কিছু বললেন?
নাতো। হেসে ফেলল বাবর। নৌকোটা ভারি সুন্দর। বৌ বোধহয় বাপের বাড়ি যাচ্ছে।
কী করে বুঝলেন?
শ্বশুর বাড়ি হলে অমন চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকত না।
অবাক হয়ে গেল জাহেদা? বলল, সত্যি, এত কথাও আপনার মাথায় ঢোকে। এই রকম একটা ধাঁধা ছিল না আপনার টিভিতে।
ছিল। বাহ তোমার মনে আছে তো?
হোস্টেলে আমাদের সেট আছে যে। খাবার পর এক ঘণ্টা দেখতে দেয়।
বাবর অন্যমনস্কভাবে হাসল। এখনো তার চোখে নৌকোর স্বপ্নটা ভাসছে। নৌকোয় সে কখনো কোনো মেয়েকে নিয়ে যায়নি। কথাটা মনেই হয়নি তার। এবারে মনে রাখবে। একদিন জাহেদাকে নিয়ে যাবে সে।
বাবর বলল, চল, ওদিকে যাই। মাছ বিক্রি হচ্ছে। দেখবে।
হাঁটতে হাঁটতে বাঁ দিকে চলে গেল তারা যেখানে জেলেরা বড় বড় রুই অবলীলাক্রমে দুহাতে তুলছে, দাম বলছে, মাথা নাড়ছে, আবার মাছটা রেখে দিচ্ছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখল ওরা।
একটা মাছ নেবে?
নিয়ে কী হবে? জাহেদা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।
এমনি দেখতে কত ভাল লাগছে।
চলুন, চলুন। যা ভাল লাগে। তাই কিনতে হয় বুঝি। কী সাংঘাতিক লোক আপনি। চলুন তো।
জাহেদা প্রায় টেনে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে আনল! দূরে দেখা ফেরি জাহাজটা ধীরে ধীরে আসছে। সাদার রংটা প্ৰায় মিশে গেছে নদীর রূপালি পানির সঙ্গে। স্মৃতি বিস্মৃতির মাঝখানে ভাসমান একটা স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে।
বাবর বলল, ঐ আমাদের ফেরি।
কই?
আরে ঐ তো।
কই, দেখছি নাতো।
এইখানে দ্যাখ। বাবর ডান হাত তুলে বাঁ হাতে জাহেদার মাথাটা ঘুরিয়ে জাহাজের দিকে করে দিল। এবার দেখতে পাচ্ছে?
হ্যাঁ।
বাবর হাতটা সরিয়ে নিল ওর মাথা থেকে। চুলগুলো অদ্ভুত খসখসে। বোধহয় ঘন করে স্প্রে ছড়ায় জাহেদা। কেমন আঠাল আর ভারি।
বাবর বলল, চুলে এত স্পে দাও কেন?
জাহেদা বাবরের চোখের দিকে তাকাল হঠাৎ।
এতটা দিও না। এত সুন্দর চুল, নষ্ট হয়ে যাবে!
আপনি কী জানেন? প্রে না দিলে চুল বানানো যায়?
বানানো মানে?
তাও জানেন না। চুড়ো ফুলে থাকবে কী করে? চুর হবে কী করে?
জাহেদা যেন ভারি মজা পেয়েছে, খিলখিল করে হেসে উঠল।
বাবর গম্ভীর হবার অভিনয় করে বলল, ও, জানতাম না। শিখলাম।
থাক, মেয়েদের এসব শিখতে হবে না।
কোনো কথাই ফেলা যায় না। কখন কোনটা কাজে লাগে।
টিভিতে ধাঁধা দেবেন না কি? বাবর একটু আহতই হলো। তার কি আর কোনো ক্ষেত্র নেই ধাঁধা ছাড়া? সবাই তাকে ঐ একটা ছকে ফেলে দেখে কেন। আবার হঠাৎ মাথার ভেতরে বাঘটা লাফিয়ে উঠল তার। ইচ্ছে করল, নিষ্ঠুর একটা চুমোয় সবটা রক্ত শুষে নেয় জাহেদার, তার পেছনে প্রচণ্ড একটা চাপড় দেয় যেন হাতের পাঁচটা আঙুল নীল হয়ে বসে থাকে।
বাবর স্পষ্ট দেখতে পেল চোখের সমুখে, আকাশ জোড়া, ঈষৎ রক্তাভ একটি নিতম্ব, তাতে পঞ্চনদের মত আঙুলের পাঁচটি নীল দাগ।
হাঁটতে হাঁটতে বাবর বলল, জানি, ছেলেবেলায় স্বপ্ন দেখতাম বড় কবি হবো।
হলেন না কেন?
