কোনোদিন জানবেও না। বাবর প্রশস্ত হেসে বলল।
তখন কী যেন কথাটা বলছিলেন? অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝখানে, কী যেন?
অতীত আর ভবিষ্যতে মাঝখানে তুমি আছ, যেখানে আগেও ছিলে, পরেও থাকবে। অর্থাৎ সব সময়ই বর্তমান, জাহেদা। বর্তমানটাই আমরা একমাত্র চাক্ষুস করি। অসংখ্য বর্তমানের একটি মালা এই জীবন।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাটতে ওরা সেই মন্দিরের কাছে এলো যেখানে কাঁসর বাজছিল। এখন সেখানে গান হচ্ছে। একটা তালপাতার মত লোক, মাথায় একরাশ কোঁকড়ান বাবরি, পরনে হলুদ ধুতি, গায়ে লাল ছোপান গেঞ্জি, কপালে চন্দনের ফোঁটা দুহাত তুলে গান করছে। চারদিকে মেয়ে পুরুষে গোল হয়ে ভক্তিমন্ত্র মনে বসে আছে। জাহেদা অবাক হয়ে শুনতে লাগল। তন্ময় হয়ে শুনতে লাগল সে। লোকটা বলছে। —
তোমার স্বৰ্ণসীতা কি কথা বলতে পারে? না। সে কি চোখে দেখতে পারে? না, তাও পারে না। সে কি কানে শুনতে পায়? না, সে কানেও শুনতে পায় না। সঙ্গে সঙ্গে মৃদঙ্গে একটা রোল পড়ল। লোকটা দুহাত তুলে ঘুরতে ঘুরতে এবার সুরে গেয়ে উঠল, তবে চাই না, চাই না।
আমি স্বর্ণসীতা চাই না। স্বর্ণসীতা কী, জিগ্যেস করবার জন্যে জাহেদা ফিরে তাকাতেই টের পেল বাবর তার একেবারে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণে শরীরের পেছনে যে উষ্ণতা তাকে জড়িয়েছিল তা বাবরের। জিগ্যেস করা আর হলো না। কেবল বলল, চলুন।
চল।
নিঃশব্দে পায়ে হেঁটে বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানপাটের, থমথমে দরোজাগুলোর সমুখ দিয়ে তারা বাংলোয় এসে পৌঁছুল। আবার সেই মাঠের মধ্য নালাটার কাছে এসে বাবর তার হাত ধরল। হাত ধরে পার করে দিল তাকে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
জাহেদা বলল, একটা বাতি নেই।
বাবর কিছু বলল না। শুধু হাসল। ঠিক হাসিও নয়, হাসির একটা তরঙ্গ মাত্র। কেমন একটা উদ্বেগ তার ভেতরে এখন হঠাৎ বড় হচ্ছে, কেন হচ্ছে তা বুঝতে পারছে না।
জাহেদাই বলে চলল, আমাদের হোস্টেলেও এ রকম হয়। হঠাৎ হঠাৎ চুরি হয়ে যায়। কে চুরি করে কে জানে?
নিঃশব্দে ঘরের দরোজা খুলল বাবর। জাহেদা কথা বলেই চলেছে।
একদিন অন্ধকারে প্রায় গড়িয়ে পড়েছিলাম সিঁড়িতে। বাঁ পায়ের গোঁড়ালিটা মচকে গিয়েছিল। সারারাত কী ব্যথা! পাপ্পু তেল মালিশ করে দিয়েছিল। ও জানেন, খুব সেবার হাত ওর। কার কোথায় মাথা ধরেছে, কার গা গরম, কে তরকারি পছন্দ নয় বলে খায়নি, কার বাড়ির চিঠি পেয়ে মন খারাপ-সব পাপ্পু সামলাচ্ছে।
জাহেদা কথা বলছে আর বাবর ওদিকে কখনো একটু হাসছে, কখনো তাই নাকি বলছে আর বিছানা ঠিকঠাক করছে চটপটে দুহাতে। একবার শুধু ছোট্ট করে বলল, পুলওভারটা খুলে বস। কম্বলের নিচে চাদর দিয়ে দিয়েছি।
জাহেদা পুলওভার খুলতে খুলতে বাধ্য বিনীত ভঙ্গিতে কম্বলের তলায় পা চালান করে চুলে একটা ঝাড়া দিয়ে ঠেস দিয়ে বসল। আর এই সৰ্বক্ষণ বলে চলল কথা।
পাপ্পুকে তো দেখেননি? একদিন আলাপ করিয়ে দেব। রাঙ্গামাটির মেয়ে। তেমনি চ্যাপ্টা নাক, চওড়া মুখ, হলুদ রং; কিন্তু ভারি মিষ্টি। জানেন ওরা বৌদ্ধ। আমাদের সবাইকে বলেছে ওদের ওয়াটার ফেষ্টিভ্যাল হয়, এবার নিয়ে যাবে দেখাতে। খুব নাকি মজা হয়। ভরা পূর্ণিমা রাতে নাচ হয়, গান হয় পুজো হয়। আচ্ছা, বৌদ্ধারা কি হিন্দু?
