হঠাৎ আরো একটা তুলনা মাথায় এলো তার। আদিম কালে মানুষ যখন অরণ্যচারী ছিল, পাথরের বল্লম নিয়ে শিকার করত, তখন কী তার একপাল শ্বাপদের মধ্যে এটিকে পছন্দ হয়ে যেত না?–যাকে নিজ হাতে হত্যা করতে ইচ্ছে হয়?
সে যদি গল্প লিখতে জানত, তাহলে চমৎকার একটি গল্প লিখিত সে। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে। হিমালয়ের পাদদেশে অরণ্যের এক প্ৰান্তে বাস করত এক গোষ্ঠী। তার তরুণ এক সদস্য একদিন পিপাসার্ত হয়ে ঝিলে গিয়েছিল। উপুড় হয়ে জন্তুর মত জলপান করছিল সে। তৃপ্ত হয়ে মুখ তুলতেই দেখে ওপারে দপদপে একটা আগুন স্থির হয়ে আছে।
বাঘ! তরুণ একটি বিদ্যুতের তরঙ্গ।
মুহূর্তে সে নলখাগড়ার ভেতরে অন্তৰ্হিত হলো। কিন্তু তাকে আর ভুলতে পারল না সে। তার দিনের আলো আর রাতের অন্ধকার জুড়ে রইল সেই বাঘের দুঃসহ বুকভাঙ্গা সৌন্দর্য। গোষ্ঠীর মধ্যে নিঃসঙ্গ ঘুরে বেড়ায়। উৎসবের রাতে সে দূরে নির্জনে পাথরের চাকতির ওপর বসে থাকে। সূর্য ওঠার আগে চুপিচুপি বল্লম হাতে অধীর হৃদয়ে বেরিয়ে পড়ে। প্রতি বনে, প্ৰতি ঝিলের কিনারে, রৌদ্র ছায়ায়, শরবনে সে সন্ধান করে বাঘটাকে। গোষ্ঠী প্ৰধান তার সুদূরে নিবদ্ধ চোখ দেখে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেন, কিন্তু কোনো উত্তর পান না। সবার সঙ্গে থেকেও সে আলাদা। যেন সে একটা ভিন্ন সময়ের ভিন্ন জগতের মানুষ।
কিন্তু পরিহাস এই মানুষটা জানে না প্রথম যেদিন বাঘটা তাকে দেখেছে সেও তার তাকে ভুলতে পারেনি। ভুলতে পারেনি ঝিলের ওপর উপুড় হয়ে পড়া পেশির স্থির তরঙ্গে গরীয়ান তার প্রশস্ত কাল কাঁধ। যখন চোখাচোখি হয়েছিল তখন যে তত্ত্বরিত প্রবাহিত হয়েছিল তার অভিভাব যেন মাতৃযোনী থেকে নির্গমনের মত। জতুটাও সেই তরুণের সন্ধানে বারবার এসেছে ঝিলের কিনারে, রাতের অন্ধকারে সাহস করে গোষ্ঠীর আগুন জ্বালা বাসস্থান পর্যন্ত গিয়েছে। আকাশে মুখ তুলে ঘ্রাণ নিয়েছে। বুনো হলুদ ফুলের মত কান দুটো খাড়া করে সেই তরুণের মুখনিঃসৃত কোনো শব্দ শুনতে চেষ্টা করেছে সে।
তারপর একদিন পূর্ণিমা রাতে যখন সুন্দরী রমণীর গাত্রবর্ণের মত জোছনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে চারদিক, উত্তরে হিমালয় যখন গভীর তন্ময় একটি মৃদুহাস্য হয়ে আছে, ঝিলের জল যখন তীব্র আবেগে কুঞ্চিত হয়ে গিয়েছে, তখন তাদের সাক্ষাৎ হলো। এবড়ো থেবেড়ো জমির ওপর, চন্দ্ৰতারকাখচিত রঙ্গমঞ্চে, দুধারে সুউচ্চ বৃক্ষের উইংস দিয়ে দুজনে বেরিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল। নদীর উৎস মুখে। যেমন অবিরাম একটা তান শোনা যায় তেমনি একটা ধ্বনি সমাবেশ শুনতে পেল তারা উভয়ে। তাদের চোখগুলো একেকটি ক্ষুদ্র তীব্ৰ চাদ হয়ে গেল। বল্লম তুলল তরুণ। জন্তুটা একবার মুখব্যাদান করল— হিংসায়, ক্ৰোধে সে এ রকম করে থাকে। কিন্তু আজ সে আবেগ নয়, সম্পূর্ণ অন্য কিছু যা তার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। সে দৃপ্ত পিঠটাকে বাঁকিয়ে মাটি স্পর্শ করল প্রায়, যেমন সকল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মাটি স্পর্শ করে মানুষকে সে নিতে দেখেছে। তারপর একটি মাত্র মুহূর্ত। গোষ্ঠীর অনির্বাণ আগুন হঠাৎ একেক সময় যেমন লাফিয়ে ওঠে, তেমনি।
