আপনার টিপ্পনি রাখুন।
আরে, টিপ্পনি না কাটলে তো এটা বাচ্চাদের গল্প হয়ে যাবে। তুমি আর বাচ্চা নও।
গল্প বলুন।
বলছি।
বাবর একটা ট্রাক পেরিয়ে নিশ্চিন্তে গাড়ি চালাতে চালাতে বলতে লাগল, সারারাত সেই খড়ের গাদার ওপর বসে হোত পা ছড়িয়ে কাঁদল মেয়েটা। সে তো আর সত্যি সোনা বানাতে জানে না। এখন কে তাকে উদ্ধার করবে। এই বিপদ থেকে? এমন সময়ে ঘরের মধ্যে টুক করে লাফিয়ে পড়ল দেড়হাত লম্বা একটা মানুষ। লোকটা সব শুনে টুনে বলল, ঠিক আছে এই খড় সব সোনা বানিয়ে দিচ্ছি, বদলে তুমি আমাকে কী দেবে? চাষীর মেয়ে বলল, আমার গলার এই হারটা দেব। লোকটা সোনা বানিয়ে হারটা নিয়ে চলে গেল। পরের দিন রাজা তাকে আরো একটা বড় ঘরে আরো বেশি খড় দিয়ে বলল, এগুলোও সোনা বানিয়ে দাও। মেয়েটা সারারাত কাঁদল, আবার সেই দেড় হাত মানুষটা এলো। মেয়েটা এবার তাকে হাতের আংটিটা খুলে দিল। পরদিন ঘর ভর্তি সোনা দেখে রাজা মহাখুশি। আরেকটা ঘর ভর্তি খড়কে যদি তুমি সোনা বানিয়ে দিতে পার তাহলে তোমাকে আমি আমার রাণী বানাব, আর যদি না পার তাহলে গর্দান যাবে। রূপকথার শাস্তি শুরুই হয় গর্দান নেয়া থেকে। তাই না?
জাহেদা হাসল। ভাগ্যিস তখন জন্মাইনি।
বাবর বলে চলল, সেদিন রাতেও মেয়েটা কাঁদতে বসল। এলো সেই দেড় হাতি মানুষটা। তাকে বলল সব।
তারার ঘাটে ফেরি পাওয়া গেল না। ফেরি তখন ওপারে। জাহেদা জিগ্যেস করল, কতক্ষণ লাগবে?
এই এক্ষুণি এসে যাবে। তারপর শোন, লোকটা বলল আমি সব সোনা করে দিচ্ছি। কিন্তু আজ তুমি আমাকে কী দেবে? মেয়েটা বলল, আর যে কিছু নেই আমার।
জাহেদা বলল, চাষীর মেয়ে হার আর আংটিই বা পেয়েছিল কোত্থেকে?
রূপকথার চাষীর মেয়েদের ওরকম থাকে। এবার কিন্তু তুমি টিপ্পনি কাটছ।
সঙ্গদোষে।
হেসে উঠল বাবর। বলল লোকটা তখন একটা জিনিস চাইল।
কী?
না, তাকে নয়।
যাহ।
সে চাইল, তুমি যখন রাণী হবে, তারপর যখন ছেলে হবে, সেই ছেলে দিতে হবে। রাজি হয়ে গেল মেয়েটা। ভেবে দেখ, জ্বলজ্যান্ত নিজের ছেলেকে দিতে রাজি হয়ে গেল সে। একেই বলে স্ত্রী বুদ্ধি।
কী বললেন?
কিছু না। তারপর মেয়েটার তো বিয়ে হলো? এক বছর গেল। সত্যি একটা ছেলে হল মেয়েটার। একদিন দোলনায় তাকে ঘুম পাড়াচ্ছে এমন সময় সেই দেড় হাতি লোকটা এসে হাজির। বলে, ছেলে দাও।
তারপর? মেয়েটি কেঁদে বলল, তোমাকে টাকা পয়সা হীরে জহরৎ যা চাও তাই দেব, তুমি শুধু আমার ছেলেকে নিও না। কী বুদ্ধি! যে লোকটা খড়কে সোনা বানাতে পারে তাকে কি-না সে সাধছে টাকা পয়সা।
গল্পে ওরকম হয়। তারপর?
