আপনি?
আমি কিছুক্ষণ বসে থাকব।
বলে বাবর আরো একটা সিগারেট ধরাল। জাহেদা কী ভেবে একটু পর চোখ বুজল। তখন একেবারে অন্য একটা মেয়ে বলে মনে হলো। সে একটু সোজা হয়ে বসতেই চেয়ারে ক্যাচ করে একটা শব্দ উঠল। চোখ খুলল জাহেদা। তাড়াক করে উঠে বসে কম্বলটা পা পর্যন্ত ঠেলে দিয়ে বলল, এ হতে পারে না। আপনি কী গায়ে দেবেন? তাকে উঠতে দেখে বাবরও নিজের অজান্তেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। এখন সে হেসে ফেলে বলল, আমার জন্যে ভাবতে হবে না। তুমি ঘুমাও তো।
না।
দ্যাখ, দুষ্টুমি করলে কিন্তু আমি বকব।
আমার ঘুম আসবে না।
আসবে, চেষ্টা করলেই আসবে। শুয়ে পড়।
জাহেদা কম্বলের দিকে চোখ ফেলে চুপ করে রইল।
কথা শুনতে হয় জাহেদা। তুমি ঘুমোও। আমার তেমন কিছু ঠাণ্ডা লাগছে না। সোয়েটার আছে। একটা চাদর এই যে। এতেই চলে যাবে।
জাহেদা একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার তেমনি গোয়ারের মত বসে রইল। বাবর দাঁড়িয়ে আছে বলে জাহেদাকে ওপর থেকে দেখছে। চিবুকটা সরু লাগছে। কোমল একটা ত্রিভুজের মত মনে হচ্ছে। ত্রিভুজটার খাড়া নিচে তার দুই ঊরুর সংযোগ বিন্দু। সেটা চোখে পড়তেই বাবরের আরেকবার মনে হলো, কী দীর্ঘ, কী ক্লান্তিকর এইসব প্রস্তুতি। মুখে কিন্তু অন্য রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল সে। এক টুকরো বাঁকা হাসি। ধাক্কা দিয়ে হাসল সে একটু। হাসতে হাসতে বলল, বোকা মেয়ে, এক কম্বলে দুজনের হয়? নাও, শুয়ে পড় দেখি।
হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল জাহেদা। সুবোধ মেয়ের মত নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল পাশ ফিরে; পা থেকে মাথা পর্যন্ত কম্বল টেনে দিল নিজেই। নীল জামা পাজামা, ফোলান লালচে চুল, পরিচ্ছন্ন ঘাড়, সব ঢাকা পড়ে তাকে দেখাল একটা বৃহৎ জান্তব্য পোস্টাল পার্সেলের মত।
বাবর ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ। হঠাৎ করে মাথার ভেতরে সব শূন্য হয়ে গেছে যেন। অনিশ্চিতভাবে এদিক ওদিক সে তাকাল। তারপর আস্তে আস্তে শরীরের মধ্যে টের পেতে শুরু করল একটা অস্থির স্রোত সরু হতে হতে নিচের দিকে নেমে আসছে। যতই নামছে জ্বালা বাড়ছে তত। সেতারে ঝালার মত তীব্র সেই অনুভূতি। বাবর নাভির নিচে হাত রাখল, চেপে ধরল এবং তখন তার মনে পড়ল। অনেকক্ষণ বাথরুমে যাওয়া হয়নি। এখন সেটা ফেটে বেরুতে চাইছে।
সন্তৰ্পণে বাথরুমের দরোজা খুলে ঢুকল সে। ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল সন্তৰ্পণে। স্যাঁতস্যাঁতে হলুদ দেওয়াল যেন চেপে এগিয়ে এলো চারদিকে। শীত করতে লাগল হঠাৎ।
