হঠাৎ দুটো মানুষের সাড়া পাওয়া গেল পোলের অপর দিকে, নিচে। সাড়া ঠিক নয়, নিঃশ্বাসের শব্দ। তার ভেতরে একজনের যেন হঠাৎ খুব শীত লেগেছে, দাঁতে দাঁতে শব্দ হচ্ছে তাই। আবার কখনো মনে হচ্ছে নিচু গলায় হি হি করে হাসছে।
কী করছে ওরা ওখানে?
বাবর কান খাড়া করল। অন্ধকারে হাসনু তার মুখের দিকে তাকাল। তারার আলোয়, নাকি ভয়ে, শাদা শাদা লাগছে হাসনুর মুখ।
দাদা।
চুপ।
হাসনুর মুখ চেপে ধরে বাবর কান পেতে রাখল ঐ শব্দের উৎসের দিকে। তার মেরুদণ্ড দিয়ে হঠাৎ ঠাণ্ডা তরল কী যেন নামছে অতি দ্রুত। তারপর হঠাৎ ঊরুর ভেতরটা ভিজে গোল উষ্ণতায়।
ঘড়ঘড় একটা শব্দ হলো সেই মুহূর্তে, ওপারে।
ফিসফিস গলায় কে যেন জিগ্যেস করল, বল শালা, হিন্দু না মুসলমান?
উত্তরে দ্বিতীয় লোকটা হি হি করে হেসে উঠল যেন।
বল।
চাপা গলায়। গর্জে উঠল প্ৰথম।
আঁ করে একটা শব্দ করল দ্বিতীয়।
তারপর শোনা গেল, হি হি মা, হি হি না, হি হি না না।
চুপ শালা।
বাড়িতে আমার বৌ আছে বাবা। না-আস্তে-না-না।
চিৎকারে ছিঁড়ে যাচ্ছিল অন্ধকারটা, কে যেন চেপে ধরে তা বন্ধ করল। সেই সঙ্গে ধানের বস্তা নামাবার সময় যেমন বুক থেকে শব্দ ওঠে কুঁলিদের সেই রকম একটা রুদ্ধশ্বাস ভারি শব্দ উঠল। আবার, আবার।
তারপর সব চুপ হয়ে গেল।
বাবর হাসনুকে টেনে তুলে দৌড় দিতে যাবে, একেবারে সামনে পড়ে গেল লোকটার। হাতে রক্তমাখা ছুরি। গলায় একটি মাদুলি চকচক করছে। আর কিছু চোখে পড়ল না তার।
আর কিছু মনে নেই বাবরের।
কেবল মনে আছে বাবর মাঠের ভেতর দিয়ে প্ৰাণপণে দৌড়ুচ্ছে।
আর পেছনে হাসানুর আর্তচিৎকার আকাশে বাতাসে হা হা করছে–দা—দা।
আরো খানিকটা হুইস্কি ঢালল বাবর।
হাসনুকে আর পাওয়া যায়নি।
কেন সে হাসনুকে ফেলে পালাল। কেন লড়াই করল না। কেন? কেন?
কোনটা স্বাভাবিক? পালিয়ে আসা? না, লড়াই করা? গল্পে উপন্যাসে মানুষের আদর্শে রুখে দাঁড়ানোটাই চিরকাল নন্দিত। সিনেমা হলে তালি পড়ে। বই পড়তে পড়তে প্ৰশংসায় পাঠকের মুখ লাল হয়ে ওঠে। কিন্তু সে নিজে, নিজের প্রাণ নিয়ে, পালিয়ে এসেছে। আমি কি ঘৃনিত বলে চিহ্নিত হবো?
নাকি আদর্শটাই ভুল।
মানুষ যা পারে না। তাই বড় করে দেখতে চায়, দেখানো হয়।
I know they do not know, but I
who have followed so many times
the road from the murderer to the murdered
from the murdered to the punishment
and from the punishment to the other murder, groping
the inexhaustible purple
that night of homecoming
when the Furies began to whistle
in the sparse grass–
I saw snakes crossed with vipers Entained on the Vile Generation
our destiny.
