রিকশায় বসে বললাম, এই রাস্তাটায় সেদিন একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেল। স্কুটারের সঙ্গে ট্রাক। স্কুটারে ছিল গান গাইত, খেয়াল, মস্তান গামা। পড়োনি কাগজে? মারা গিছল। আমার খুব একটা খারাপ লাগছিল না। কিন্তু নিশাত চুপ করে রইলো সারাক্ষণ। বললাম, একসঙ্গে মরে গেলে একটা হৈচৈ পড়ে যেত কিন্তু! যেত না? লোকে, আমরা, মানে মনে করত আমরা স্বামী–স্ত্রী।
লজ্জা করল আমার। তাকাতে পারলাম না নিশাতের দিকে। চেনটা পড়ে গেল রিকশার। রিকশাওয়ালা যতদূর গতির মুখে যাওয়া গেল, তারপর নেমে উপুড় হয়ে পরাতে লাগলো হুইলের সঙ্গে চেন। পাবলিক লাইব্রেরীর জানালা থেকে চৌকো চৌকো আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। আবার চলতে শুরু করল।
নিশাত বলল, আজ বেরুনোর মুখে ভাবীর ছেলেটা ভারী দুষ্টুমি করছিল। একটা চড় দিয়েছি।
মন খারাপ করছে?
নাহ। আবছা হেসে ফেলল নিশাত। আবার বলল, এমনি মনে পড়ল। খুব বেঁচে গেছ কিন্তু আজ।
আমার অনেকগুলো কথা ছিল। বলে নিশাতের দিকে চোখ ফিরিয়ে রাস্তার পাশে বুড়ো গাছগুলোর মাথায় মাথায় তাকালাম। শাদা মেঘ হয়েছে। চাঁদটা গেল কোথায়?
বলো, শুনছি।
বলব, এভাবে বলা যায় না।
হাসল নিশাত। ঐ রকম করে নিঃশব্দে, মেলা রকম মনে হয় হাসতে পারে নিশাত।
তুমিই বলো এভাবে বলা যায়?
না যায় না। কিছুতেই বলা যায় না। আমার কণ্ঠ অনুকরণ করে নিশাত বলে উঠল।
নিশাত না হয়ে অন্য কেউ হলে ঠিক চটে যেতাম। বদলে যেন খুব উপভোগ করেছি এমনিভাবে হেসে ফেললাম সশব্দে। আর আমিও বললাম, না বলা যায় না। কিছুতেই বলা যায় না। তারপর প্রস্তাব কলাম, চলো, খাই।
খাই মানে?
বাইরে। কোনো রেস্তোরাঁয়!
নিশাত দুহাতে মানা করে উঠল। বলল, আমি কবে বাইরে খাই? তুমি জানো না?
আজকে।
উঁহু। না।
কী হবে?
বাসায় মেহমান আসবে।
তো আমি খাবো। তুমি বসে বসে দেখো।
আমি এ রকম যখন রাগ করে বসি, নিশাত কিছু বলে না–এটা অনেকদিন দেখেছি। একদিন ওকে একটা কলম কিনে দিলাম। নেবে না কিছুতেই। বললাম, না নেবে তো না। বলে কলমটা খুলে নিবটা ভেঙে ফেলব বলে হাত তুলেছি, খপ করে হাত ধরে ফেলল নিশাত। কেড়ে নিয়ে কলমটা ব্যাগে রেখে দিল বলল, নিলাম। আবার আরেকদিন আমার মেজাজটা কিসে বিগড়ে ছিল বলতে পারব না। নিশাতের সঙ্গে আলাপটা জমছিল না। ও একাই কথা বলছিল সারাক্ষণ। বলতে বলতে একবার শুনলাম, কই, কী হয়েছে তোমার? কিছু বলো। হঠাৎ কী হলো ঠাস্ করে বলে ফেলাম, কী বলব? তুমিই তো সব বলছ। বলেই বুঝতে পারলাম অন্যায় করেছি। ভয় হলো, নিশাত হয়ত এক্ষুণি উলটো হনহন করে হাঁটতে শুরু করবে। কিন্তু, তার বদলে হাসল নিশাত। যেন অন্ধকারে ফিক করে চাঁদ উঠল। নিজেকে খুব ছোট আর নষ্ট মনে হলো তখন।
চীনে দোকানে খেতে বসে দুজনের জন্যেই আনতে বললাম। নিশাত আমাকে বাধা দিল না। বেয়ারা পানির গ্লাস বেখে চলে যাবার পর ও আস্তে আস্তে বলল, আমি, কী যে আমি, মানে আমি না করব না।
অবাক হয়ে বললাম, কী ব্যাপার?
