নিশাত জিগ্যেস করল হাসছ যে?
কই না।
বেয়ারা এসে পেয়ালাগুলো নিয়ে গেল আমাদের। কাঁটা চামচ সরিয়ে জায়গা করল। আমি একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বললাম, তাহলে সামনের মাসে?
ভাইজানকে বলো।
আমি?
কেন? ভয় কিসের।
না, এমনি। আমার যেমন কপাল। তিনকুলে কেউ নেই তো। নিজের বিয়েতেও নিজেই ঘটক।
নিশাতকে খুব স্নান দেখাল তখন। হঠাৎ একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, আমি কী বলব? তোমার যেদিন ভালো মনে হয়।
ঠিক তখন আমার বুকের মধ্যে রিমঝিম করে উঠল সরোদের ঝঙ্কারের মতো। মনে হলো, আজকেই আমাদের বিয়ে। এখান থেকে উঠে গেলেই দেখতে পাবো, বাইরে আলো ঝলমল করছে, মেলা লোকজন এসেছে, গাড়ি এসেছে, কাজি সাহেব এসেছেন, শরীফ এসেছে, ফটাস ফটাস করে পাড়ার ছেলেরা বাজি পোড়াচ্ছে আর আমাকে নিয়ে যাচ্ছে ভেতর বাড়িতে। চোখের সামনে নিশাত বসে আছে, নিশাতকে আর দেখতে পাচ্ছি না। ঘরের মধ্যে সমস্ত মানুষ যেন স্বপ্নের ভেতর থেকে এসে সব বসে আছে, আর আমি বুঝতে পারছি না– কেন?
উঠে দাঁড়াল নিশাত। বলল, মেলা দেরি হয়ে গেল না?
নিশাত কিছুতেই স্কুটারে উঠবে না, বাস স্টপেজে কিউ দিয়ে দাঁড়াল। বাসটা যখন ছেড়ে দিল, আমি দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললাম, ভাবীকে বোলো যে সামনের মাসে। কেমন?
বাসটা জোরে চলতে শুরু করেছে। সরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে শো করে বেরিয়ে গেল। হঠাৎ যেন প্রচণ্ড একটা শূন্যতা লাফিয়ে পড়ল পথের পরে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মতো বুকটা অকারণে হু হু করে উঠল আমার। চৌরাস্তার ল ল বাতিটা দপ্ করে সবুজ হলো। স্রোতের মতো চলছে স্কুটার, কার, বাস, রিকশা। আমি দাঁড়িয়ে আছি তখনো। আমার যেন কোথাও যাবার নেই।
এত হালকা লাগছে নিজেকে, এত খুশি, কিন্তু কোথায় যেন কিসের একটা মোচড়–সব অথচ কিছু নেই! দুটো লোক আমার দুদিকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল সামনে, গিয়ে আবার হাত ধরাধরি করে তারা হাঁটতে লাগল।
একটা রিকশা এসে থামলো। যাইবেন সাব? উঠে বসলাম। যেন এই কথাটাই এতক্ষণ কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না যে আমার একটা রিকশা দরকার। তাকে নবাবপুর দিয়ে সোজা যেতে বলে পকেটে হাত দিয়ে দেখি–বুকটা ধ্বক করে উঠলো–আমি টাকা হারিয়েছি। না এ-পকেটে, না ও-পকেটে, আমার মানিব্যাগটা নেই।
২. বন্ধু-স্ত্রী রাঁধেন ভালো
বন্ধু-স্ত্রী রাঁধেন ভালো। ঘরে পা দিতেই রান্নাঘর থেকে তাঁর কণ্ঠ শোনা গেল, আজ এত দেরি যে?
