মিসেস নাফিস কাঁধের চুল চলতে চলতে সরাতে গিয়ে বাবরকে দেখলেন এবং দুপায়ের মাথায় গিয়ে থামতে পারলেন।
বললেন, আপনি!
হ্যাঁ, আমি। বাবর কাছে উঠে এলো! আবার বলল, আমি। আপনি কি আমাকে এখানে আসতে বলেননি।
হ্যাঁ, আমি।
তাহলে ভুল শুনেছি।
কিন্তু–।
হ্যাঁ, আমিও তাই বলি। কিন্তু আপনি যেন বলেছিলেন, দেখা হবে। তাই চলে এলাম।
ও।
হঠাৎ নিঃশ্বাস ফেলে হেসে উঠলেন মিসেস নাফিস।
বাবর বলল, চলুন, কফি খেতে খেতে কথা বলি।
কফি?
হ্যাঁ, কফি।
আপনি তো হুইস্কি ছাড়া কিছু খান না শুনেছি।
কার কাছে?
কেন, আপনারই কাছে। সেদিন অত করে বললাম চা খেতে।
খেয়েছিলাম তো। পরে নিজেই চেয়ে খেলাম না?
সেটা আপনার ভদ্রতা।
দাঁড়িয়ে কথা ভাল দেখায় না। চলুন।
কোথায়? বারে না রেস্তোরাঁয়?
দুটোর কোনোটাতে নয়।
তবে? আমার এক বন্ধু থাকে ওপরে। তার সুইটে চলুন। যাবেন? আমার খুব ভাল বন্ধু। আপনি কি চিনবেন? জামাল?
জামাল? জামাল শেখ?
না, জামাল চৌধুরী। জামাল শেখ কে বলুন তো?
চিনবেন না। আছেন একজন।
বাবর লিফটের বোতাম টিপল। জ্বলে উঠল একটা তীর। যেন সূক্ষ্ম বিদ্রুপ করে কেউ হাসতে লাগল কোথাও।
মিসেস নাফিস নাভি ভেতরে টেনে চোখ গোল করে বলে উঠলেন, সত্যি সত্যি ওপরে নিয়ে যাচ্ছেন নাকি?
হ্যাঁ।
না, না, ভাল দেখাবে না।
ছোট্ট একটা মেয়ের মত খিন খিন করে উঠলেন মিসেস নাফিস। কথাটা প্রতিবাদ নয়, সিদ্ধান্ত নয়-কিছুই নয়। বলার জন্য বলা। তাই দেখে বাবর হেসে ফেলল।
হাসছেন কেন?
না, কিছু না।
সে মুহূর্তে দরোজা খুলে গেল লিফটের। ভেতরে পা দিলেন মিসেস নাফিসই প্রথমে। বাবর এসে বোতাম চাপ দিল। নয়ের বোতাম।
নাইনথ ফ্লোরে?
হ্যাঁ।
কিছু যদি মনে করেন?
কিছু মনে করবেন না। আপনাকে দেখলে খুশি হবে। আর আমিও খুশি হবো যদি আমার জন্যে আপনার একটি বন্ধু বৃদ্ধি হয়।
তার মানে তার কাঁধে চাপাতে চাইছেন? এই জন্যেই আমরা মেয়েরা বলি, পুরুষ মানুষকে যত শেখাও যত পড়াও ভদ্র হয় না, সভ্য হয় না।
বাবর হঠাৎ বলল, আপনার ছেলের নাম হাসু?
হ্যাঁ, কী হয়েছে?
মিসেস নাফিসকে ভারি উদ্বিগ্ন দেখাল।
না, কিছু না। ভারি মিষ্টি নাম। আমার এক বোন ছিল তার নাম হাসনু।
কই, কোনোদিন বলেননি তো!
কী?
আপনার বোন আছে।
বলিনি। বলার কী আছে? বোন থাকাটা বিশ্বের কোনো আশ্চর্য ঘটনা নয়। হাসনু তুই যা।
কী বললেন?
শেষ কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাবার পর টের পেয়েছে বাবর। এক মুহূর্ত বোকার মত তাকিয়ে রইল সে মিসেস নফিসের দিকে। পরে হেসে ফেলল। বলল, কই কিছু বলিনি তো!
লিফট এসে থামল। দরোজা খুলে গেল, যেন স্বপ্নলোকের দিকে। বাবরের মনে হলো জনশূন্যযানে তারা এখন রয়েছে।
করিডোরে পা রেখে মিসেস নাফিস বললেন, আজ খেয়েছেন?
