চৌকিদার এসে বলল, নাশতা দেবে কি? হ্যাঁ, একটু পর। চৌকিদার তখন বলল, ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিই, গাড়ি মুছে দেবে? হ্যাঁ, তাই দাও। বাবর গাড়িতে বসে এঞ্জিন স্টার্ট করে গরম করল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে ফটকের দিকে গেল। জাহেদার তৈরি হতে অন্তত আধা ঘণ্টা সময় লাগবে। এই সময়টুকু হেঁটে বেড়ান যাক।
ঘুম থেকে আস্তে আস্তে জেগে উঠছে রংপুর। দালানের খরখাড়িতে, থামে, বারান্দায়, পথের ওপর রোদ পড়ছে। ঠিক যেন ঘুম ভাঙ্গা জাহেদার মত হাসছে। শহরটা। মিষ্টির দোকানে কয়লার উনুন থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, সিঙ্গারা সাতার কাটছে গরম তেলে। একপাল কাক মোড়ে জনসভা করছে যেন, কলরবে নাচানাচিতে জমজমাট। চাদরে কান মাথা ঢেকে লাঠি হাতে বুড়োরা বেড়িয়ে ফিরেছে। মিউনিসিপ্যালিটির গাড়ি থেমে থেমে পরিচ্ছন্ন করছে পথ। ফুটপাতের পাশে দেয়ালে শূন্য সব রশি টানান, গত রাতে যেখানে ঝোলান ছিল রং-বেরং-এর শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা। পানের দোকান থেকে ধোয়ামোছার পানি গড়িয়ে ছোট ছোট হ্রদ সৃষ্টি করেছে। চারদিক থেকে কুয়াশার পর্দা, হিমের পর্দা, ঘুমের পর্দা ক্রমশ নিঃশব্দে নাতিদ্রুত উঠে যাচ্ছে। খুব ভাল লাগল বাবরের। বিশেষ কোনো বিষয়, ব্যক্তি বা সমস্যা তাকে এখন অন্যমনস্ক করে রইল না। মনে হতে লাগল সব কিছুই ভাল, সবকিছুর সমাধান আছে এবং বেঁচে থাকার একটা বিস্ময় আছে যার সঙ্গে কোনো বিস্ময়ের তুলনা নেই।
হাঁটতে হাঁটতে ধাপ পর্যন্ত গেল বাবর। এখানে আরো শান্ত পরিবেশ। গাছপালার মধ্যে বেড়া দেয়া বাড়িগুলো উঁকি দিচ্ছে। লম্বা লম্বা গাছের ছায়া পড়ে নিবিড় দেখাচ্ছে পথটাকে। মাটির একটা তাজা গন্ধ সর্বক্ষণ নাকে এসে নেশা সৃষ্টি করছে।
বাবর এবার ফিরল। খবর কাগজের জন্যে এদিক ওদিক তাকাল। তারপর মনে পড়ল এটা ঢাকা নয়। এখানে কাগজ আসে একদিন পরে। আশ্চৰ্য, সকালটা এরা খবরের কাগজ ছাড়া কাটায় কী করে? অথচ সে নিজেও যে একটা পড়ে তা নয়। কিন্তু সকালে টুথব্ৰাশের মতই ওটা একটা জরুরি বস্তু, নইলে সকালটাকে সম্পূর্ণ মনে হয় না। যেদিন কাগজের ছুটি থাকে, মনে হয়। সারাদিন ভারি মনমরা যাচ্ছে।
আসসালামো আলাইকুম।
অতি বিশদভাবে উচ্চারিত এই সম্ভাষণে ঘুরে তাকাল বাবর। লোকটাকে পাশ কাটিয়েই চলে এসেছিল সে। ফিরে তাকিয়ে দেখল রেডিও পাকিস্তানের আসগরউল্লাহ। এই যে বাবর সাহেব। এখানে?
আরে আপনি? আপনি এখানে কী করছেন?
আমি তো এখন রংপুর রেডিও স্টেশনের চার্জে আছি। মাস তিনেক হয়ে গেল।
তাই নাকি। আমি তো কিছু জানি না।
আর জানবেন কী করে? টেলিভিশন আসার পর তো রেডিওর পথ আপনারা ভুলেই গেছেন।
তা সত্যি। বাবর অপরাধী হাসি একটা ফুটিয়ে তুলল। বলল, তারপর বলুন চলছে কেমন?
