রং রেখে নোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে জাহেদা বলল।
কেন কী হয়েছে? গম্ভীর থাকা বুঝি ভাল?
নিন খান।
চৌকিদার চা দিয়ে গেল। নাশতা শেষে বাবর বলল, ভেবেছিলাম আজ রংপুর ছাড়ব। তা বোধহয় হলো না।
আশংকায় করুণ দেখাল জাহেদাকে। বলল, কেন?
এই মাত্র নিচে রেডিওর একজনের সঙ্গে দেখা। বলল, একটা বক্তৃতা দিতে হবে। এখানে আমার এক বন্ধু থাকে, প্রণব বাবু, ভাবছি। তার সঙ্গেও দেখা করব, মানে এলাম যখন। চল, আগে রেডিও সেরে আসি।
আমি যাব?
কী হয়েছে তাতে? চল, চল। তারপর শহর দেখাব তোমাকে। রেডিও থেকে ফেরার পথে।
জাহেদা হেসে ফেলল।
হাসছ, যে?
আবার ফেরার পথে বলেছেন।
কালকের কথা মনে পড়ল বাবরের। কাল সবকিছুই সে ফেরার পথে জাহেদাকে দেখাবে বলছিল ক্রমাগত। তার জন্যে শাসনও শুনছিল। আজকে আবার। বাবর বিস্তৃত হাসিতে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। বলল, আজ থেকে আর ফেরার পথে নয়।
কথাটা একটু ওজন দিয়ে উচ্চারণ করল বাবর। জাহেদা উঠে দাঁড়াল। তখন বেরুতে বেরুতে বাবর বলল, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। খুব মানিয়েছে তোমাকে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে বলল, জান জাহেদা, আমার মনে হয়, একেক সময় আমি ভাবি, ঈশ্বর যদি থাকেন, আমি তার খুব আদরের তৈরি। তিনি নিজ হাতে আমাকে বানিয়েছেন।
কেন?
কেন আবার? আমার মত ভাগ্যবান আর কে বল?
বাবর মুখ ফিরিয়ে জাহেদার দিকে অর্থভরা চোখে দেখল। জাহেদা সমুখে চোখ রেখেই বুঝতে পারল সেটা। অনাবশ্যকভাবে বলল, গাড়িটা সারারাত বাইরেই ছিল নাকি?
হাসতে হাসতে গাড়ির দরোজা খুলে দিল বাবর। একটু রসিকতা করার লোভে সামলাতে পারল না সে। গাড়ির গায়ে চাপড় দিয়ে বলল, এ বেচারার জন্যে কাল কোনো ব্যবস্থা করা গেল না।
শীতের উজ্জ্বল রোদে গাড়িটা বেরিয়ে গেল ওদের নিয়ে। জাহেদার গাঢ় সবুজ ফোঁটা চমৎকার ম্যাচ করেছে। এইসব ছোট্ট কিন্তু সুন্দর যোগাযোগগুলো ভারি প্রীত করে বাবরকে।
বাঁ দিকে জেলখানা পড়ল। আসগরউল্লাহ বলেছিল; সোজা আরো কিছুদূর যেতে হবে। বাবর বায়ে দেখিয়ে বলল, এই হচ্ছে রংপুর জেলখানা।
আমাকে দেখাচ্ছেন কেন?
তবে?
ওটা তো আপনার জায়গা।
তা বটে। যদি তুমি জেলার হও।
আমার বয়ে গেছে।
ঐ বোধহয় সামনে রেডিও স্টেশন।
নাম পাঠাতেই আসগরউল্লাহ নিজে সদর দরোজাবী কাছে এসে ত্যভ্যর্থনা জানাল। আসুন, আসুন।
কিন্তু চোখ তার জাহেদার দিকে। বাবর হেসে বলল, জাহেদা আমার বোন। সবচেয়ে ছোট।
ও, উনিও এসেছেন।
হ্যাঁ, চিরকাল রাজধানীতে মানুষ। বেড়াতে নিয়ে বেরিয়েছি।
খুব ভাল করেছেন।
জাহেদা বাবরের দিকে চোখ কালো করে একবার অনেকক্ষণ তাকাল। বাবর তা না দেখার ভাণ করে আসগরউল্লাহকে বলল, আপনার স্টুডিও দেখান।
সমস্ত স্টেশনটা ঘুরিয়ে দেখান হলো ওদের। সবার সঙ্গে আসগরউল্লাহ আলাপ করিয়ে দিতে লাগল।
এই যে ইনি বাবর আলী খান। আর তার ছোট বোন।
বাবর যে রংপুরে সেটা যেন আসগরউল্লারই অনেক কীর্তির মধ্যে একটি, এই রকম একটা যাদুকর-শোভন গর্ব তার চোখেমুখে। ভারি মজা লাগল বাবরের। আপিসে বসতে বসতে বলল, কীসের বক্তৃতা দিতে হবে বলুন।
জি, বিষয় আমি ঠিক করে রেখেছি। রংপুরের ভাওয়াইয়া গানে বিরহ।
গান? গানের আমি কী বুঝি?
