আরে, কী হয়েছে?
আপনার এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হওয়া উচিত।
অবশ্যই।
বলে সাঁ করে গাড়ি পথের ওপর তুলে আনল বাবর। রওয়ানা হলো শহরের দিকে। হাসতে হাসতে বলল, জানি না। কীভাবে কথাটা ইংরেজিতে অনুবাদ করব, বাংলায় একটা কথা আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমার হয়েছে সেই অবস্থা।
আমি বেশ বাংলা বুঝি সাহেব। আপনি খামোক সৰ্বক্ষণ ইংরেজি বলেন।
কী জানি। বাংলায় বললে মনে হয় তুমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি কী বলতে চাইছি। ইংরেজিটা অনেক নির্ভরযোগ্য মনে হয় তাই।
জাহেদা সীটো গা এলিয়ে বসল।
নিপুণ হাতে গাড়ি চালাতে চালাতে বাবর বলল, তখন ঐ বিরহ শব্দটা বুঝেছ?
না।
কী করে বোঝাই তোমাকে ইংরেজি কী হবে বুঝতে পারছি না। এটা একটা বিচ্ছেদের অবস্থা। সঙ্গে অনন্ত বেদনা আছে, প্ৰতীক্ষা আছে।
লঙ্গিং?
না, না, লঙ্গিং নয়। তার চেয়েও বেশি। বিরহ বুঝতে হলে তোমাকে রাধার কথা জানতে হবে। রাধা।
আমি রাধাকে চিনি। রাধা হচ্ছে হিন্দুদের একজন সুন্দরী দেবী। ইন্ডিয়ান লাভ মেলোডিজ বলে একটা লং প্লেয়িং রেকর্ড, তার কভারে আছে রাধার ছবি।
বাবর হাসল।
কি, ভুল বলেছি।
না, নাতো। বোধহয় জান না, রাধা শুধু দেবী নয়, কল্পনা নয়, রাধা যে-কোনো মেয়ের নাম কোনো বিশেষ মুহূর্তে।
অর্থাৎ?
কিছু না, ও কিছু না। তুমি আমার রাধা। সবুজ আর গোলাপি দিয়ে আঁকা, চোখে বর্ষার মেঘ টানা, কাচুলিতে নীল পয়োধর বাঁধা, তুমি আমার রাধা।
বাংলা ভাল বুঝি না বলে যা খুশি তাই বলছেন, বুঝি না বুঝি। আপনি এখন থেকে ইংরেজি বলবেন। শুধু ইংরেজি।
তাইতো বলছিলাম কাল থেকে।
তাই বলবেন সাহেব এরপর থেকে।
ইয়েস, ইয়োর ম্যাজেস্টি।
বাবর পথের দুদিকে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে তাকাতে লাগল। কী দেখছেন?
এইখানে কোথায় মিলন স্টোর বলে একটা দোকান আছে।
কী কিনবেন?
কিছু না। আমার এক বন্ধু আডা মারতে আসেন শুনেছি। ঢাকায় বহুবার বলেছেন রংপুরে এলেই যেন খোঁজ করি। চমৎকার মানুষ। এই যে!
পেট্রল পাম্প পেরিয়েই দোকানটা। বাবর সেখানে প্রণব বাবুর খোঁজ করল। না, তিনি তো নেই। হ্যাঁ, তিনি এখানে সকাল বিকেল আসেন। আজো আসবেন। বাবর একটা টোকা লিখে দোকানির হাতে দিল। হ্যাঁ, এলেই প্রণব বাবুকে দেবে। লোকটা সারিসের মত গলা বাড়িয়ে যদ্দুর দেখা যায় বাবরকে দেখল। পাম্প থেকে পেট্ৰল ভরে নিল বাবর। বলল, চল তাহ হাটের মহারাজার প্রসাদটা দেখিয়ে আনি।
মহারাজা?
ছিলেন, এখন নেই। শুনেছি শেষ যিনি মহারাজা ছিলেন। কলকাতা যাবার পথে গাড়িতে হার্টফেল করে মারা গেছেন।
বেচারা। জাহেদা দুঃখিত মুখ করল।
মানুষ তো মরেই। মরবে না?
