মনে মনে হাসল সে। হোস্টেলে শরমিন, পাপ্পু আর জাহেদা নিশ্চয়ই কখনো কখনো একজন আরেকজনকে আবিষ্কার করে। নইলে সে চমক নেই কেন জাহেদার? সেই বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলীনের মরা ব্যাংয়ের মত নড়ে ওঠা? হঠাৎ থমকে গেল বাবর। দ্রুত আঙুল বুলিয়ে দেখল। অ্যাকসিডেন্ট হলে শাদা ট্রাফিক পুলিশ যেমন ছুটে যায় তেমনি হাতটা পাঠিয়ে দিল সে। অবাক হয়ে টের পেল একটা শক্ত মোটা খসখসে কাপড়ের ফালি দিয়ে দৃঢ় আবৃত জাহেদার অঙ্গ। ফালিটা অনুসরণ করে কোমরে পৌঁছে অনুভব করল চওড়া একটা ফিতের ঘের, চেপে বসে আছে কোমল মাংসে। সন্ধান করল গ্রন্থি। কিন্তু পেল না। উন্মোচনের অধীরতায় বারবার পিছলে যেতে লাগল তার আঙুল। আবার ফিরিয়ে আনতে লাগল। জাহেদা মাথা এপোশ ওপাশ করতে করতে অনুচ্চ কিন্তু তীব্র স্বরে উচ্চারণ করল, না, না।
শান্ত হলো বাবরের হাত। সে হাসল। জিগ্যেস করল, তোমার শরীর খারাপ?
জাহেদা কিছু না বলে মাথা নাড়তে লাগল শুধু।
কবে থেকে?
তবু কিছু বলল না জাহেদা। বাবর মনে মনে ভাবল, কপাল একেই মন্দ বলে। কিন্তু তাতে নিবৃত্ত হলো না সে। আবার সচল হয়ে উঠল।
না।
হেডা সোনা।
না।
কবে থেকে খারাপ।
না।
খারাপ নয়?
না।
না?
যেখানে ছিল সেখানেই থেকে গেল বাবর। শরীর খারাপ নয়? তাহলে। তাহলে এই দেয়াল কেন তুলেছে জাহেদা? কখন সে নিজেকে এভাবে বেঁধেছে? তার মনে পড়ল, ঢাকায় তার বাড়িতে বাথরুমে গিয়েছিল জাহেদা, তারপর বাঘাবাড়িতে, আরেকবার এখানে এই ডাকবাংলোয়। হঠাৎ একটা কথার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার চেতনা। জাহেদা যখন আসতে রাজি হয়েছে তখন থেকেই জানত পরিণামে এই-ই হবে। হয়ত তাই আজ হোস্টেল থেকে বেরুবার আগেই নিজেকে সুরক্ষিত করে নিয়ে বেরিয়েছে। বাবরের মনে পড়ল প্ৰতিবার বাথরুমে অনেকক্ষণ সময় নিচ্ছিল সে। বান্ধন খোলা এবং লাগানোয় তো সময় লাগবেই। সারাদিনে সেই জন্যেই তো তিনবার।
জাহেদা জেনে শুনেই এসেছে। কী বোকা আমি। আমার সঙ্গে এতদূর ওভাবে হোস্টেল পালিয়ে কোনো মেয়ে কেন রাজি হয়েছে দেখেই বোঝা উচিত ছিল। বোধহয় ভালবাসে। ভালবেসে ফেলেছে আমাকে। কিন্তু কবে থেকে? কই, আমি তো কিছুই লক্ষ করিনি। সে জন্যেই কী ভালবাসার অর্থ জিজ্ঞেস করেছিল মেয়েটা?
ঈশ্বর, এদের দয়া কর। এবং আমাকেও। আমি এত মোটা মাথা বলে।
তাই জাহেদা আসবার পথে প্ৰথমে আমন চুপ করেছিল। আবার এ ঘরে শুতে আসার সময় কথা বলে চলেছিল অনর্গল যেন ভাবনাটা মাথায় না বাসা বেঁধে থাকে। আর এই সারাক্ষণ তার পাজামার ভেতরে শক্ত কাপড়ের কামড় ধরে রেখেছে সে। আশ্চর্য! আমি তাহলে এখনো বুড়ো হয়ে যাইনি।
ভেতরটা খুব উদার হয়ে এলো বাবরের। কিন্তু সেই সঙ্গে বাসনাও গাঢ় হলো আরো। সে আবার খুঁজতে লাগল উন্মোচনের গ্রন্থি। দুহাতে তাকে চেপে ধরল জাহেদা। না, না। মা, মা, আম্মি।
কণ্ঠে কান্নার ধ্বনি। বাবর তার মাথায় সস্নেহে হাত রাখল।
মাকে কেন ডাকছ সোনা?