দেরি কোথায়? রোজ তো এই সময়েই ফিরি।
আসলে দেরিই হয়েছিল। সন্ধ্যের পর ঘরে ফিরে আসা আমার বেশ পুরনো অভ্যেস–যখন থেকে কাজি সাহেবের জুনিয়র হয়েছি। প্রথম দিনেই তিনি বলেছিলেন, ইউনিভার্সিটি ডিগ্রি দিয়ে বিদায় করে। আসল লেখাপড়ার শুরু তারপর থেকে। মাথাটা খুব সাফ রাখতে হবে। পড়তে হবে প্রচুর। ভালো ল-ইয়ারের সিক্রেট হচ্ছে স্টাডি অ্যান্ড শার্প মেমরি।
আমার একটা স্বপ্ন, বড় ল-ইয়ার হবো। পয়সা হরে। বাড়ি হবে। জাল–ঘেরা প্রশস্ত বারান্দায় থাকবে আরাম চেয়ার। বাড়ির সামনে রাস্তাটা হবে চওড়া আর রাস্তাটার নাম চিনবে সবাই একডাকে। কাজি সাহেবের যে পশার প্রতিপত্তি, তাতে এ সবকিছুই তিনি করতে পারতেন। তিনি পুরনো কালের মানুষ বলেই হয়ত করবার মন নেই তার। সেই পুরনো দোতলা, আগে ভাড়া থাকতেন, এখন কিনে নিয়েছেন। গাড়িটার বয়স কুড়ির কাছাকাছি, মাসের মধ্যে পনের দিন গ্যারেজে পাঠাতে হয়। বসবার ঘরে খাড়া নকশাপিঠ চেয়ারের আর বদল হলো না। দরজার পর্দা কেমন ভিজে ভিজে মলিন আর তার আসল রংটা কোনদিন দেখেছি বলে মনেও পড়ে না। তবু তার পশারের কথা জানতাম। তাই তাঁর মতো হবার আশা করছি।
সন্ধ্যের পর পড়তে বসতাম। পুরনো সমস্ত কেসের রিপোর্ট। মনে রাখবার চেষ্টা করতাম, চাঞ্চল্যকর সমস্যাগুলোর সন তারিখ ঘটনা আর কোন কোর্ট, কোন হাকিম, কী রায়। আমার স্মৃতিশক্তি তেমন সক্ষম বলে মনে হয় না। কোনদিন কোনো কিছু স্পষ্ট মনে রাখতে পারিনি। কেবল ভাসা ভাসা এখান থেকে ওখান থেকে মনে থেকেছে। গেল বছরের হয়ত ঘটনা, কিন্তু সব সময় আমার ধারণা হবে, দুতিন বছর আগে হয়েছে। কতবার যে মাস ভুল করেছি, নাম ভুলে গেছি, একজনের বদলে আরেকজনকে ভেবেছি তার লেখাজোখা নেই। কাজেই আমাকে পড়তে হতো বারবার, কষ্ট করতে হতো মনে রাখবার জন্যে। রাত বারোটা একটা হতো রোজ।
ভেজানো দরোজাটা একটু হাত দিতেই দড়াম করে খুলে গেল। সুইচ টিপতেই পাণ্ডুর আলোয় স্নান হাসতে লাগল বালিশ, বিছানা, টেবিল, আলনা।
দরোজার কাছে শব্দ করে এসে দাঁড়ালেন বন্ধু-স্ত্রী। বললেন, খাবেন এখন? না, পরে।
জালাল?
জালাল আমার বন্ধুর নাম।
তার একটু জ্বর দেখলাম।
জালালের একটা না একটা ছোট অসুখ এ রকম লেগেই আছে। আজ সর্দি, কাল মাথাব্যথা, পরশু জ্বর। শীত পড়তেই শুরু করেছে। শুরু হবে সারা সিজন ধরে খুক খুক কাশি। জ্বরটা বোধ হয় তারই পূর্বাভাস। জামপারটা খুলে আলনায় রাখলাম।
বন্ধু-স্ত্রী জানালেন জালাল শুয়ে আছে। রাতে রুটি খাবে। তারপর দরোজার কাঠ ধরে মাথাটা ভেতরে ঝুঁকিয়ে আচমকা ঝরঝরে গলায় জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার? আজ বড় খুশি খুশি যে।
কে, আমি?
তাকিয়ে দেখি, তিনি হাসছেন মাথায় কাপড় দিতে দিতে। বললাম, না, খুশি লাগছে আপনাকে। সন্দেহ হলো, জালালের বোধ হয় জ্বরটা মিছে কথা। আমার সঙ্গে ঠাট্টা হচ্ছে। এ রকম ঠাট্টা ইনি মন্দ করেন না। বিশেষ করে আমার সঙ্গে। দেখলে কে বলবে, অভাবের সংসার আর পাঁচ ছেলে–মেয়ের মা। যেন গল্পে পড়া সুয়োরাণীর সেবাদাসী–সারাক্ষণ হাসি মুখে, আর রসিকতার তুবড়ি। মন্দ লাগে না। একেকদিন আমিও খুব উৎসাহের সঙ্গে লেগে যাই ঠাট্টার কম্পিটিশনে।