না।
তাহলে ওরা পুজো করে যে। একটু অন্যমনস্ক দেখাল জাহেদাকে। তারপর হেসে আবার তুবড়ি ফোঁটাতে লাগল, আমার কিন্তু ভালই লাগে। আমি অবশ্য কোনোদিন পুজো দেখিনি। আমার বাবা জানেন, আমাকে ইংরেজি পড়িয়েছে বটে বিস্তু ভারি গোঁড়া। আমাদের কোথাও নিয়ে যায়নি। কোনো একটা কিছু করতে গেলেই হা হাঁ করে ওঠেন। তুলার মুখে সৰ্বক্ষণ গোল গেল লেগে আছে। পারেন তো ছেলেমেয়েকে একেবারে ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখেন। একবার জানেন কী হলো–আজকাল তো ওড়না পরে না, শুধু কামিজ পাজামা। তাই পরে বাড়ি গেছি, বাবার তো চক্ষুস্থির। রাগে হার্টফেল করেন আর কী? মাকে বললেন, মেয়ের জন্ম দিয়েছ, আদব কায়দা নামাজ রোজা শেখাতে পারনি? জান, ছেলেমেয়ের দোষে বাপ-মাকেও দোজখে যেতে হয়? আচ্ছা বলুন তো, যেতে হয় নাকি? বাবর সেই কখন, আরাম চেয়ারটা টেনে, তার ওপর গা এলিয়ে বসেছে। একদৃষ্টি তাকিয়ে জাহেদার দিকে। জাহেদার একটা কথাও কানে যাচ্ছে না তার; কেবল জাহেদার জীবন্ত, বিচিত্র প্রতিক্রিয়ার দূরান্ত মুখখানা সমস্ত অস্তিত্ব, বস্তু এবং বিশ্ব জুড়ে আছে। জাহেদা এবার থামতেই কুয়াশার মত হাসল বাবর। জাহেদাও হঠাৎ চুপ হয়ে গিয়ে নিম্পলক তাকিয়ে রইল তার দিকে। একটি যুগ যেন অতিবাহিত হয়ে গেল। সে নিজেই মনে করতে পারল না। এতক্ষণ একতাড়া কী বলছিল সে। ভীষণ অপ্ৰস্তুত হয়ে হঠাৎ সপ্রতিভ হবার চেষ্টা করল। বলল, কম্বল একটা যে! কিম্বল? বাবর হাসিতে মধুর হয়ে উঠল। উত্তর দিল, মফঃস্বলের ডাকবাংলো কম্বল এদের একটাই আছে। ঢাকা থেকে আনা উচিত ছিল। কে জানে। এখানে এত শীত।
এত শীত কেন এখানে?
হিমালয়ের কাছে যে। এইতো, চোখ তুলে তাকালেই হিমালয়।
আপনার শীত করবে না? জাহেদা উদ্বিগ্ন চোখে প্রশ্ন করল।
নাহ। চলে যাবে। রাত অনেক হয়েছে তুমি ঘুমোও। সারাদিন পথ চলে ক্লান্ত তুমি।
বলে সে জাহেদার কাছে এসে তার বুক পর্যন্ত কম্বল টেনে দিল গুঁজে দিল, চারপাশে। যখন ওপাশে গুঁজে দিচ্ছিল তখন তোরণের মত বাঁকা তার দেহের নিচে ঢাকা পড়ে গেল জাহেদা। সোজা হতেই দেখল জাহেদা বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়েছে ততক্ষণে। কিন্তু চোখ খোলা। কাজল একজোড়া চোখ টলমল করছে। চোখের শাদায় শিরাগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার। আর খাড়া নাকের নিচে সোনালি রোম, যেন কিছু ফুলের রেণু লেগে আছে ওখানে। শিরশির করে উঠল বাবরের শরীর। সে আবার আরাম চেয়ারে এসে বসল। বলল, ঘুমোও।
