দুবছরে আমিও অনেকটা গুছিয়ে বসতে পারবো। আজকাল উঁকিল বেড়েছে–কম্পিটিশন বড্ড টাফ।
বাতিটা খামোকা জ্বলছে। নিভিয়ে দিলাম। কাল আলোয়ানটা বার করতে হবে। শুধু চাদরে বেশ ঠাণ্ডা করে। ঠাণ্ডা পড়ছে। রাত বোধ হয় একটা। দূরে হঠাৎ মানুষ চলার শব্দ শোনা যাচ্ছে, একটা গানের কলি, হাসি। সেকেণ্ড শো থেকে ফিরছে বোধ হয়।
বুকের কাছে পা টেনে নিতেই নিশাতের মুখটা মনে পড়ল। ছবির মতো। অনেক বড়। সিনেমার পোস্টারে যেমন! অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম। আমি একটু হাসলাম। নিশাত হাসল। আমার চোখে পলক পড়ছে না। নিশাতেরও না। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়েছি, নিশাত আর নেই।
আবার মনে করলাম নিশাতকে। ঐতো ওর চোখ দুটো, নাকের তরতরে রেখা, চাপা ঠোঁট, একটা গালে চুলের ছড়িয়ে থাকা। আবার নিশাতকে দেখতে লাগলাম তেমনি নিঃসাড় পড়ে থেকে, বালিশে মাথা কাৎ করে রেখে, বুকের কাছে দুপা দ–এর মতো টেনে।
আমাদের যখন বিয়ে হবে, তখন বালিশ থেকে মুখ তুলেই দেখতে পাবো ওর মুখ। পাশের বালিশে ঘুমে ডুবে আছে নিশাত। অন্ধকারে আচ্ছন্নের মতো, কী হলো আমার, মুখ তুললাম। হাত রাখলাম। জানি নেই, জানি বিয়ের পরে, তবু যদি থাকে।
হাসি পেল আমার। একেবারে উঠে বসলাম। ছেলেমানুষের মতো করছি আমি। সিগারেটের জন্যে হাত বাড়াতে যাবো হঠাৎ হাতটা জগের গায়ে লাগল। চট করে সামলে নিতে পেরেছি, নইলে ভেঙেই ফেলেছিলাম। হৃদপিণ্ডটা এখনো লাফাচ্ছে। আস্তে আস্তে সন্তর্পণে উঠে বাতি জ্বালতে যাবো, তখন—
তখন হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টির মতো মা–র কথা মনে পড়ল। আমার আর ওঠা হলো না। সমস্ত শরীরের ওপর দিয়ে অদৃশ্য ঠাণ্ডা পানির রেখা নামতে লাগল যেন। আমি অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ এক নিমেষে খুইয়ে বিহ্বল নির্বাক এক ভিখিরির মতো বসে রইলাম। যেন শরীর থেকে এক ধাক্কায় ছিটকে আলাদা হয়ে গেছে আমার আত্মা; কয়েক হাত দূর থেকে আমাকে সে দেখছে অসীম করুণার সঙ্গে।
নিশাত জানে না। নিশাতকে আমি মিথ্যে বলেছি। বাবা মারা যাবার পর মা–র বিয়ে হয়েছিল আবার। বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে মা-র দ্বিতীয় বিয়ের কথা মনে পড়লেই মনটা গ্লানিতে, লজ্জায়, ছোট হয়ে যেত। যেন দোষটা আমারই। যেন এ লজ্জার কুলান হয় না পৃথিবীতে। যেন আমার মা যদি মরে যেতেন তাহলে খুব ভালো থাকতাম আমি। ছাব্বিশ বছর দেখা হয় না, মরে যাওয়াই তো। নিশাতকে বলেছিলাম, আমার মা-ও মারা গেছেন ছোটবেলায়। আমি তখন অনেক ছোট। কিসসু মনে নেই।
অনেকদিন ভেবেছি, এ রকম তো কত হচ্ছে। কাঁচা বয়সে বিধবা হয়েছিলেন, মামারা ছিলেন না কেউ; থাকলেও কিছু হতো না, কারণ শুনেছি নানা ছিলেন বড় গরিব; আবার বিয়ে ছাড়া উপায়ই বা কী? চাচারা কেন মাকে রাখেননি, কোনদিন জানতে পারিনি। হয়ত তারা পছন্দ করেননি মাকে, বোঝা বইতে চাননি। অনেকবার মনে মনে রাগ করতে চেয়েছি চাচাদের ওপর, পারিনি; কেমন নির্জীব একটা মায়া হয়েছে বরং।
