আজ আর চা-দোকানে বসতে ভালো লাগল না। সেই অল্প অল্প বাতাসে পাতা–পত্তর দুলতে থাকা কাঁঠাল গাছের গোল ছায়ায় দাঁড়িয়ে রইলাম। নিশাতের সঙ্গে দেখা হতো রোববার আর বুধবার। আজ বুধবার, নিশাতের কলেজ ছিল চারটে অবধি। সুরকির পরে আমার ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরো থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। জাম্পারটা থেকে ট্রাঙ্কের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগছে আমার। আর বুকের ভেতরটা উদ্বেগে অস্থির– যেন কী হয়, কী হয়।
বাঁক পেরিয়ে নিশাত বেরিয়ে এলো! থমকে দাঁড়াল আমাকে দেখে। যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। তারপর মুখটা নিচু করে হাসি ফুটিয়ে কাছে এসে বলল, আজ এখানে যে। চা-দোকানটা বড় বাজে আর নোংরা।
এতদিনে বুঝলে?
বড় রাস্তায় আমরা পা রেখে বললাম, শোনো, আজ অনেক কটা কথা বলব।
আজ ভাবী তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছেন।
আজ আমাদের অনেক দেরি হবে।
বাড়িতে মেহমান আসবে। বলল নিশাত।
বাড়ির তো গিন্নি আছে।
মেলা কথাটা কী?
কিসসু না। এমনি। এই– এই বেবি। পাশ দিয়ে স্কুটার যাচ্ছিল, সেটাকে থামাবার জন্যে চিৎকার করলাম। কিন্তু থামল না। টুক করে বাতি জ্বলে উঠল রাস্তার। আমাদের চোখের সামনে যতদূর পথ বেঁকে গিয়েছে, একটা আলোর রেখা পোস্টের মাথায় মাথায় নাচতে লাগল। স্থির হলো।
বললাম, নিশাত, দ্যাখো, আজ আমার অনেক কথা আছে।
আহা, তাই তো জিগ্যেস করছি, কী কথা?
যেন আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না, নিশাত তাই আমাকে তিরস্কার করছে। বললাম, সেটা এভাবে বলা যায় না।
নাহ, একটা স্কুটারও পাওয়া যাচ্ছে না। স্কুটারে চাপবার জন্যে উসখুস করছে মনটা, ভালো লাগছে না হাঁটতে কিন্তু হাঁটতে হচ্ছে। একবার দাঁড়ালাম আমি। দাঁড়াল না নিশাত। তখন আবার আমাকে হাঁটতে হলো। তখন আর নিশাতের দিকে দেখতে পারছি না, সামনে দেখছি আর বারবার পেছনে। বারবার উচ্চকিত হচ্ছি দূরের কোনো যানবাহনের শব্দে। একটা স্কুটারও কি আজ আসতে নেই এদিকে? পথে নিশাতের সঙ্গে এক মহিলার দেখা হলো। তিন বাচ্চা তার সঙ্গে। এক মুখ হাসি। চওড়া পাড় শাড়িটা সমস্ত শরীরে পল্লবিত অতএব আমাকে দূরে দাঁড়াতে হলো।
স্কুটারে উঠতে উঠতে নিশাত বলল, খামোকা দেরি হয়ে গেল। তারপর অন্যমনস্কভাবে জানাল, আজ কলেজে নতুন প্রিন্সিপাল এলেন।
আমি বললাম, আগে নিউমার্কেট, নিউমার্কেট থেকে–আচ্ছা, চলো দেখি, বলছি।
নিশাত কী যেন বলল, সেটা শুনতে পেলাম না। প্রচণ্ড আওয়াজ করছে স্কুটার। বোধহয় গিয়ার আটকে গেছে। হাতলটা ঘোরাচ্ছে খুব। আমি চেঁচিয়ে বললাম নিশাতকে, কিছু বলবে?
তখন নিশাতও গলা তুলে বলল, বলছিলাম–উহ্, কী শব্দ–নিউমার্কেট কেন?