নিঃশেষে ভারমুক্ত হলো বাবর। টোকা দিয়ে শেষ বিন্দুটা পর্যন্ত ঝরিয়ে দিল। পানি দিতেই ছ্যাত করে উঠল ঠাণ্ডাটা। প্রায় লাফিয়ে উঠেছিল বাবর। নিজেকে সামলে নিল। দেখল কেমন দ্রুত গুটিয়ে আসছে ওটা; রং শ্যামল থেকে কালো, কালো থেকে ঘন কালো হয়ে গেল, এখন তাকে দেখাল কোনো পুরনো বাড়ির সদর দরোজায় বেরিয়ে পড়া মড়চে ধরা বড় একটা ইস্কুরুপের মত। জাহেদার আকাশ-নীল তোয়ালে দিয়ে আবৃত করে মুছল সে। তোয়ালের নরম সুতোয় শুষে নিল সমস্ত সিক্ততা। এখন সেটাকে দেখে বাবরের মনে হলো মিটিমিটি হাসছে।
তারপর আয়নায় আবার ভাল করে মুখ দেখে, মাথার চুল টেনে টাক ভাল করে একপ্রস্থ ঢেকে বেরিয়ে এল আগের মতই সন্তৰ্পণে। দরোজা লাগিয়ে ঘুরে দেখে জাহেদা এখন উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, তেমনি কম্বলে ঢাকা, নিতম্বের নিচে দুপায়ের ফাঁকে সৃষ্টি হয়েছে একটা দীর্ঘ উপত্যকা, একগুচ্ছ চুল বেরিয়ে আছে বালিশে।
বাবর টের পেল, জাহেদা এখনো ঘুমোয়নি।
সে এবারে তার নিজের বিছানায় বসল, সাবধানে ধীরে, ধীরে। মাত্র একাগজ দূরে জাহেদার বিছানা। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। কী অসীম দূরত্ব। কিম্বা কাছেই, মাঝে একটি স্তব্ধতার পাহাড়। বাবর কান খাড়া করে বাইরের শব্দ শোনার চেষ্টা করল। তখন কানে এলো দূরে কোথাও কারা কথা বলছে, একটা রিকশা টুনটুন করে চলে গেল, কুকুর ডাকছে দীর্ঘস্বরে। জাহেদা পড়ে আছে, যেন একটা মৃতদেহ। যেন এতটুকু প্ৰাণের লক্ষণ নেই তার আচ্ছাদিত দেহে। সম্মোহিতের মত তাকিয়ে রইল বাবর। দ্রুত নিঃশ্বাস পড়তে লাগল তার। এত শব্দ হতে লাগল যেন জাহেদা শুনতে পাবে। প্ৰাণ পণে সে নিঃশ্বাস শাসন করতে লাগল। ফলে দেহের আধোভাগে উত্তাপ আরো দ্বিগুণ দ্রুততায় বৃদ্ধি পেতে লাগল তার। পায়ের উপর পা দিয়ে বসল সে।
হাঃ ফিরোজ মাজমাদার বলে কিনা, ভালবাসা না হলে তার জমে না। আজ বিকেলে রংপুরের পথে জাহেদাকে সে যা বলেছে তা শোনা উচিত ছিল তার। নিজেই চমৎকৃত হলো ভেবে-ভালবাসাকে কাঁঠাল বলেছে। কথাটা তখনি মাথায় এসেছিল। এর চেয়ে চমৎকার করে আর দেখান যেন না ভালবাসার আকাশ-প্ৰমাণ মিথ্যেটাকে। হাঃ।
তবে হ্যাঁ, আমি বাছাই করি, আমার পছন্দ-অপছন্দ আছে। সবার সঙ্গেই শুতে হবে নাকি? বাজারের সব জামা কি পছন্দ হয় আমার? দশটার মধ্যে একটা কিনি। তার কাপড় পছন্দ হতে হবে, বুনোন ভাল হওয়া চাই, রং পছন্দ হওয়া চাই, ছাঁট ভাল লাগা চাই। তবে তো? এমন রংয়েরও জামা আছে বিনি পয়সায় দিলেও আমি ছুঁয়ে দেখব না। মাজমাদারকে এক সময় বলবে সে। দেখি সিঙ্গি মাছটা জবাব কী দেয়?
আরো একটু এগিয়ে বসল বাবর। কোনোমতে কেবল পেছনটা তার ছয়ে রইল খাটোয় প্ৰান্ত। সে জানে, একটু পর ওখানে একটা গভীর সরল রেখা পড়ে যাবে। অবশ হয়ে আসবে। শেষে ঝিনঝিন করে উঠবে। তবু ঐ কষ্টকর ভঙ্গিতে বসে রইল সে, বসে রইল জাহেদার উপুড় হয়ে থাকা অস্তিত্বের দিকে অপলক তাকিয়ে।
