না, সুরা পানে কিছু হবে না। কাউকে দরকার। কোনো একটা জীবন্ত মানুষ। অনর্গল কথা কলতে হবে। নইলে আজ রাতে সে মারা যাবে। সেই রক্তাক্ত ছুরিটা সে চোখে দেখতে পাচ্ছে, বর্ধমানের অন্ধকারে, মাঠে, পোলের পাশে, ঝোঁপের ধারে।
দা–দা!
উদ্দাম গতিতে গাড়ি চালিয়ে দিল বাবর।
অনেকক্ষণ গাড়ি একভাবে চালাবার পর কান পাতল বাবর। না, চিৎকারটা আর তাড়া করছে না। তাকে। বাচা গেছে। তবু হাসনুর চেহারা একবার মনে করতে চেষ্টা করল সে, কিন্তু শত চেষ্টা করেও মনে করা গেল না। তখন স্বস্তিও হলো, আবার একটু দুঃখিতও হলো সে।
চারদিকে তাকিয়ে দেখল বাবর।
সমস্ত শহর ভারি অচেনা মনে হলো তার। পেট্রল পাম্পে এলো সে। ট্যাংক ভর্তি করে তেল নিল।
টেলিফোন আছে?
আছে স্যার।
লাফ দিয়ে নেমে কাচঘেরা ঘরের মধ্যে গেল বাবর। ডায়াল করল।
হ্যালো।
কে, হাসু?
জি।
ভাল আছ, হাসু?
হাসুর নামটা উচ্চারণ করতে ভারি মিষ্টি লাগে বাবরের।
ভাল। আপনি বাবার চাচা?
হ্যাঁ। তোমার বাবা কই, হাসু।
মাদারিপুরে।
মা?
আছেন। ডেকে দিই?
কী করছেন? ঘুমিয়ে? তা হলে থাক।
না, না। মা জেগেই আছেন। মা—আ।
টেলিফোনে ডাকটা শুনতে পেল বাবর। শুনতে পেল চটির শব্দ। শুনতে পেল মিসেস নফিসের খানখনে গলা।
হ্যালো।
আমি বাবর।
নিস্তব্ধতা।
আমি বাবর। হাসুব কাছে শুনলাম জেগে আছেন। কী করছেন?
কিছু না।
আমি আসছি।
দরকার আছে?
আছে।
টেলিফোন রাখল বাবর। মিসেস নাফিস সত্যি তার ওপর রাগ করেছেন। কেমন নিস্তাপ, নিম্পূহ করে রেখেছেন গলাটা। সেদিন সত্যি সত্যি কয়েকটা কড়া কথা বলা হয়ে গেছে। রসিকতা হয়ে গেছে বড় বেশি নির্মম। আজ পুষিয়ে দেবে।
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, মিসেস নাফিসকে দেখলেই তার জিবে চুলবুল করে ওঠে। খোঁচাতে ইচ্ছা করে। কেন সে টেলিফোন করতে গেল তাকে? কী দরকার ছিল?
বোধহয় মনে মনে সে এখন এমন কাউকে খুঁজেছিল যার সঙ্গে বিরোধ পদে পদে। যাকে দেখলেই নখগুলো শানিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। যদি কোণঠাসা করে প্রতিশোধ নেবার প্রবৃত্তিটা শান্ত করা যায়।
কিন্তু প্ৰতিশোধ কেন? কার ওপর?
দরোজা খোলাই ছিল। বাবরের পায়ের শব্দে কাজের ছেলেটা বেরিয়ে এলো। নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকল সে।
সোফার ওপর সবুজ চটিতে পা পেতে বসে আছে মিসেস নাফিস। হাতে আজ সকালের বাসী কাগজ। বাবরের মনে হলো রঙ্গমঞ্চে পর্দা উঠেছে। সে তাই হাসল। সেই হাসিটাকেই দীর্ঘ করে চটুল কণ্ঠে বাবর বলল, ভাল তো?
মিসেস নাফিস তীক্ষ্ণ চোখে নিঃশব্দে মাথা ওঠানামা করলেন আস্তে আস্তে। নিঃশব্দ সেই বাতাঁর অর্থ হতে পারে, হ্যাঁ। অর্থ হতে পারে আমার চোখে আপনি এখন কাচের মত স্বচ্ছ। বাবর আবার বলল, আপনার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। তাই। কারণ–। অবিশ্যি রাত বেশ হয়েছে–।
সুরা এত বেশি কাজ কবেছে যে বাক্যগুলি কিছুতেই শেষ করা যাচ্ছে না। বাবর একটা সিগারেট ধরাল অক্ষমতাকে ধামাচাপা দেবার জন্যে। জিগ্যেস করল, নসিফ সাহেব মাদারিপুরে কেন?
