সে-কী!
হ্যাঁ।
লোকটা বোধহয় ওকে ভালবেসেছিল।
সে তোমরা বলতে পারবে; তারপর শোন। আগে নামি।
বাবর জাহেদার হাত ধরে গাড়িতে নিয়ে এলো। গাড়ি যতক্ষণ না ফেরি থেকে রাস্তায় এলো ততক্ষণ কোনো কথা বলল না। তারপর সড়কে পড়তেই গতি বাড়িয়ে বলতে শুরু করল সে, একদিন রাজা বলল, রাণী, আজকাল তুমি আর সোনা বানাও না যে। তখন মেয়েটি বলর, সোনা তো আমি বানাতাম না, বানাত একটা দেড় হাতি লোক। বলে সব ঘটনা রাজাকে জানাল সে। রাজা তো রেগে কাঁই। রাণীর মুঠি ধরে জিগ্যেস করল, তার মানে তুমি বলতে চাও একটা অজানা অচেনা লোকের সঙ্গে পরপর তিন রাত তুমি কাটিয়েছ। তোমার ছেলেকে এক বছর পরে এসে সে চেয়েছে। তারপরও তুমি বলতে চাও এ ছেলে তার নয়, আমার? আমাকে বুদ্ধ, গাধা, গোবর-গণেশ পেয়েছ?
ওমা, সে-কী কথা।
মহারাণী, এই হচ্ছে রূপকথা। বল তো ছেলেটা আসলে কার?
কী যে বলেন।
বল না? তিন রাত লোকটা মেয়েটার ঘরে এসেছে। কিছু হয়নি? শুধু হার আংটি নিয়েই খুশি থেকেছে সে?
দেখুন, দেখুন, সামনে একটা কত বড় পুল। জাহেদা অন্য কথা বলল। তোমার কী মনে হয়ে বল না?
এর পরে তো আরিচা?
হ্যা; আমার কী মনে হয় জান, রাজা আসলে অতটা গৰ্ধভ নয়। ও ছেলেটা ঐ ব্যাটা দেড় আংলারই।
জাহেদা মনোযোগের সঙ্গে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগল। বাবর মনে মনে বলল, তুমিও আমার সঙ্গে তিন দিনের জন্যেই যাচ্ছ। কল্পনায় সে স্পষ্ট দেখতে পেল নিজেকে–জাহেদার ওপর শুয়ে দম বন্ধ করা চুমোয় বেঁধে রেখেছে তাকে। মুখের ভিতরটা সরসর করে উঠল। বাবরের। মাথার ভেতরে কেমন একটা ঝিম সৃষ্টি হল যেন। ঠোঁটে একটা অর্থহীন হাসি। সে গাড়ি চালাতে লাগল।
ছোট্ট একটা হাই তুলল জাহেদা। বাবর ভাবল, এরপর বোধহয় কিছু বলবে। কিন্তু বলল না। মাইলের পর মাইল পার হয়ে যেতে লাগল। অনেকক্ষণ পর বাবর বলল, কিছু বলছি না।
এমনি।
তবু কিছু বল।
কী বলব?
কেন, নিজের কথা।
আমার কোনো কথা নেই। বলেই একটুখানি হাসল জাহেদা।
হাসছ যে।
আপনার কথা শুনে মনে পড়ল, ইস্কুলে রচনা লিখতে দিত, একটি পয়সার আত্মজীবনী, একটি ছাতার আত্মজীবনী, একটি পেন্সিলের আত্মজীবনী–এইসব।
সেই রকম করেই না হয় বল। আমি একজন মেয়ে। আমার একটি নাক, দুইটি কান ও দুইটি চোখ আছে। চোখ দিয়ে আমি দেখিয়া থাকি। কান দিয়া শ্রবণ করি।
চাপা হাসিতে প্ৰায় উপুড় হয়ে পড়ল জাহেদা। তার পিঠে আলতো একটা চাপড় দিয়ে বাবর বলল, খারাপ বলেছি?