জানোই তো।
তখন ঝুঁকে পড়ে বললাম, জানিই তো, আমি খাবো আর তুমি বসে বসে দেখবে, সে হতেই পারে না।
তখন নিশাত চোখ নামিয়ে বলল, সেটা নয়। আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা।
ওহো।
যেন হোঁচট খেলাম। খুব বিব্রত মনে হলো নিজেকে। আমি কিনা ভাবছি, ছিঃ। নিজের বুদ্ধিকে ক্ষমা করতে পারলাম না। একটুও না। আর খুব অবাক হলাম, নিশাত কী করে বুঝল, এই কথাটা ওকে বলার জন্যেই আজ সন্ধ্যে থেকে আমি তৈরি হয়ে আছি। শুনেছিলাম মেয়েরা নাকি ছেলেদের চোখ দেখে সব বুঝতে পারে।
বললাম, আমিও তাই ভাবছিলাম।
বেশ তো। বলল নিশাত। তখন ধোঁয়া ওড়ানো সুপ এলো সমস্ত ঘ্রাণ আচ্ছন্ন করে। পেটের ভেতরে চচন করে উঠলো খিদে। ন্যাপকিন দিয়ে খামোকা ঠোঁট মুছে ওর পেয়ালা নিয়ে চামচে চামচে তুলে দিতে লাগলাম সুপ। নিশাত বলল, থাক, আর না। তুমি নাও।
ব্যস?
অনেক।
বললাম, তুমি সব দেখে শুনে নাও। একটু নুন লাগবে। ঐটা নিয়ে না বড়ড ঝাল। আমি আজ সন্ধ্যে থেকেই ভাবছিলাম, বুঝলে।
আর আমি কদিন থেকেই বুঝতে পারছিলাম, যেন কিছু একটা হবে আমার। এক চামচ মুখে দিয়ে ঠোঁটটাকে সঙ্কুচিত করে চুষতে চুষতে নিশাত আবার বলল, দূর, কী যে সব বলছি! দ্যাখো, দ্যাখো, ওরা কী সুন্দর গোল হয়ে বসেছে।
তাকিয়ে দেখি এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক, কাঁচা-পাকা চুলে ভর্তি মাথাটা, চোখে চশমা, গায়ে। শাদা হাওয়াই শার্ট। আর তাকে ঘিরে বসেছে এক–দুই –ছয় সাত –আটটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। ভদ্রলোক একবার এর আর একবার ওর মুখে তুলে দিচ্ছেন খাবার। গরম লাগছে, ছেলেটা মুখ বিকৃত করে ফিরিয়ে নিচ্ছে আর হেসে উঠছে তার ভাইবোনেরা। ভদ্রলোক চোখ তুলে তাকালেন, তখন টুক টুক করে মাথা গুঁজে খেতে লাগল যারা হাসছিল।
নিশাত বলল, আহা, ওদের মা নেই বোধ হয়।
বললাম, কিংবা মা আবার বাচ্চা হতে হাসপাতালে গেছে।
যেমন তোমার বন্ধুর বউটি বছর বছর যায়। নিশাত যোগ করল বিদ্রূপ করে।
যেন তুমি কত দেখেছ?
বাহ তুমিই তো গল্প করো।
আমার বন্ধুটি ঐ রকম। কাণ্ডজ্ঞান নেই। বাচ্চা হবে বছর বছর। যদি আমি বিয়ে করি, তো অনেকদিন ছেলেপুলে হবে না। নিশাত যদি ইউনিভার্সিটিতে আসতে পারে, আসার কথা হচ্ছে, তো ভালো। নয় স্কলারশিপটা নিয়ে যাক ও বিলেতে। আর আমি দুদিন পরেই জুনিয়র থেকে প্রমোশন পাবো। নিজের পশার জমে উঠতেও বছর দুবছর। তখন একটা ছোট্ট বাড়ি করব। একতলা। আজকাল কত লোকে বাড়ি করছে। আমারও হবে। তারপর ছেলে।