উষ্ণ প্রস্রবণের মত উৎক্ষিপ্ত হতে লাগল রক্ত।
দক্ষিণ অভিমুখে বহমান একটি নদীর মত নিৰ্গত হতে লাগল তরুণের অশ্রু।
প্ৰভাতে গোষ্ঠীর সবাই আবিষ্কার করল উভয়ের পায়ের ছাপ। আর কোনো চিহ্ন নেই, অবশিষ্ট নেই, এমনকি কোনো সংকেতও নেই। দলের মধ্যে শুভ্রকেশ যে বৃদ্ধ ছন্দােবদ্ধ ভাব প্রকাশে সক্ষম, তিনি আকাশবিদ্ধ করা একটি গাছের দুধশাদা কাণ্ডে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, মুদিত চোখে, হাত নিবদ্ধ করে একটি গাথা রচনা করলেন। তিনি আমাদের থেকে উন্নীত হলেন। তাঁর দেহ দেবতার মত জ্যোতির্ময়। কুঙ্কুমের টিপ শোভিত চির তরুণ। ব্যাঘ তার বর্তমান রূপ। এসো প্ৰণিপাত করি।
ঢাকায় ফিরে আজহারকে সে গল্পটা বলবে। অনেকদিন আজহার কিছু লেখে না। তার শেষ বইটা খুব খারাপ হয়েছিল। সেদিন টেলিভিশনে একটা নাটক হলো তার, এমন তৃতীয় শ্রেণীর নাটক আর হয়েছে বলে মনে পড়ে না। তবু লোকটা ভাল। লেখার জন্য সর্বক্ষণ আকুলি-বিকুলি করে। লেগে আছে, এইটাই বড় কথা। তাকে গল্পটা বলবে বাবর।
নিজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল সে। কখন যে পোশাক পালটে পাজামা পরে নিয়েছে মনেও পড়ল না তার। গল্পটা তাকে একবারে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এখন ঘোরটা কেটে যেতেই আবার তার সমস্ত ভাবনা, উদ্যম, দৃষ্টি জাহেদার দিকে ধাবিত হলো। এক পা এগিয়ে বালিশের ওপর লুটিয়ে থাকা তার চুলের গুচ্ছ স্পর্শ করল সে। কান পেতে চেষ্টা করল জাহেদার নিঃশ্বাস শুনতে। কিন্তু ভারি কম্বলের ভেতর থেকে কিছুই শোনা গেল না। তখন সে ডান হাত রাখল। জাহেদার নিতম্বের উপর। প্রথমে আলতো করে তারপর ধীরে ধীরে চাপ বাড়াল। কোমল মাংসের মধ্যে বসে গেল তার করতল। কিন্তু কোনো প্ৰতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল না জাহেদার। সে তখন ফিসফিস করে নাম ধরে ডাকল। একবার দুবার। কোনো সাড়া এল না। আবার সে বলল বাতি নেভানোর কথা। শব্দগুলো গুঞ্জন করে উঠে থেমে গেল। তেমনি লম্বমান নিষ্পন্দ হয়ে পড়ে রইল ব্ৰাউন কম্বলের অতলে জাহেদার দেহ। ঘড়ি দেখল বাবর। রাত এখন বারোটা উনিশ। বাইরে থেকে আবে কোনো শব্দ আসছে না। বাতাসের একটানা চুলঝারার মত একটা ক্ষীণ ধ্বনিমাত্র, আর কিছু নয়।
১৪. বাতি নিভিয়ে
হাত ফিরিয়ে আনল বাবর। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে উঠল সে। বাতি নিভিয়ে হাতরে হাতরে জাহেদার খাটের কাছে এসে দাঁড়াল। বসল। বসে রইল। কিছুক্ষণ। তারপর সন্তৰ্পণে লম্বা হয়ে শুল তার পাশে। বাবরের বাবা মারা গেলেন তার তিনদিন আগে এক রাতে ঘুমিয়েছিল সে। হঠাৎ স্বপ্ন কী স্বপ্নের মত বাস্তবে সে দেখতে পেয়েছিল ঘন কালো কাপড়ে টানটান আবৃত এক পুরুষকে। লোকটা তার পাশে এসে বসল। অপেক্ষা করল। তারপর কাৎ হলো। ধীরে ধীরে পা ছড়িয়ে একটা লাশের মত নিজেকে বিস্তৃত করল। অনেকক্ষণ পর একটা পা তুলে দিল বাবরের গায়ে। বাবর তখন কিছু বলছে না। নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। লোকটা এবার তার দিকে পাশ ফিরল। আরো এক যুগ পরে জড়িয়ে ধরল। তাকে একটা কালো আলিঙ্গনে, তখন চিৎকার করে উঠল বাবর। তার অসুস্থ বাবা স্বপ্নটা শুনে পরদিন সকালেই মৌলবী ডেকে তওবা করলেন। মারা গেলেন তিন দিনের দিন।