তবু কী আশ্চর্য, এইটুকু জীবনের জন্য কত না হৈচৈ।
সেটা দোষের নয়। মানুষ এত হৈচৈ করে কেন জান? করে সে যে বেঁচে আছে সেইটে অনুভব করার জন্যে।
এবং করাবার জন্যে। জাহেদা যোগ করল।
হয়ত। তবে আমার মনে হয়, না। আমার মত তোমারও যখন বয়স হবে তখন তুমিও বুঝতে পারবে, মানুষের নিজের কাছে নিজেই প্রমাণ দেয়া যে সে বেঁচে আছে এইটে বড়। কটা লোক বুকে হাত দিয়ে বলতে পারে সে বেঁচে আছে?
জাহেদা সে চ্যালেঞ্জের ধারে কাছে দিয়েও গেল না। মুখ গোল করে বলল, আপনি সব সময় নিজেকে খুব বুড়ো ভাবতে ভালবাসেন, না?
হেসে ফেলল বাবর।
আবার হাসছেন?
হাসছি? না, হাসছি না। কী জানি, হয়ত নিজেকে বুড়েই মনে করি। বয়স তো হচ্ছেই। কী জানি তোমাদের দেখে একেক সময় ঐ রকম হয়। দুদিন পরে এই তুমি গম্ভীর হয়ে যাবে, চঞ্চলতা কমে যাবে, শাড়ি পরবে, সংসার করবে, মা হবে।
কখনো না।
আইবুড়ো থাকবে?
হ্যাঁ, থাকব।
কেন?
কেন আবার? বিয়ে টিয়ে আমি পছন্দ করি না। হাসছেন যে?
কই?
আপনার হাসি দেখলে আমার গা জ্বালা করে। কেন, আপনিও তো বিয়ে করেননি। আমি যদি হাসি?
আমি ধন্য হব।
আমার কী দায় পড়েছে। আপনাকে ধন্য করব?
রাগ করেছ।
জাহেদা চুপ করে থাকে। বাবরের সত্যি সত্যি একবার মনে হয় তার হয়ত বয়সই হয়ে যাচ্ছে এবং তাই সে বুঝতে পারছে না। এই সদা কৈশোর পেরুনো তরুণীকে। সে বলল, একটা লিমেরিক শুনবে? বলে সে আর জাহেদার মতামতের অপেক্ষা করে না। বলে চলে–
আল্লাতালা বানিয়েছিলেন আদম এবং হাওয়া।
হাওয়া বলেন, দুর্ভাবনা বেবাক হলো হাওয়া।
ব্যাটাছেলে বলতে এক,
আমারই সে তাকিয়ে দ্যাখ!
কারো সাথে করতে তো নেই চুলোচুলি বাওয়া।
হেসে ফেলল জাহেদা। তারপর লজ্জায় একটু মাথা দুলিয়ে চিবুক নামাল। বলল, আপনার মাথায় কী কী যে সব খেলে। এটা বললেন কেন?
বললাম এই জন্যে যে, আমাদের অবস্থাটা খুব ভিন্ন নয়। তোমার এখন রাগ করতে আমি, ঝগড়া করতে আমি, আবার আদর করতেও–
জি না।
জাহেদা পা গুটিয়ে বসল। চুপচাপ গাড়ি চালাল কিছুক্ষণ বাবর। ভেতরটা আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তার। আজ সকালে এই প্ৰথম। যেন ভোরের মিঠে সূর্যটা এখন মাথায় চড়ে গনগন করছে।
বাবর তার নাম ধরে ডাকল। জাহেদা তাকাল তার দিকে। হাসল বাবর। আস্তে আস্তে জাহেদাও হেসে ফেলল। বাবর তখন একটি হাত ষ্টিয়ারিং থেকে তুলে চিকিত ছুঁয়ে দিল জাহেদার কাঁধ। বলল, এই মেয়ে, কথা বলছ না? আচ্ছা, আরেকটা লিমেরিক বলি।
না, না, বাবা আর না।
শুধু এইটে। বলেই ব্যাস।
খারাপ কিছু বললে আমি কিন্তু কাঁদব।
কেঁদ। তোমাকে কখনো কাঁদতে দেখিনি।
কাঁদলে খুব বিচ্ছিরি দেখায় আমাকে। আমি যদি কোনোদিন কাঁদি, আমার মুখের দিকে কিন্তু আপনি তাকাতে পারবেন না।