সুরার কথা বলেছেন? হ্যাঁ, না। অতটা খাইনি।
থমকে দাঁড়াল মিসেস নাফিস। দাঁড়াল বাবর। মিসেস নাফিস জানলেন হাসল বাবর। এক পা পিছুলেন।
বাবর বলল, হাসু! হাসনু!
বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছিলেন মিসেস নাফিস। খসখসে ভয়ার্তা গলায় উচ্চারণ করলেন, আজ কী হয়েছে আপনার?
হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল বাবর।
মিসেস নফিসের মনে হলো এই লোকটিকে এর আগে কোনোদিন দেখেননি। তিনি। আরো দুপা পিছুলেন। তারপর দ্রুত ছুটে গিয়ে লিফটের বোতামে চাপ দিলেন তিনি।
বাবর কিছু বলল না।
বর্ধমানের সেই অন্ধকার। সেই চিৎকার। সেই পোল। তার চারদিকে চক্রের মত ঘুরছে, ফেটে পড়ছে। আচ্ছন্ন হয়ে আসছে তার দৃষ্টি। হঠাৎ সে দেখে মিসেস নাফিস নেই। কখন চলে গেছেন।
তখন ধীর পায়ে ফিরে যেতে লাগল সে, বাবর নিজেও। তার বুকের মধ্যে এক ধরনের কান্না পকিয়ে উঠতে থাকল, যার পরিণামে কোনো শব্দ হয় না, অশ্রু হয়।
বাবর এসে তার বিছানায় শুয়ে বিড়বিড় করে অবিরাম ডাকতে লাগল, হাসু হাসনু, হাসুরে। আর দুহাত শূন্যে তুলে শূন্যতার মধ্যে হাসনুর মুখ নির্মাণ করে আদর করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল।
১১. জাহেদা
আজ সকালে বেশ কুয়াশা পড়েছিল। এখন কুয়াশা নেই, কিন্তু চারদিকে সূর্য ওঠার অনেক আগে যেমন অন্ধকার-অন্ধকার তেমনি করে আছে। শীত করছে। হাতের তোলো মরা মাছের মত মনে হচ্ছে। কী যেন কোথায় হলে তারই অপেক্ষায় মুগ্ধ হয়ে আছে বস্তুপুঞ্জ। দ্যালানগুলো যেন ঝুঁকে পড়েছে সম্মুখে, পথটা উঠে গেছে দূরে, যেমন পাহাড়ে। একটা করে গাড়ির শব্দ হচ্ছে, মনে হচ্ছে সময়কে তোলপাড় করে চলে সাচ্ছে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে। মানুষগুলো পর্যন্ত খুব তাড়াতাড়ি পা ফেলে হাঁটছে।
তখন জাহেদা এলো। তার স্কুটার ফটক পেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে আবার ঘুরে এসে ভেতরে ঢোকার জন্যে নাক বাড়াল। হাত দিয়ে থামাল জাহেদা। নেমে অত্যন্ত মনোযোগ নিয়ে পয়সা খুঁজতে লাগল ব্যাগে।
আটটা বাজতে আঠার মিনিট বাকি।
বাবর এতক্ষণ বারান্দাতেই দাঁড়িয়েছিল। ফটকে ঢুকেই তাকে দেখেছে জাহেদা। আর বাবরও দেখেছে স্তব্ধ, উদ্বিগ্ন, পাণ্ডুরতাকে। যেন ফাঁসির মঞ্চে যাচ্ছে জাহেদা। পরনেও তার কালো পাজামা, কালো কামিজ, পায়ে কালো ফিতের স্যান্ডেল।
বাবর তার পয়সা দেয়া দেখল বারান্দায় দাঁড়িয়েই। যেন সে ভুলে গেছে চলা, এক মুহুর্তা অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর টিকটিক করে নেমে এসে সামনে দাঁড়াল। হাসল একটু।
জাহেদা জবাবে হাসল না, কথা বলল না, পয়সা গুণে দিল স্কুটারিওলাকে। বাবর তার ছোট সুটকেশটা নিয়ে বারান্দায় গেল। পেছনে পেম্বনে এলো জাহেদা। দরোজা খুলে ধরল বাবর। মাথা নিচু করে জাহেদা দ্রুত ঢুকল, সমুখেই যে আসন পেল তাতে বসে পড়ল। সুটকেশটা রেখে বাবর হাসল আবার।
