তখন নাশতা খেলে না?
খেয়েছি তো।
পাপ্পু কী পড়ে?
আমার সাথে।
শরমিন?
আমার এক ক্লাশ ওপরে।
আচ্ছা, ইকনমিক্স তোমার শক্ত লাগে না।
জাহেদা জবাবে একটু হাসল।
বাবর বলল ইকনমিক্স খুব ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট। ওটা সবার পড়া দরকার। মানুষের যা কিছু কাজ, যা কিছু সে বিশ্বাস করে, যা কিছু তার অর্জন, উপলব্ধি-তার পিছনে ইকনমিক্স যে কীভাবে কাজ করে তা তোমাকে বললে অবাক হয়ে যাবে।
জাহেদ হাসল আবার। কিন্তু কোনো কথা বলল না।
বাবর বলল, চুয়িংগাম খাবে? এই নাও।
ড্যাশবোর্ড থেকে বার করে দিল বাবর। বার করতে গিয়ে কাঁধ ছোঁয়াছুয়ি হয়ে গেল। জাহেদা তার বায়ে সরে গেল অনেকখানি।
বাবর একটু হাসল।
খাও, খুব ভাল গাম।
এখন থাক।
সাভার ডেইরী ফার্ম পার হয়ে গেল তারা।
বাবর বলল এরপরে ছোট্ট একটা শালবন আছে। খুব সুন্দর।
কিছুক্ষণ পর শালবনের ভেতর এসে পড়ল তারা; দুধারে সারি সারি গাছ। পথটা একটু উঁচু হয়ে গেছে। লালমাটি। এই একটা নিচু জলা এলো। এই আবার শালবন। একঝাক পাখি ভারি মাতামাতি করছে।
বাবর জিজ্ঞেস করল, ভাল না?
হুঁ।
একদিন তোমাকে রাজেন্দ্রপুর নিয়ে যাব।
জাহেদা চুয়িংগাম মুখ থেকে বের করে সযত্নে কাগজে মোড়াতে লাগল; একটা বল বানাল ছোট্ট। তারপর জানোলা দিয়ে ছুঁড়ে দিল। চুপচাপ গাড়ি চালাতে লাগল বাবর।
দূরে হাতের ডাইনে, ঘোড়াপীরের মাজার।
বাবর বলল, এখানে একটা মাজার আছে জান? একটা বুড়ো বটগাছ আছে। তার ডালে অসংখ্য সব লাল কাপড়ের টুকরো বাধা।
কেন?
যাদের ছেলে হয় না, তারা মানত করে, কাপড় বেঁধে দিয়ে যায়। হাজার হাজার। সবুজ পাতা আর লাল কাপড়ের টুকরোয় ভারি সুন্দর লাগে। ছবির মত। আমাদের যে কত অন্ধ বিশ্বাস, কত কুসংস্কার। একদিন নিয়ে যাব তোমাকে।
জাহেদা মুখ নিচু করল।
বাবার বলল, তোমার যখন বিয়ে হবে, আমি বলে দিচ্ছি, প্ৰথমে মেয়ে হবে তোমার। আমি মেয়ে খুব পছন্দ করি। অথচ লোকে কী মন খারাপ করে মেয়ে হলে। লোক দেখান হাসে বটে। কিন্তু ভেতরে নিজেকে খুব ছোট মনে করে। এক সময় তো মেয়ে হলে গলা টিপেই মারত। আমার এক বন্ধুর কথা বলি। তার সঙ্গে তাদের দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। দেখি একটা গোল কবর। অবাক কাণ্ড। জিজ্ঞেস করলাম, কার? আমার দাদির?
কবরটা গোল কেন?
আমিও তাই জিগ্যেস করলাম। শুনলাম। ওখানে একটা ইঁদারা ছিল আগে। ওর দাদির তখন অল্প বয়স। কেবল এক ছেলের মা হয়েছে। সেই সময় বাড়িতে কীসের জন্যে যেন কাওয়ালীর আসর হয়েছিল। দাদি ভেতর বাড়ি থেকে চিক তুলে লুকিয়ে তা দেখছিল। সেই কথা জানতে পেরে আমার বন্ধুর দাদা বৌকে সেই রাতেই গোসল করিয়ে, নতুন কাপড় পরিয়ে, ঐ ইদারায় ফেলে দেয়। তারপর সিমেন্ট করে দেয় মুখটা। পরে আমার বন্ধুর বাবা সেখানে একটা মার্বেল পাথরে নাম লিখে দিয়েছেন। বুঝে দেখ, ঐ টুকুন অপরাধ।
সত্যি?
