এবার জাহেদা ছোট একটু হাসল। কিন্তু চোখ উদ্ভাসিত হলো না সে আলোয়। সেখানে তখনো উদ্বেগ আর শঙ্কায় শাসন।
চা খেয়েছ?
জাহেদা মাথা নাড়ল।
নাশতা হয়নি?
তেমনি নিঃশব্দে মাথা নাড়ল জাহেদা। কোনো কথা না বলে, শুধু গভীর চোখে জাহেদার চোখ একবার বিদ্ধ করে বাবর তখন ভেতরে গেল। জাহেদার জন্য নাশতা সে বানিয়েই রেখেছিল। ভেতরে এসে একবার দেখে নিল সব ঠিক আছে কি-না। মান্নানকে গরম দুধ দিতে বলল। চায়ের জন্যে পানি বসাল বাবর। তারপর বাইরে এসে বলল, এসো।
জাহেদা প্রশ্নের চোখে তাকাল।
নাশতা করবে।
নীরবে জাহেদা তাকে অনুসরণ করল। এসে ডাইনিং টেবিলে বসল। তার বিপরীতে, দূরে বসল বাবর। জাহেদা এক চামচ কর্নফ্লেকস খেল, এক টুকরো রুটি মুখে দিল, ওমলেটের একটা কোণ ভাঙ্গল। একটা ছোট চুমু দিল বাবরের বানিয়ে দেয়া চায়ে।
বাবরের একবার মনে হলো বলে, এত কম খাচ্ছে কেন?–কিন্তু বলতে পারল না। কেমন যেন একটা সম্মোহন তাকেও পেয়ে বসেছে। জাহেদাকে একই সঙ্গে চেনা এবং অচেনা মনে হচ্ছে তার। মন্ত্রমুগ্ধের মত সে তাকিয়ে রইল ঐ কালো কামিজের ওপর জীবন্ত গম্ভীর কোমল মুখখানার দিকে।
জাহেদা একবার চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। পরীক্ষণে চোখ নামিয়ে রুটি ছিড়ল একটু। কিন্তু সেটা মুখে দিল না। আবার তাকাল বাবরের দিকে।
বাবর বলল, টেলিগ্রামটা কখন পৌঁছেছিল?
বিকেল। পাঁচটায়।
অসুবিধে হয়নি তো?
জাহেদা মাথা নাড়ল নীরবে।
সুপার কী বললেন?
কিছু না।
কদিনের ছুটি পেলে?
কিছু বলিনি।
জাহেদা মনোযোগের সঙ্গে চা খেতে লাগল। বাবর তাকে জিগ্যেস করল, তোমার খারাপ লাগছে?
জাহেদা প্রথমে মাথা নাড়ল। তারপর সেটা যথেষ্ট মনে না করে মুখে ছোট্ট করে বলল, না। তারপর চোখ তুলে সে হঠাৎ প্রশ্ন করল, আর কেউ আসেনি?
কে আসবে?
আর কেউ?
তখন বাবর বুঝল জাহেদার কথাটা। জাহেদা মনে করেছে আরো দুএকজন যাচ্ছে তাদের সঙ্গে। বাবর ভাবল একটা কিছু বানিয়ে বলে, পরমুহূর্তেই সামলে নিল নিজেকে। এমন কিছু সময় আসে যখন সত্যি বলা অনেক ভাল।
সে বলল, আর কেউ আসার কথা নেই। তুমি তাই মনে করেছিলে নাকি?
জাহেদা-চায়ের কাপ ধরে চুপ করে রইল।
তুমি আর আমিই যাচ্ছি। ভেবেছিলাম একাই যাব। প্রত্যেক বছর এই রকম দুচারদিন ঘুরতে বেরোই। এবার তোমার কথা মনে পড়ল। এই দ্যাখ আটটা পাঁচ বাজে। এক্ষুণি না বেরুলে আরিচার ফেরি পাব না। ওঠ।
বলে সে নিজে ওঠে দাঁড়াল। জাহেদার উঠতে একপলক দেরি হলো। সেই পলকটিকে অনন্ত বলে মনে হলো বাবরের। জাহেদা উঠে দাঁড়াতেই বাবর স্নিগ্ধ হেসে বলল, তুমি গাড়িতে গিয়ে বস।
জাহেদা ইতস্তত করতে লাগল।
কী হলো?