আম্মি, আম্মি।
আমি তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাব সোনা। যাবে তুমি?
জাহেদা শুধু মাথা এপাশ ও পাশ করতে লাগল।
বাবর তখন কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, ও-রকম করে না।
জাহেদা বাবরকে জড়িয়ে ধরল।
আবার তার গ্ৰীবায় একটা দীর্ঘ চুমু দিয়ে বলল, আমাকে ধরে শুয়ে থাক। তোমার কোনো ভয় নেই।
চুলে হাত বুলিয়ে দিল তার। তারপর তাকে বুকে করে পিঠের পরে একটা হাত রেখে আরেকটা হাতে জাহেদার মাথা তুলে নিয়ে সে বলল, হেডা তুমি ভাল মেয়ে। তুমি ঘুমোও। আমি আর কিছু করব না। হেডা, ও হেডা, তুমি মাকে কেন ডাকলে? তুমি কার মত দেখতে হয়েছ? মা-র মত? ও সোনা, তুমি ঘুমাও। আমি তোমাকৈ ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।
জাহেদার পিঠে। মৃদু চাপড় দিতে দিতে বাবর গুনগুন করে উঠল, অনেক আগে শোনা জোন বাজের একটা গান। ঘুমপাড়ানির মত সুর! কোথায় যেন কান্না। ছেলেবেলা থেকে কনভেন্টে ইংরেজি পড়া মেয়ের জন্যে আর কোনো এই মুহূর্তের গান তার জানা নেই। সে গাইতে লাগল–
সেই গ্রীষ্মের কথা স্মরণ কর
এবং ক্ৰন্দন কর মাথা নিচু করে,
প্ৰাণনাথ তুমি ক্ৰন্দন কর।
লোকে বলে বিচ্ছেদ আসে
প্রতিটি ভাল বন্ধুর জীবনে;
তাহলে তুমি আর আমিই বাঁ ব্যতিক্রম কীসে?
প্ৰাণনাথ তুমি ক্ৰন্দন কর।
সেই গ্রীষ্মের কথা স্মরণ কর
এবং ক্ৰন্দন কর মাথা নিচু করে।
১৫. হেডা, ও হেডা
খুর ভোরে ঘুম থেকে উঠল বাবর। জেগে দেখল জাহেদ আর সে পিঠ ফিরিয়ে শুয়েছিল। জাহেদাকে এখন জাগাল না। দ্রুতপায়ে নেমে বাথরুমে গেল, পরিষ্কার করে গাল কামাল, গরম পানি আনিয়ে গোসল করল অনেকক্ষণ ধরে। পরল তার শাদা ফ্ল্যানেলের সুট। সবুজ ফোঁটা দেয়া টাই বাধল গলায়। মন খুব ভাল থাকলে এই পোশাকটা সে পরে। টাইটা আলজিরিয়া থেকে আনিস তাকে পাঠিয়েছিল।
তারপর জাহেদার জন্যে গরম পানি আনিয়ে তার কানের কাছে মুখ রেখে ডাকল, হেডা, ও হেডা।
চোখ মেলে অচেনা চোখে এক পলক তাকিয়ে রইল জাহেদা। হঠাৎ একটা সলজ্জ স্নিগ্ধতায় ভরে গেল। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা মুখ।
শিগগির তৈরি হয়ে নাও। আমি নাশতা নিয়ে আসছি। কেমন।
বলে সে হাত ধরে জাহেদাকে তুলে দিয়ে বেরুল। বেরিয়ে দেখল। সারারাত শিশিরে গাড়িটা ভিজে আছে। কাচ অস্বচ্ছ হয়ে গেছে। কাচের ওপর আঙুল বুলাতেই সুন্দর পরিষ্কার দাগ ফুটে উঠল। তখন বড় বড় করে সে লিখল H-E-D-A. কৌতুকভরা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল, আবার মুছে দিল। রুমালটা ভিজে গেল সারা রাতের শিশিরে।