বাবর জানে এইভাবে এগুতে হয়। এখন একটি চাপড় দিলেও জাহেদা কিছু মনে করবে: না। সত্যি জাহেদা সেটা লক্ষও করল না। হাসতে হাসতে মাথা তুলে বলল, আপনার সঙ্গে কথায় পারা মুশকিল। সত্যি আমার কিছু বলার নেই।
ভুল। সবারই বলার কথা আছে। তুমি আমাকে বলতে চাও না।
বিশ্বাস করুন।
হ্যাঁ, তোমাকে আমি বিশ্বাস করি।
বিশ্বাস না কচু। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করল বাবরের। দু পয়সা দাম দিই না। আমি যা চাই তা এমনি তোমার পাজামা ছিঁড়ে ভেতরে যেতে। কী ক্লান্তিকর এই অভিনয়, এই সহাস্য মুখ তৈরি করা, এই কথার মালা গাঁথা। আমি যদি হঠাৎ এখন তোমাকে জড়িয়ে ধরে মুখে রুমাল গুঁজে ধর্ষণ করি? কে বাধা দেবে?
কিন্তু সে হাসল। এবং আরেক বার বলল, তোমাকে বিশ্বাস করি। কণ্ঠ যথাসম্ভব ভিজিয়ে নির্বিকার চিত্তে সে দ্বিতীয় মিথ্যে যোগ করল, আমি চাই তুমি আমাকেও বিশ্বাস কর। কর না?
করি।
আমি কৃতাৰ্থ।
কী যে বলেন।
জান, এর আগে, আর কোনদিন, কেউ, কখনো আমাকে এতটা বিশ্বাস করেনি। নইলে তুমি আসতে না। এই বাস্তবটা স্বপ্ন হয়ে থাকত। প্রিয়জনের সঙ্গে বাস্তবও স্বপ্ন হয়ে যায়, যেমন এখন হয়েছে। বাংলাটা তুমি বুঝতে পারছ?
হ্যাঁ।
তুমি খুব অল্প দিনে শিখতে পারবে। আমি নিজে তোমাকে শেখাব।
বাবর প্রসঙ্গ বদলালো ইচ্ছে করে। জাহেদাকে সে ভাববার অবকাশ দিতে চায় না। একমুখী একটা ঝড়ের মত তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়, সেখানে–যেখানে সে নিজেকে দেখছে। জাহেদার সঙ্গে শুয়ে আছে। সদ্য জাত দুটি শিশুর মত।
আর কোনো কথা বলল না কেউ। ওরা আরিচায় এলো। শুনল ফেরি আসতে এখনো এক ঘণ্টা দেরি।
কিছু খাবে জাহেদা? এখানে কি পাওয়া যায়?
আমার সঙ্গে স্যাণ্ডউইচ আছে। এখান থেকে মিষ্টি খেতে পার। চমচম খাবে? ছেলেবেলায় আমি খুব পছন্দ করতাম। খাও না?
জাহেদা মাত্র আধখানা চমচম খেল।
খাও, একটা খেলে এমন কিছু মোটা হয়ে যাবে না।
আপনি কী মনে করেন? সব সময় ফিগারের কথাটা চিন্তা করি?
বকুনি খাওয়া শিশুর মত কাচুমাচু হলো বাবর। দেখে হেসে ফেলল জাহেদা। বলল, আচ্ছা, বলছেন যখন। যা মিষ্টি। এই জন্যে খেতে চাচ্ছিলাম না।
চা খেয়ে নদীর পার দিয়ে হাঁটতে লাগল ওরা। কত অসংখ্য নৌকো। ছোট, বড়, ছৈওলা, মহাজনি, ডিঙ্গি, শালতি কোষা, ছিপ। একটা নৌকা ভারি চোখে ধরল। বাবরের। ঝকঝকে ছৈ, গলুইয়ে গাঢ় কমলা রঙের সারি সারি ত্রিভুজ আঁকা, তিমি মাছের লেজের মত সর সর করে পানি কাটছে গাব দিয়ে মাজা হাল। ভেতর থেকে নীল শাড়ি পরা একটা বৌ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে চলমান পাড়ের দিকে।
হঠাৎ যেন বাবর দেখতে পেল এই রকম একটা নৌকোয় জাহেদাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে সে। নিচে কুলকুল করছে পানি। টিপটিপ করছে জাহেদার বুক। তার দুপায়ের ভেতর স্বপ্ন গুঁজে বিভোর হয়ে শুয়ে আছে সে। বাবর অস্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করল, তোমাকে একবার নৌকোয় চাই।