এমনি। কোথাও তো যেতে হবে।
তবু ভালো। ভাবলাম, ওখানে বুঝি তোমার কথা কিনে আমাকে বলতে হবে।
আওয়াজটা সয়ে এসেছে। নিশাতের গলা তাই ঝন্ঝন্ করতে লাগল আমার কানে। বেসুরা ঠেকল। বললাম, ঠাণ্ডা পড়েছে।
তুমি তো জাম্পার চড়িয়েছে।
তুমি একটা কিছু গায়ে দিয়ে এলে পারতে।
হাসল নিশাত। বলল, মাফলারটা বাদ পড়ল কেন?
আমাদের কথাবার্তাই ঐ কম। একেকজন একেকটা বলতে থাকি–আরেকজনের উত্তর দেয়া হয় না। যেন চিন্তার দুটি বেণি পাকিয়ে পাকিয়ে কেবলি নামতে থাকে–এক হয়ে যায় না। বেশ লাগে। অনেক অহেতুক কথা মনের ভেতরে জমতে জমতে ভার হয়ে ওঠে, সেগুলোর একটা পথ হয়। আর শুনতে ভালো লাগে–অনেক অর্থহীন কথা এত ছন্দময় হয়ে ওঠে একেক সময়, মনে হয় সারাদিন শুনতে থাকি, ধরে রাখি, লিখি।
একবার আমার খুব শখ ছিল নিশাতকে চিঠি লেখার। কদিন লিখলাম খুব। তারপর হাঁফ ধরলো। কী লিখব, কিসসু মাথায় আসে না। কথা বলার সময়ে কেমন সহজ হয় সব, কিছু লিখতে বসলে আধখানা লিখে সেন্টেন্স আর শেষ করা যায় না। আর ওদিকে নিশাত লিখত আমার চেয়েও বড় বড় চিঠি। কেমন সাজানো গোছানো। তেলের শিশি হাত থেকে পড়ে ভেঙেছে সেটা একটা চিঠিতে লেখার বিষয় হতে পারে এই প্রথম জানলাম; কলেজে ছাত্রীদের মুখের বর্ণনা এত জীবন্ত হতে পারে তা নিশাত না হলে জানতাম না; আর কী আশ্চর্য, সেই মুখণ্ডলের বর্ণনা, যাদের আমি হয়ত কোনদিন দেখব না, দেখলেও চিনতে পারবো না আমার এত ভালো লাগবে তাইবা কে ভেবেছিল?
চিঠি লেখার অসুবিধে অনেক। সঙ্গে সঙ্গে জবাব আসে না। পোস্টাফিস হয়ে আসতে যেতে কম করেও তিনদিন। তিনটে দিন চুপ করে বসে থাকা আর ভাবতে ভাবতে ঘুমোতে যাওয়া প্রথমদিকে বেশ লাগত। পরে কেমন অসহ্য হয়ে উঠল। নিশাতকে বললাম, চিঠি কে লেখে? আমি আর না।
গ্রীন রোডের কাছে ছুটে আসা একটা দৈত্য স্টেট বাস এড়াতে গিয়ে আমাদের স্কুটার আচমকা পাশ কাটালো। নিশাতকে ধরে না ফেললে হয়ত ছিটকে পড়ত রাস্তায়। রাস্তার লোক ইস্ ইস্ করে উঠল। আমি ড্রাইভারের জামা টেনে চিৎকার করে বললাম, পাশে করো।
পাতার মতো কাঁপছে নিশাত।
সমস্ত ব্যাপারটা এত আকস্মিক, আর আমরা এত তন্ময় হয়ে ছিলাম যে, ভালো করে বুঝতেই পারছিলাম না কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল। নিশাতের কাঁধে হাত রেখে মৃদু চাপড় দিয়ে বললাম, কী হতো বলোত? কিসসু হয়নি। আর স্কুটারওলাকে একটা টাকা দিয়ে বললাম, আর একটু হলেই–।
সে খুব বিষদৃষ্টিতে দেখল আমাদের। যেন, সে তো এ ধরনের অ্যাসিডেন্টকে হর–হামেশাই এড়াচ্ছে, আমরাই কেবল তার ওস্তাদির কদর করছি না, নেমে যাচ্ছি। নিশাতকে বললাম, একটা রিকশা নিই।
