বুঝি তো। আপনি বাংলাতেই বলবেন। জাহেদা এই প্রথম বাংলায় বলল আজ সকালে।
বলতে পারি। কিন্তু সব কথা, বাংলা সব কথা তুমি ঠিক বুঝতে পারবে না বলে ভয় হয়। কথার একটা অর্থ, সাধারণ অর্থ, সেটা বোঝা যায়, আরেকটা অর্থ দেশের সঙ্গে, মাটির সঙ্গে, বাতাসের সঙ্গে, মানুষের মনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। রক্তের মধ্যে থাকে সেই অর্থটা। সেটা বুঝতে হলে তোমাকে ছেলেবেলা থেকে বাংলা পড়তে হতো। এই যেমন ধর–শ্রাবণ। শ্রাবণ কী জান?
জাহেদা হেসে বলল, জানব না কেন? শ্রাবণ একটা বাংলা মাসের নাম।
শুধু তাই নয়। যদি বাংলা কবিতা পড়তে, বাংলা গান শুনতে, যদি বাংলা তোমার স্মৃতির মধ্যে থাকত তাহলে শ্রাবণ কথাটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে একটা স্বপ্নের জগৎ খুলে যেত। তোমার চোখে। একটা গম্ভীর গান শুনতে পেতে। একটা আকুলতায় তোমার মন হু হু করে উঠত।
আপনি আমাকে শেখাবেন?
কেন শেখাব না? তোমার জন্য আমি সব করতে পারি।
জাহেদা হঠাৎ জিগ্যেস করল, আর কােটা ফেরি আছে?
এরপর একটা। তারপর বড় ফেরি আরিচা থেকে নগরবাড়ি। তারপর আর একটাই মোটে।
আরো তিনটে! জাহেদা মুখ গোল করে বলল।
ওপারে এসে গাড়িতে ঠিকঠাক হয়ে বসে বাবর বলল, তুমি কিছু বল, আমি শুনি। আমি কী বলব?
বলার কথা কত আছে। তোমার কথা বল।
আমার কোনো কথা নেই।
তবু।
ভাবছি, একটা কথা ভাবছিলাম।
কী কথা।
আমি, আমি এখানে কী করছি?
আমার সঙ্গে আছ। কথা বলছ। আমি গাড়ি চালাচ্ছি। আমরা এখন মানিকগঞ্জে আছি। এই।
আমার বিশ্বাস হয় না। মনে হয় কোথায় যেন আছি, জানি না।
বাবর বলল, তুমি আছ অতীত ভবিষ্যতের মাঝখানে, আগেও যেখানে ছিলে, পরেও সেখানে থাকবে।
বাবর শুধু বলল না-কথাটা তার নিজের নয়। নীরবে সে দেখতে লাগল দূরে দ্রুত কাছে আসা বাড়ি, গ্রাম, মানুষ, নৌকো, মুদি দোকান আসছে, সরে যাচ্ছে, আবার সরে যাচ্ছে। এক আধটা বাস ট্রাক সরাৎ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। চকিত ঝড় তুলে।
বাবর বলল কিছু বল।
জাহেদ চুপ করে রইল।
বাবর তখন বলল, গল্প শুনবে?
কী গল্প? আপনার?
আমি কি গল্প লিখি নাকি? এই এদিকে যা পড়েছি। একটা মজার গল্প বলি কেমন? একটা চুটকি। এক লন্ড্রীর দোকান। লন্ড্রীওয়ালা ছোকরা মানুষ। মেয়েদের দিকে ভারি চোখ তার। বসে আছে কাউন্টারে। এমন সময় এক তরুণী এলো খুট খুট করে। পরনে তার মিনিস্কার্ট। মিনি তো মিনি-যাকে বলে মিনি, কোমরের তলায় এসেই শেষ। ছোঁকরা হা করে তাকিয়ে আছে দেখে তরুণী বলল, ভারি বেয়াদব তো আপনি। ছোঁকরা একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে উত্তর দিল, বেয়াদব নয় ম্যাডাম। ভাবছিলাম। আমাদের লন্ড্রীতে কাপড় ধুলে তো এত খেপে যাবার কথা নয়। বোধহয় পাশের লন্ড্রী থেকে ধুয়েছিলেন?
হা হা করে হেসে উঠল বাবর।
জাহেদা বলল, যাঃ। এটা আবার গল্প নাকি?