আপনি যান, আমি আসছি।
ও, আচ্ছা।
বাবর বাইরে বেরিয়ে মান্নানকে সব বুঝিয়ে দিল। হুঁশিয়ার করে দিল, বাসা ছেড়ে এক পাও যেন না নড়ে। টাকা দিল কয়েকটা। তখন বাথরুম থেকে জাহেদা বেরিয়ে এলো। বাবর যেন তা বুঝেনি এমনি নির্বিকার মুখে বলল, গাড়িতে যাও। বলে সে দিবোজা বন্ধ করে চাবি দিয়ে জাহেদার পাশে বসে সুটকেশটা পেছনের সিটে ফেলে দিয়ে এঞ্জিন স্টার্ট করল। খুব সন্তৰ্পণে ফটক দিয়ে বেরিয়ে ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ল বড় রাস্তায়। বলল, তোমার চশমা নেই?
আছে।
পরে নাও।
অতি বাধ্য ছাত্রীর মত ব্যাগ খুলে কালো চশমা পরে নিল জাহেদা।
গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে দিল বাবর। গতি বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের মাতামাতিতে জাহেদার গা থেকে মিষ্টি সৌরভ এসে নাকে লাগল বাবরের। সে আপন মনেই হাসল। পার হয়ে গেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল। তারপর বুড়ো গাছের ছায়া। আরে, রোদ উঠেছে? ডাইনে মাঠ, বায়ে জলা, কয়েকটা বাড়ির পুঞ্জ। পুল, মীরপুরের বাজার। মীরপুর পুলের কাছে গিয়ে পেল লালবাতি। উল্টো দিক থেকে গাড়ি আসছে এখন। বাবর একটা সিগারেট ধরাল।
কিছু বলছ না।
কই, না।
বলে জাহেদা একটু নড়েচড়ে বসল। যা চোখে পড়ল বলল, এখানে এত বালি কেন?
নৌকো করে এনে ফেলেছে যে! বাড়ি তৈরিতে লাগে। দেখছি না। ট্রাক বোঝাই শহরে যাচ্ছে।
ও।
জাহেদা চোখ নিচু করল। বাবর লক্ষ করল আশেপাশে লোকেরা খুব উৎসাহ নিয়ে সরস চোখে জাহেদাকে দেখছে। একজন সমস্ত কটা দাঁত বের করে হাসছে। পকেটে নীল চিরুনি।
লাল বাতিটা সবুজ হলো! ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে পার হলো পুলটা। তারপর ঢালুতে নেমেই বাড়িয়ে দিল গতিবেগ। এবার বাতাস আরো দাপাদাপি করে উঠল। সুবাসে, চুলে, বাতাসের হিম স্পর্শে বাস্তব যেন স্বপ্নে রূপান্তরিত হল। দুপাশে খেত, মাঠ, বাড়ি, জলা, নৌকো, রোদ দ্রুত সরে যাচ্ছে পেছনে। টায়ার থেকে শন শন শব্দ উঠেছে একটা। আর কিছু না। আর কোনো ধ্বনি নয়। গাড়ির ভেতরটা জাহেদার উপস্থিতিতে, রোদের আদরে, উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
চুপ করে আছ!
এমনি।
মাইলের পর মাইল অতিক্রম করে যেতে লাগল ওরা। পার হলো কৰ্ণ নদীর পুল। নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বাবর বলল, তুমি গাড়ি চালাতে পার?
না।
শিখবে?
জাহেদা ম্লান একটু হাসল।
আমি শেখাতে পারি। শিখে নিও। কেমন?
আচ্ছা।
আবার নেমে এলো সেই বিদ্যুৎপৃষ্ট নীরবতা। বাবর জানে, এখন জাহেদা আর ফিরতে পারবে না। এখন সে ঘটনার হাতে। কিন্তু কোথায় যেন মায়া করতে লাগল তার ওকে ওমান চুপচাপ দেখে। অনেকক্ষণ সেই মায়াটাকে বাড়তে দিয়ে আবার সে বলল, কিছু ভাবছ?
নাহ।
কাল রাতে ঘুম হয়েছিল?
হ্যাঁ।
তোমার ঘরে তুমি একা থাক?
না, আরো দুজন আছে। পাপ্পু আর শরমিন।