তবু।
আর বিরহ? হাঃ হাঃ। আসগরউলাহ সাহেব, এই শীতের চনমনে সকালে আর কোনো বিষয় পেলেন না? বিরহ!
মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল বাবর। জাহেদা বিরহ শব্দটা বোঝে না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর বাবরকে হাসতে দেখে তার ভেতরেও সংক্ৰমণ হলো যেন। সে ঠোঁট টিপে মুখ নামিয়ে রইল। আসগরউল্লাহ বুঝতে পারল না বাবর কী ঠাট্টা করছে না। সত্যি সত্যি বলছে। খুব সপ্ৰতিভ হয়ে বলল, বিরহ তো শীতের সকালেরই ব্যাপার সাহেব।
তাই নাকি? আরো মজা পেল বাবর। হা হা করে হেসে উঠল সে। তার চেয়ে বাংলাদেশের জাহাজ শিল্পের ভবিষ্যৎ বাঁ গবাদি পশুর যক্ষ্মা গোছের কোনো বিষয় দিন, মিনিট দশেক বক্তৃতা করে দিচ্ছি।
এবারে হা হা করে হেসে উঠল আসগরউল্লা। বলল, ঠাট্টা করছেন? স্বীকার করি, আমাদের অধিকাংশ বক্তৃতার বিষয়ই ঐ রকম। তাই বলে তা আপনাকে দেব কেন।
আচ্ছা তাহলে ঐ ভাওয়াই গানে বিরহই?
জি, আপাতত এটাই আছে। দশ মিনিটের বক্তৃতা। মিনিট আটেক বললেই হবে।
কিন্তু কী বলি বলুন তো! ভাবতে হবে, লিখতে হবে, কখন লিখব, কখন পড়ব?
আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। আপনার বক্তৃতায় উদাহরণ হিসাবে কিছু গানের অংশ তো থাকবেই। আমি রেকর্ড বাছাই করেও রেখেছি। গানেই যদি বলেন মিনিট পাঁচেক সবশুদ্ধ চালিয়ে দেয়া যাবে। মাত্র তিন মিনিট কথা বলবেন। ব্যাস।
জাহেদার পাশে নিজেকে খুব চটপটে লাগছিল বাবরের। মনের কোণে তাকে একটু তাক লাগিয়ে দেয়ার ইচ্ছেটাও হচ্ছিল থেকে থেকে। সে বলল, বেশ, সোজা স্টুডিওতে চলুন। মুখেই বলছি। ফাইলের জন্যে টেপ থেকে কাউকে দিয়ে টুকে নেবেন।
বেশ তো তাই হবে। স্টুডিওতে চলুন! গানগুলো শুনে নেবেন।
চল জাহেদা।
জাহেদার কাঁধে হাত রেখে বাবর বলল। জাহেদা আবার চোখ কালো করে দেখল তাকে। কয়েক পালকের জন্যে। তখন আরো সুন্দর লাগল তাকে।
বক্তৃতা রেকর্ড করে বেরুতে বেরুতে সাড়ে এগারটা বেজে গেল। যাবার সময় বাবর বলল, চেকটা ঢাকার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবেন।
খুব খুশি হলাম। নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আবার আসবেন। ঢাকায় গেলে দেখা করব।
করবেন।
বাগান থেকে একটা বড় সূর্যমুখী তুলে বাবর জাহেদাকে দিল। জাহেদা আবার চোখ কালো করে তাকাল।