আচ্ছা আরেকটা শোন। এক পাগল। রাস্তায় এক দেয়ালে কান লাগিয়ে কী যেন শুনছে। দূর থেকে গোফওয়ালা এক পুলিশ দেখে ভাবল ব্যাপারটা কী? ব্যাটা আধা ঘণ্টা ধরে কান লাগিয়ে শুনছেটা কী? সেও এসে পাগলের পাশে কান লাগিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু কিছু শুনতে পেল না। অনেকক্ষণ কান লাগিয়ে রাখল, তবু কিছু শোনা গেল না। তখন মহা খাপ্পা হয়ে পুলিশটা বলল, এই ব্যাটা, এখানে তো কিছু শোনা যাচ্ছে না। পাগল তার জবাবে একগাল হেসে বলল, জি, আমিও কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।
জাহেদা খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, যা এ রকম হয় নাকি?
আরো শুনবে।
জাহেদা হাসতে হাসতে আরেকটা চুয়িংগাম বের করে মুখে পুরল। তার গোলাপি জিভ টুকু বেরিয়েই ভেতরে চলে গেল। মুগ্ধ হয়ে গেল বাবর। বলল, আরেকটা খাও।
এক সঙ্গে কটা খাব?
ঠিক বলেছ।
কথাটাতে বেশ একটু ওজন আরোপ করল বাবর। জাহেদা লক্ষ করে রাঙ্গা হয়ে গেল যেন।
বাবর জানে এখন কথা বলতে নেই। সে নীরবে গাড়ি চালাতে লাগল। মানিকগঞ্জের সাইনবোর্ড তাদের অভ্যর্থনা জানাল এবং কিছু পরে বিদায়।
জাহেদা বলল, কই, আরেকটা গল্প বলবেন যে!
ভাবছি, কোনটা বলব?
খুব সুন্দর দেখে একটা।
আচ্ছা
বাবর সত্যি মনে করতে পারছিল না কোন গল্প। মনের মধ্যে হাতড়াতে লাগল সে। একটা সিগারেট ধরাল। তারপর হঠাৎ একটা মনে পড়ে গেল। এই গল্পটা একটু বড়। হাসির নয় কিন্তু। আবার হাসিরও।
তা হোক।
এক দেশে ছিল এক চাষী। তার ছিল এক মেয়ে।
এতে রূপকথা।
কেন, খুব বয়স হয়ে গেছে নাকি তোমার?
হয়েছেই তো।
তোমার মা রূপকথা বলতো?
না বাবা বলতেন, বাংলাতে শুনলে নাকি আমার ইংরেজি খারাপ হয়ে যাবে।
শোননি রূপকথা?
কনভেন্টে কত শুনেছি। সিন্ডারেলা, আলাদিন এন্ড ওয়ান্ডার ল্যাম্প, সেভেন ডোয়াফর্স।
আজ একটা শোন। একটা শুনলে বুঝবে বড়দের জন্যেও রূপকথা হয়। জাহেদা নড়েচড়ে গ্যাঁট হয়ে বসল, যেন বসার ভঙ্গিতে প্ৰমাণ করতে চেষ্টা করল, সে খুঁকি নয়, রীতিমত মহিলা।
বাবর বলতে শুরু করল এক দেশে ছিল এক চাষী, তার ছিল এক মেয়ে। একদিন সে রাজাকে বলল, তার মেয়ে খড় থেকে সোনা বানাতে পারে। বুঝে দেখ, যেন রাজার সঙ্গে তার রোজই দেখা হচ্ছে, এমনি একটা ভাব।
রূপকথায় ওরকম হয়।
শুধু তাই নয়, চাষীর কথাটাও মিথ্যে। বাহাদুরি দেখাবার জন্যে রাজাকে বলেছে তার মেয়ে সোনা বানাতে পারে। মেয়েকে খুব ভালবাসত কিনা? এখন বিপদ দ্যাখ, রাজা চাষীর মেয়েকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে বলল, এখানে এক গাদা খড় রইল, যদি কাল ভোরের মধ্যে সব সোনা বানিয়ে দিতে না পার, তাহলে গর্দান যাবে। এই বলে রাজা চলে গেলেন তার প্রাসাদে। কী রকম গর্দভ দেখ রাজা ভদ্রলোকটি। প্রথম কথা একবারও তার মনে হলো না, এই মেয়ে যদি সোনাই বানাতে পারবে তা হলে তার বাপের এত গরীবী হাল কেন? দুই নম্বর, আমি রাজা হলে তো সেই ঘরে গদীনসীন হয়ে বসে দেখতাম কেমন করে খড়কে সোনা বানায়। রূপকথার রাজাদের কোনো কৌতূহল নেই।
