জাহেদাকে বাবর বলল, গরম পানি হলেই হাত মুখ ধুয়ে চল কোথাও থেকে খেয়ে আসি। চটপট। তুমি বেরুলে আমিও মুখটা ধুয়ে নেব।
অন্য কিছু ভাববার অবকাশ দিতে চায় না বাবর। ঝড়ের মত কথা বলে চলে। চৌকিদারকৈ আরেকটা তাগিদ দিল গরম পানির জন্যে। একবারও সে জাহেদার দিকে তাকাল না। চৌকিদার বাইরে গেলে বাবর বলল, আমি আসছি। সিগারেট নিয়ে আসি।
বাইরে এসে চৌকিদারকে ধরল সে। বলল, কম্বল একটাই দিও। কেমন? আর একটা আমাদের আছে।
অন্ধকার মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় এলো বাবর। ফুটপাথে অসংখ্য দোকান বসে গেছে। হারিকেন, হ্যাজাক, বিজলী বাতি আর মানুষের কণ্ঠস্বরে গমগম করছে সন্ধ্যাটা। বাবর দুতিন দোকান ঘুরে অবশেষে একটাতে তার সিগারেট পেল। জিগ্যেস করল। এখানে খাবার ভাল রেস্তোরাঁ আছে? নাম ঠিকানা শুনে নিল তার কাছ থেকে। তারপর ধীর পায়ে ফিরে এলো বাংলোয়।
দেখে, জাহেদা ঘরে নেই। ধক করে উঠল তার বুকের ভেতরে। তারপর হেসে ফেলল, জাহেদা তো বাথরুমে। পানির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বসে বসে আরো দুটো সিগারেট শেষ করল সে। সব তার ভেবে ঠিক করা আছে। যেন একটা নাটকে দীর্ঘদিন মহড়া দিয়ে আজ মঞ্চে নেমেছে। পার্ট মনে আছে সব, তবু কেমন যেন একটা উদ্বেগ হচ্ছে থেকে থেকে।
বাথরুম থেকে বেরুল জাহেদা। বেরিয়ে তাকে দেখেই থমকে গেল যেন। তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে গেল আয়নার দিকে। চুল ঠিক করতে লাগল। বাবর জানে এখন কোনো সংলাপ নেই। এখন শুধু মঞ্চে নিঃশব্দে পদচারণা। সে ভেতরে গিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। জাহেদার তোয়ালে দিয়ে ঘষে ঘষে মুছল মুখ, একবার চেপে ধরে সুগন্ধি নিল। আয়নায় নানা রকম মুখভঙ্গি করে মুখের জড়তা ভাঙ্গল। তারপর বেরিয়ে এলো।
জাহেদা শাদা একটা পুলওভার পরে নিয়েছে। আয়নার সামনে তখনো নিজেকে দেখছে সে। নিঃশব্দে। অতি ধীরে। আর চৌকিদার বিছানা করছে। নিজের সুটকেশ থেকে কর্ডের জ্যাকেটটা বের করে গায়ে চড়াতে চড়াতে বাবর বলল, চল, চল।
বলে সে বাইরে এসে দাঁড়াল। জাহেদা যেন একযুগ পরে এলো।
চল, শহরটা ঘুরে আসি। খেয়েও নেব। খুব ক্ষিদে পেয়েছে। সারাদিন গাড়ি চালিয়ে হাত পা ভেঙ্গে আসছে যেন।
কথাটা মিথ্যে। বাবর এখন ছাত্রীসেনার মত সতেজ, প্ৰস্তুত, অস্থির।
কিন্তু ফল হলো। জাহেদা মুখ খুলল।
আবার এখন গাড়ি চালাতে চান?