কবি কি হওয়া যায়?
ইচ্ছে থাকলেই হওয়া যায়। আপনি হতে পারতেন।
পারতাম?
হ্যাঁ। আমার বিশ্বাস আপনি হতে পারতেন।
কিন্তু হইনি। ক্লাশ এইটে যখন পড়তাম তখন শেফালি ফুল নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিলাম; আর একটা লিখেছিলাম কলেজে থাকতে, তাজমহলের উপর। প্ৰেম সম্পর্কে খুব বড় বড় কথা ছিল ওতে। এখন হাসি পায়।
কেন?
কী, কেন?
হাসি পায় কেন?
হাসি পায়, প্রেম তখন সাংঘাতিক একটা কিছু বলে মনে হতো, তাই।
জাহেদা হঠাৎ আনমনা হয়ে গেল! এক পলক কোথায় যেন অন্তর্হিত হলো মেয়েটা। বাবর কথাটাকে ঘুরিয়ে দেবার জন্যে বলল, চল, আরেকটু চা খাইগে। গাড়ির কাছে এসে বলল, তুমি গাড়িতে বসে খাও। আমি টিকিটটা করে আনি।
ফিরে এসে দেখে, জাহেদা দুহাতে চিবুক রেখে চুপ করে বসে আছে। আর তার কাছে হাত
পাখা বিক্রি করবার চেষ্টা করছে একটা বুড়ো লোক। বাবরকে দেখে লোকটা এগিয়ে এসে কয়েকটা পাখা পাড়িয়ে দিল।
শীতকালে হাতপাখা দিয়ে কী হবেরে বাবা?
নিয়া যান, কত কামে লাগে, আমাগো সাহায্য হয়।
আচ্ছা, দাও একটা।
জাহেদাকে দিয়ে বলল, কেমন, সুন্দর না?
হুঁ!
ও-রকম করে আছ যে? চা খেয়েছ?
হ্যাঁ। আপনি খান।
দাও।
জাহেদা সন্তৰ্পণে চা ঢেলে দিল বাবরকে। জাফরান রং করা নখগুলো ঘিরে ধরল প্লাস্টিকের পেয়ালাটা। পরশু যে রংটা লাগিয়েছিল আজও সেটা আছে। পাঁচটা সযত্ন ফোঁটার মত দেখাচ্ছে কোনো নববধূর কপোলে! বাবরের ইচ্ছে করল। ছয়ে দেখে। বাবর সেই ভবিষ্যতকে দেখতে পেল, যখন কম্পিত আঙুলের ডগায় অন্ধকারে তার পিঠে এসে বসবে ঐ জাফরান ফোঁটাগুলো। বাবর তার ট্রাউজারের ভেতরে বাসনার সঞ্চরণ এবং উথান অনুভব করতে পারল। দগ্ধ হতে লাগল। উত্তাপে। কিন্তু এ উত্তাপ পোড়ায় না, পরিণামে ছাই করে না, নিরবধি শুধু বিকীর্ণ হতে থাকে এবং কিছু করা যায় না।
অসহ্য এই অভিনয়। এই ছলাকলা। এই শোভন সদালাপ। তার চেয়ে যদি এমন হতো, স্পষ্ট বলা যেত। আর সে শুনত।
দাঁতে দাঁত ঘষল বাবর।
জাহেদা এই প্রথম জিগ্যেস করল, চুপ করে আছেন যে!
কই, না।
হেসে ফেলল বাবর। সুন্দর করে হাসল। তার সেই বিখ্যাত রমণীমোহন হাসিটাকে বের করে দেখাল সে। আর মনে মনে বলল, খেলারাম খেলে যা।
১২. আরিচার পর বাঘাবাড়ি
আরিচার পর বাঘাবাড়ি। শেষ ফেরি এটাই। তারপর সোজা একটানা রংপুর। বাঘাবাড়িতে এসে রেস্ট হাউস দেখে জাহেদা বলল, একটু দাঁড়ান।
তার ছোট্ট সুটকেশটা নিয়ে জাহেদা ভেতরে চলে গেল।