কতদিন পরে জর্জ সেফারিসের বইটা খুলল বাবর। পড়তে পড়তে চোখ ভরে এলো পানিতে। বইটা বন্ধ করে হাত বুলাতে লাগল নরম কভারে। ধুলা জমে আছে। ধুলোয় কিচ কিচ করছে মলাট। পকেট থেকে রুমাল দিয়ে সযত্নে মুছে আলমারিতে রেখে দিল বাবর। গোলাশটা শেষ করল।
হাসনু, আর কোনোদিন আসিস না। তুই যা।
হাসনু গেল না।
আলমারির ভেতরে খুঁজে দেখার ইচ্ছে হলো বাবরের। একবার কয়েকটা কবিতা অনুবাদ করবার চেষ্টা করেছিল সে। কাগজগুলো কই?
হাসনু তুই কি আমাকে মেরে ফেলবি?
এই তো কাগজগুলো। এই তো একটা অনুবাদ সম্পূর্ণ করেছিল সে। ঐ তো আরেকটার কয়েকটা লাইন। ঐ তো বাকিগুলো।
আমি পালিয়েছি বেশ করেছি। একশ বার পালাব। কার তাতে কী।
কাগজগুলো ভাঁজ করে একটা খামে পুরে রাখল বাবর।
সব শালাই পালায়। কিন্তু গল্প করার সময়, লেখার সময়, বক্তৃতায় উল্টোটা বলে। আমি সব জানি। সবাইকে আমার চেনা আছে।
হাসনুরে তুই যাবি না?
শূন্য গোলাশটা ছুঁড়ে মারল বাবর। দেয়ালে লেগে ঝনঝন করে ভেঙ্গে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে ঝিম ধরে উঠল মাথার ভেতরে। চমৎকার কাজ করতে শুরু করেছে। সুরা? বাবর দরোজা খুলে বেরুল বারান্দায়। এক ঝলক বাতাস তার মুখ ধুইয়ে দিয়ে গেল। হঠাৎ। হাত ঘড়ির দিকে তাকাল সে। কই, রাত তো বেশি হয়নি?
কাউকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কারো সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে ভাল হতো। কোথাও গেলে হতো। ঘরের ভেতরে গেলেই হাসনু আবার তার পোকা খাওয়া দাঁত নিয়ে হাসতে থাকবে। আর শোনা যাবে সেই আর্তচিৎকার। দা-দা!
বাবর গাড়ি স্টার্ট দিল।
সড়াৎ করে বেরিয়ে এল বড় রাস্তায়। একটানা চালিয়ে জাহেদার হোস্টেলের অদূরে গাড়ি রাখল সে। সিগারেট ধরিয়ে পেছনে মাথা হেলিয়ে পা লম্বা করে দেখতে লাগল হোস্টেলের জানালায় আলোর ছক।
দুপ দুপ করতে লাগল বুকের ভেতরে। সকাল হতে এখনো অনেক বাকি। সকালে জাহেদ আসবে।
জাহেদা
ভাল জাহেদা।
আমার ভাল জাহেদা।
এই আবৃত্তি ক্রমশ অমৃতের মত মনে হতে লাগল তার। প্রশান্ত হয়ে আসতে থাকল আত্মা।
হ্যাট।
ঐ দ্যাখা হ্যাট।
ঐ দ্যাখ কালো হ্যাট।
ঐ দ্যাখ জনের কালো হ্যাট।
ঐ দ্যাখ জনের কালো হ্যাট টেবিলে।
ঐ দ্যাখ জনের কালো হ্যাট টমের টেবিলে।
হাঃ।
এইভাবে শূন্য থেকে এক, এক থেকে দুই, দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার, এইভাবে, এইভাবে। শূন্যতা থেকে শুরু করা যায়। শূন্য থেকে আমি। আমি থেকে তুমি। আমি তুমি থেকে সে। আমি, তুমি, সে থেকে অনেকে।
অনেক কি আমরা হয়?
আমি বিশ্বাস করি না।
আমি বলছি, আমি বিশ্বাস করি না। জাহান্নামে যাও।
হাসনু যা। যা বলছি।