না। রিকশা নেব।
তখন সিগারেট কিনতে যাবার সময় মাঠে একটা ছোট্ট বাঁধান নালা দেখেছিল বাবর। প্ৰায়
পা পড়ে মাচকাচ্ছিল। আর কী। সেখানে এসেই চটু করে জাহেদার হাত ধরে বলল, সাবধানে।
তারপর হাত ছাড়ল না। গেট পর্যন্ত ঐ ভাবেই হাঁটল। গেটের কাছে এসে জাহেদা নিজেই হাত ছাড়িয়ে নিল। মুখে বলল, এত ভিড়।
এইতো বেচাকেনার সময়।
কথাটা বলেই বাবর বুঝল, আরো একটা অর্থ হয় এর। কে জানে জাহেদা তাই বুঝল কিনা। জাহেদা আর কিছু বলল না। রিকশায় উঠে বসল। ওরা। ঊরুতে ঊরু লাগল। বাবর টের পেল জাহেদা একবার ছাড়াতে চেষ্টা করল সন্তৰ্পণে, কিন্তু পারল না। মনে মনে হাসল বাবর। মুখে বলল, রিকশা, নবাবগঞ্জের দিকে চল।
এর আগে কখনো কোনো মফঃস্বল টাউনে এসেছ?
না। জাহেদা তাকে অবাক করে দিয়ে হাসল। এখন হাসিটা আশা করেনি বাবর। জাহেদ আরো বলল, দেখার মধ্যে ঢাকা আর চাটগাঁ।
তোমার জন্ম কোথায়?
ঢাকায়। আপনার?
বর্ধমানে। আর সেখানে যাওয়া হবে না। এখন আর আপন-পর বুঝি না। যেখানেই যাই সেই আমার দেশ।
সাইকেলের দোকান, কবিরাজি ওষুধের দোকান, বই, মনোহারি জিনিস, কাপড়-চোপড়, ছোট ছোট চায়ের আড্ডা, হা করা অন্ধকার সব গলির মুখ। কোথায় যেন কাঁসর বাজছে। সুম সুম করছে। হ্যাজাকের আলো। হা হা হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। পুরনো পুরনো সব দালানের পলেস্তারা ওঠা থাম চারদিকে। একটা বাদুড় উড়ে গেল। আকাশে অনেকগুলো তারা ঝিকিমিক করছে।
বাবর বলল, এখানে একটা জিনিস লক্ষ করছ। প্রত্যেক দোকানে, রাস্তার মোড়ে আড্ডা হচ্ছে। এখানকার মানুষগুলো বোধ হয় খুব আড্ডাবাজ। মনে হচ্ছে, সারা শহরে আড্ডা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিষয় নেই।
জাহেদার গা থেকে মাঝে মাঝে একটা মিষ্টি গাঢ় ঘ্রাণ দিচ্ছে।
অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়াল ওরা। তারপর সিগারেট কিনে শোনা সেই রেস্তোরাঁ খুঁজে বের করল। বড় রাস্তার ওপর একটা সরু প্যাসেজের মুখ। সেটা দিয়ে ঢুকলে ডান দিকে একটা বড় ঘর। জানোলা দিয়ে চোখে পড়ল নীল চুনকাম করা দেওয়াল। রেডিও বাজছে রংপুর ষ্টেশনে। এককোণে চারজন তরুণ চায়ের কাপ নিয়ে জটলা করছে। তাদের ঢুকতে দেখে হঠাৎ সব চুপ হয়ে গেল। মাথা নামিয়ে নিল সব এক সঙ্গে। তারপর একে একে মাথা তুলে একেবারে সরাসরি তাকিয়ে তাদের দেখতে লাগল।
মজা লাগল বাবরের। বলল, ভাগ্যিস এরা টিভি দেখতে পায় না এখানে। এর জন্যে ঢাকায় কোথাও বসতে পারি না।
আসবার সময় আরিচা ফেরিতে কয়েকজন আপনাকে চিনেছিল।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, আপনার নাম বলছিল।
খেয়াল করিনি। কী খাবে? কিছুই নেই। মফঃস্বল তো কিছু পাবে না। বিরিয়ানি খাও। এ ছাড়া–
যা আপনার খুশি বলুন। আমার একেবারে ক্ষিদে নেই।
আসলে এখন দরকার ছিল গরম সুপ। তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
হ্যাঁ। ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ।
চল, খেয়েই বাংলোয় যাব।
খেতে খেতে হঠাৎ জাহেদা একবার বলল, শারমিন আর পাপ্পু খুব আরাম করে বিছানায় শুয়ে আছে।
তোমার রুমমেট?
হ্যাঁ, ওরা কি স্বপ্নেও জানে আমি এখন এখানে?