ওর মামাকে রেখে আসতে।
সেই মামা?
হ্যাঁ।
যার অপারেশন গল ব্লাডারে?
গল ব্লাডারে নয়, চোখে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, চোখে। চোখেই তো বলেছিলেন। এখন ভাল?
বোধহয়।
বোধহয় মানে?
জিগ্যেস করিনি।
ঠিক, ঠিক। বাইরে আপনার গাড়ি দেখলাম?
বাইরে যাচ্ছিলাম।
ও; কেন?
বলবেন না। একটু আগে হাসুকে নিয়ে খেতে গিয়েছিলাম। রেস্তোরাঁয় চাবি ফেলে এসেছি। এখুনি না গেলে হয়ত আর পাওয়াই যাবে না।
মিসেস নাফিস উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে স্থির হয়ে রইলেন। ভেতরেও গেলেন না, বাইরেও না। এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ তার ক্রমশ ধার হারাতে লাগল।
বাবর বলল, কোন রেস্তোরাঁ?
কাফে আরাম।
বাবর হাসল। যেন চাবি ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছেন মিসেস নাফিস। সে উঠে দাঁড়াল। বাইরে বেরুল তারা এক সঙ্গে।
মিসেস নাফিস বললেন, দেখা হবে।
বলেই তিনি গাড়িতে সরব করলেন এঞ্জিন। বাবর হাত নেড়ে তারটায় বসল। যতক্ষণ না তার গাড়ি বেরুল বাবর চাবিতে পর্যন্ত হাত দিল না। মেয়েরা গাড়ি চালালে তাদের থেকে দূরে থাকাটা বুদ্ধিমত্তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ মনে করে সে।
বাবর বেরিয়ে পেট্রল পাম্পে এলো তেল নিতে। কাল রংপুরে যাবার এই শেষ তৈরিটা বাকি আছে। চাবি খুলে ছেলেটাকে দিতে যাবে হঠাৎ তার চোখে পড়ল ট্যাঙ্কে তেল ভর্তি।
ওহো তাই তো। একটু আগেই না তেল নিয়েছে? হঠাৎ করে মাথাটা এমন শূন্য হয়ে গেল কেন?
হাঃ খেলে যা। ভাল করে খেলে যা। ব্রাভো খেলারাম।
ধন্যবাদ। হাঃ হাঃ হাঃ।
গাড়ি ছুটিয়ে দিল সে। পেট্রল পাম্পের ছেলেটা বিড়বিড় করে বলল, শালা মাতাল। তারপর তার মুখেও নিঃশব্দ এক টুকরো। হাসি ফুটে উঠল এবং অচিরেই হাসিটা হাইয়ে রূপান্তরিত হলো। তার ঘুম পাচ্ছে।
পুরনো পেন্টিংয়ে দেখেছে ইংল্যান্ডের জলাভূমিতে ঘোড়ায় চেপে শিকার করতে চলেছেন লর্ড। তার সমুখে শিকারী কুকুর। ঠিক তেমনি পেট সরু করে ছুটতে লাগল বাবর নির্জন অন্ধকার রাজপথ দিয়ে। তীব্ৰ গতিতে টায়ারে অবিরাম একটা হুইসিল বাজতে লাগল তার কানে।
অতিকায় একটা খেলনার মত দেখাচ্ছে ইন্টারকন্টিনেন্টালকে। কাচের দরোজার ওপারে মানুষকে মনে হচ্ছে রঙিন চলচ্চিত্রের চরিত্র। বাবর ভেতরে ঢুকলা চারদিকে দেখল, একবার ভাবল কাফে আরামে যায়, না থাক; সে ছিপ ফেলে একটা সোফায় বসল।
সবুজ শাড়িতে পুকুর ভরা শ্যাওলার মত মন্থর ঢেউ তুলে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন মিসেস নাফিস। বাবর তাকে ডাকল ও না, উঠেও দাঁড়াল না। নিঃশব্দে বিকশিত হাসিতে অপেক্ষা করে রইল।