হ্যাঁ আমি নিজে দেখে এসেছি কবরটা। তোমার মন খারাপ করে দিলাম?
জাহেদা কোনো জবাব দিল না। ঠোঁট কামড়ে ধরে বসে রইল সে সমুখের দিকে চেয়ে। দূরে নয়ারহাটে অর্ধসমাপ্ত পুল। তীরের মত ক্রমাগত কাছে আসছে।
গাড়ি থামিয়ে ফেরির টিকিট কিনে ফিরে এলো বাবর। ঢালু বয়ে সন্তৰ্পণে নামল ঘাটে। ফেরি দাঁড়ানই ছিল। খালাসিরা হাত ইশারা করে ডাকতে লাগল বাবরকে। বাবর বলল, কপাল ভাল সঙ্গে সঙ্গে ফেরি পেলাম। এই রকম সব কটা পেলে চারটের মধ্যে রংপুর পৌঁছে যাব।
রংপুরে থাকব?
হ্যাঁ আজ রাতে। কাল আবার বেরুবা। কাল দিনাজপুরে। পচাগড় পর্যন্ত যাব। ফেরার পথে বগুড়া। বগুড়ার উপর দিয়েই যাব, কিন্তু আজ থামব না।
আগে থেকেই ইপিআরটিসির একটা কোচ দাঁড়িয়েছিল ফেরিতে। বাবরের গাড়ি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিল। কলকল জল সরিয়ে ওপারে যেতে লাগল ফেরিটা। জাহেদা অবাক হয়ে দেখতে লাগল দুটো নৌকা এক সঙ্গে বেঁধে কেমন পারাপারের ব্যবস্থা হয়েছে।
বাবর বলল, এতক্ষণে সত্যি সত্যি ঢাকা ছেড়ে চললাম।
গাড়ির সঙ্গে গা ঠেকিয়ে জাহেদা দাঁড়িয়ে রইল। নদীর প্রফুল্ল বাতাসে তার চুল মিহি ঝাউয়ের মত মুখে উড়তে লাগল। ভারি চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। যেন জীবনমৃত্যুর চিন্তা করছে জাহেদা।
কী ভাবছ?
কিছু না।
জাহেদা এবার সকালে এই প্রথম নির্মল হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভারি অবাক লাগল। বাবরের। এতক্ষণ এই নির্মলতাই সে প্রার্থনা করছিল, কতবার কতভাবে কথা বলতে চেয়েছিল সে জাহেদাকে, আর এখন কী এমন হলো, কী এমন কথা তার ঐ ছোট্ট মাথায় পাখির মত বসল যে আমন সুন্দর হয়ে উঠল তার মুখ? বাবর কিছু বুঝতে পারল না, কিন্তু প্ৰত্যুত্তরে সেও প্রশস্ত হাসিতে নিজেকে সুন্দর করার চেষ্টা করল নদীর ওপর ভাসতে ভাসতে।
ওটা কী লেখা?
জাহেদা খালাসিদের বুকে আঁটা পেতলের তকমার দিকে চোখ ইশারা করল।
তুমি তো বাংলা পড়তে জান না। ওখানে লেখা জনপথ। মানে, হাইওয়ে বলতে পার। তোমাকে বাংলা শেখাব আমি।
জানেন, খুব অসুবিধা হয়। আজকাল একটু একটু বুঝতে পারি। জাহেদা হঠাৎ মুখ তুলে বাবরকে বলল, বাবা আমাকে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়িয়েছেন। মা জানেন না ইংরেজি। তাকে চিঠি লিখতে পারি না। লিখলে ইংরেজিতে লিখতে হয়।
তোমার বাবা সেটা পড়ে দেন মাকে?
হ্যাঁ। কিন্তু সব সময় তো সব কথা বাবাকে জানিয়ে লেখা যায় না।
তা ঠিক। এই দ্যাখ না-বাবর একটু কাছে এলো জাহেদার। বলল, তোমার সঙ্গে এতক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলেছি, একেক সময় মনে হয়, যদি তুমি বাংলা বুঝতে।