এই এক রকম। আপনাদের খেদমত করে যাচ্ছি। রংপুর কবে এসেছেন? কাল সন্ধ্যায়।
কী ব্যাপার?
এই বেড়াতে টেড়াতে।
উঠেছেন কোথায়?
ডাকবাংলোয়। অফিসে যাচ্ছেন বুঝি?
জি, আর কোন চুলোয় যাব বলুন। চলুন না। আমাদের স্টেশনটা দেখে আসবেন।
আচ্ছা, আচ্ছা।
না, না, আপনাকে আসতেই হবে। এই সোজা গিয়ে ডান দিকে মোড় নেবেন, যেতে যেতে জেলখানা পড়বে, সোজা চলে যাবেন, হাতের ডানে রেডিও অফিস। ও দেখলেই চিনতে পারবেন। কখন আসছেন বলুন?
দেখি।
দেখি টেখি না। আসতেই হবে। আপনাকে যখন পেয়েই গোলাম, একটা কিছু করিয়েও নেব। রংপুর স্টেশন থেকে ব্রডকাস্ট হবে।
শুধু শুধু কষ্ট করবেন কেন।
সে-কী কথা বাবর সাহেব। এতো আমাদের সৌভাগ্য। ছোট্ট একটা বক্তৃতা মাত্র। আপনি এখনই চলুন না? কতক্ষণ লাগবে?
আসগরউল্লাহ হাত ধরে ফেলল।
বাবর তখন বলল, আচ্ছা আসব। এখনো নাস্ত হয়নি।
আপনার অপেক্ষা করে থাকব কিন্তু।
অবশ্যই। তবে বক্তৃতা টক্তৃতা হবে কিনা বলতে পারছি না।
সে আপনাকে দিয়ে করিয়ে নেব। চলি।
আসগরউল্লাহ চলে গেল। বাবর একটু খুশিই হয়েছিল তাকে বক্তৃতা দেবার জন্যে অনুরোধ করাতে। সেই খুশিটা তাকে নাচিয়ে নিয়ে এলো ডাকবাংলোর দোতলা পর্যন্ত। তার দরোজায় টোকা দিল। মধুর গুঞ্জন করে উঠল, আসতে পারি।
দরোজা ঠেলে দেখল জাহেদা আরাম চেয়ারে বসে আছে পিঠ সোজা করে। একদিকে একটু পাশ ফিরে। গোলাপি আর গাঢ় সবুজে আঁকা মনোরম একটা ছবির মত। গোলাপি পাজামা পরেছে। পায়ে সবুজ ফিতের চটি। হাতকাটা গাঢ় সবুজ কামিজ, পিঠে গোলাপি বোতাম বসান। ঠোঁটে গোলাপি বংয়ের আবাস বার্নিশের মত উজ্জ্বল। কপালের মাঝখানে গোলাপি টিপ। ভ্রু টেনেছে সরু করে, চোখে কাজলের ফ্রেম। মাথার পেছনে টানটান করে চুল বাধা। অত্যন্ত প্ৰশান্ত আত্মস্থ স্নিগ্ধস্নাত মনে হচ্ছে তাকে। মুখটাকে দেখাচ্ছে কোমল ব্ৰাউন। এত কোমল যেন স্পর্শ করলেই ভেঙ্গে যাবে। গভীর চোখ তুলে তাকাল জাহেদা। বসে বসে নোখে রং পরছিল সে। সমুখে নাশতা সাজান। বাবর মিষ্টি করে হাসল। বলল, তুমি বসে আছ?
কতক্ষণ নাশতা দিয়ে গেছে। এই আপনার আসা? খান।
তুমি?
আপনি শুরু করুন।
গতরাতে যেন কিছুই হয়নি, গতরাত যেন অন্য কারো নাটকের রাত ছিল, জাহেদাকে দেখে এখন তাই মনে হলো বাবরের। তার মনে একটুখানি আশঙ্কা ছিল এই সকালের জন্য, এখন তা একেবারে নির্মল হয়ে গেল। সে একবার তার প্রশংসা করবে ভাবল, কিন্তু করল না। দুচোখ ভরে দেখল জাহেদাকে তার বদলে। আজ সকালে যেন আরও সুন্দর লাগছে তাকে। উঃ, আপনার এই হাসিটা।