লোকটা তার কান্না শুনে একটু নরম হলো। বলল, ঠিক আছে, তোমার ছেলে নেব না এক শর্তে, যদি তুমি আমার নাম বলতে পার। তিন বারের মধ্যে বলতে হবে। বলতে না পারলে ছেলে চাই। মেয়েটি বলল। আচ্ছা। তারপর সে চারদিকে চর পাঠাল–দেড় হাত একটা লোক, যাদু জানে, তার নাম কেউ বলতে পারে? সাত দিন সাত রাত পরে চর এসে জানাল, হ্যাঁ মহারাণী নাম জানা গেছে।
কী নাম? জাহেদা জিগ্যেস করল।
বাবর বলল, ফেরি এসে গেছে। আগে ফেরিতে উঠেনি।
ফেরিতে উঠে গাড়ি থেকে বেরুল ওরা। ফেরির পেছন দিকে একটা রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল বাবর। তার পাশে জাহেদা। জাহেদার কালো ছায়া পড়েছে পানিতে। ঢেউয়ের দুষ্টুমিতে ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাচ্ছে। বাবর একটু সামনে ঝুঁকিল। এবার তার ছায়াটা স্পর্শ করল। জাহেদার ছায়া। প্রীতি চোখে তাকিয়ে রইল সেদিকে বাবর। তারপর চোখ ফিরিয়ে দেখতে পেল বাতাসে পাজামা কামিজ সেঁটে গেছে জাহেদার ঊরুতে। একটা গভীর Y-এর সৃষ্টি হয়েছে। নিটোল দুটি ঊরু, স্বাস্থ্যে ফেটে পড়ছে যেন। মনে মনে বাবর সেখানে মুখ রাখল। বেড়ালের মত ঘষল খানিক।
জাহেদা বলল, গল্পটা কী হলো?
তখন চমক ভাঙ্গল বাবরের। সে জাহেদার দিকে তাকিয়ে হাসল!
ওপারে গিয়ে বলব। এখন একটু নদী দেখি।
জাহেদা নদীর দিকে তাকিয়েই দেখতে পেল তার ছায়া বাবরের ছায়া ছোঁয়াছোঁয়ি হয়ে আছে। তারপর আকাশের দিকে চোখ রাখল। চিবুকের তলায় লাল কয়েকটা সূক্ষ্ম শিরা তখন দেখতে পেল বাবর। রোদুরে যেন স্বচ্ছ হয়ে গেছে তার গ্রীবা। একটু নিরিখ করলে যেন ভেতরে সব কিছু দেখা যাবে।
চুল উড়ছিল খুব। জাহেদা গাড়ির ভেতর থেকে একটা রুমাল নিযে এলো। মুঠি করে বাঁধল চুলগুলো। টানটান হয়ে চুল বিছিয়ে রইল কপালের দুপাশে; তখন নতুন মনে হলো জাহেদাকে। একেবারে অন্য চেহারা।
বান্দর বলল কালো কামিজে তোমাকে মানায়নি।
খুব মানিয়েছে।
সকালে ভালই লাগছিল। এখন ততটা না। তোমাকে নীলটা মানায়।
আছে সুটকেশে।
তাই নাকি? পরশু তো চিনতেই পারলে না যখন বললাম।
হোস্টেলে গিয়ে খুঁজে বের করেছি।
তোমাদের হোস্টেল সুপার কিছু সন্দেহ করেনি তো?
কেন?
যদি ধরা পড়তে।
বাবা আমাকে আস্ত রাখত না।
ধর, আমি যদি তোমাকে চুরি করি।
ইস, আমাকে চুরি করা সোজা নয় সাহেব।
চলে এলে বিশ্বাস করে?
এসেছি তো?
মুখে বলল বটে কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখে জাহেদা নতুন করে বাবরের দিকে তাকাল। আবিষ্কার করতে চেষ্টা করল কিছু। বাবর তখন হেসে বলল, গল্পটা শোন। আটদিনের দিন সেই দেড়হাতি লোকটা এসে হাজির। বল, আমার নাম বল। তিন বারের মধ্যে বলতে হবে। মেয়েটি জানে তার নাম, তবু স্বভাব তো, মেয়েলিপনা করে বলল, তোমার নাম গিরিশৃঙ্গ। উহুঁ হলো না। তাহলে, উদ্ভটবর্তুল? না তাও নয়। তোমার নাম দেড় আংলা। তখন লোকটা বলল, হাঁ হয়েছে কিন্তু ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তার, সে দাঁড়াম করে পড়ে মরে গেল।
