পরশু আটটার মধ্যে।
আচ্ছা।
আমি পৌঁছে দিয়ে আসি হোস্টেলে?
না।
আবার না বলছ?
জাহেদা করুণ ভাবে হাসল। তখন আবার সেই রকম মায়া হলো বাবরের। তাকে আদর করতে ইচ্ছে করল বাচ্চা মেয়ের মত। বদলে বলল, আচ্ছা, মান্নানকে বলছি স্কুটার ডাকতে। ততক্ষণ বস।
জাহেদা সোফার এককোণে চুপ করে জড়সড় হয়ে বসে রইল। তার কান পথের দিকে।
কখন কুঁটারের শব্দ শোনা যায়।
বাবর বলল, এখুনি এসে যাবে স্কুটার।
বাবর তাকে গভীর চোখে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে চারদিকের প্রতিটি বস্তু যেন অবলুপ্ত হয়ে গেল। রইল। শুধু জাহেদার মুখ। সে মুখে জামার জাফরান রংয়ের বিছুরিত আভা। জাহেদার ঠোঁট নড়ে উঠল একবার। টলটল করে উঠল যেন রংটা। জাফরান রংয়ের লিপিস্টিক। একটু আগে তার থেকে খানিকটা লেগেছিল। কফির পেয়ালায়। পেয়ালা থেকে নিঃশেষে তা বাবর তুলে নিয়ে নিয়েছে ঠোঁট দিয়ে। প্ৰত্যুত্তরে বাবরের ঠোঁটও যেন নেড়ে উঠল তার ইচ্ছার অপেক্ষা না করেই।
বাবর হাসল।
তখন জাহেদাও হাসল। তেমনি ভীত করুণ এক চিলতে হাসি। বলল, আজ সারাদিন কোথায় ছিলেন?
বাবর যেন কোনো কবিতার পংক্তি উচ্চারণ করছে এমনি সুরে বলল, কাজে। কাজে ছিলাম, জাহেদা। ব্যবসার কাজে। এত কাজ। যদি কাজ না করতে হতো।
জাহেদা আবার হাসল। সেই রকম।
বাবর তখন বলল, তুমি যদি যেতে না চাও তো ঠিক আছে। উদ্বিগ্ন তীক্ষ্ণ চোখে জাহেদা তাকাল। তোমার অসুবিধে হলে থাক না। পরে কখনো যাওয়া যাবে।
পরে কেন?
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, যেতে চাও না।
নাতো। কত কিছু দেখব। বাবা কোনোদিন কোথাও নিয়ে যাননি। যাব না কেন? যাব।
অনেক কিছু দেখতে পাবে। বাংলাকে জানবে। তোমরা সব ইংরাজি পড়। দেশ চেন না। নিজের দেশ না চিনলে হয়?
জানি।
সেই জন্যেই যাবার কথা যখন হলো, সবার আগে তোমার কথা মনে পড়ল। বাবা কোথাও নিয়ে যাননি তো কী হয়েছে? তুমি বড় হয়েছ। নিজেই যাবে। শুধু বাংলা কেন সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। আমার এক বান্ধবী ফ্রান্সে আজ তিন বছর–
বাইরে স্কুটারের শব্দ শোনা গেল।
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল জাহেদা।
যাই।
এসো জাহেদা। পরশু আটটার মধ্যে?
আচ্ছা।
আটটার আগেই এসো।
কী যেন ব্যবস্থা করবেন, বললেন না?
বাবরের একবার ইচ্ছে হলো, বলে দেয়। বলবে? না, থাক। এখন না বলাই ভাল। বলল, কাল ভোরে আমাকে টেলিফোন কোরো হোস্টেল থেকে। রাতটা ভেবে দেখি।
আচ্ছা।
জাহেদা স্কুটারে গিয়ে বসল। ড্রাইভার ভাবল, বাবরও বুঝি আসবে। বাবর তখন তাকে ইশারা করল যেতে। জাহেদা গলা বাড়িয়ে বলল, খোদা হাফেজ।
বাবর হাত নাড়ল। শূন্য ফটকে দাঁড়িয়ে ভাবল, মেয়েটা এত বিশ্বাস করে তাকে। হোস্টেল থেকে কী করে বেরুবে সেইটো জানার জন্যে সারাদিন এখানে বসেছিল। দ্বিতীয় বার অনুরোধ পর্যন্ত করতে হলো না।
বিশ্বাস?
বাবর হাসল। বিশ্বাস বস্তুটাই আপেক্ষিক, এই উপলব্ধি জাহেদার এখনো হয়নি। বিশ্বাস একটা পণ্যের নাম। এর কিছু জাত স্বদেশে তৈরি হয়, কিছু বিদেশে, আমদানি করতে হয়, কিছু রফতানী করি। অবিকল একটা পণ্য।
ঘরে এসে জাহেদার পেয়ালাটা ছোঁ মেরে তুলে নিল বাবর। পেয়ালায় আবার রং লেগেছে, জাহেদার ঠোঁটের রং, জাফরান লিপস্টিক। বাবর দুই ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরল সেখানে। সম্পূর্ণ রংটাকে গ্ৰাস করে নিল। ঠাণ্ডা কটু কফির তলানি দাঁতের ফাঁক দিয়ে মুখে চুকে গোল তার। কিন্তু সে ফেলে দিল না। পেয়ালার ভেতরে এখনো যেন জাহেদার নিঃশ্বাস ঘুরছে। তুষিতের মত এক ঢোকে সবটুকু উচ্ছিষ্ট পান করল সে। তারপর বিহ্বললের মত খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, একটা পোকা খাবার পর টিকটিকির মত স্ফীত স্তব্ধ হয়ে থেকে, সে টেলিফোনের কাছে গেল। দ্রুত পাতা উলটে বার করল রশিদ ট্র্যাভেল এজেন্সির নম্বর।
বাবর বলছি।
স্নামালেকুম স্যার, কী খেদমত করতে পারি?
খেদমত? এমন খেদমত করার সুযোগ তুমি আর কখনো পাওনি–মনে মনে বলল বাবর এবং হাসল।
কাল চাটগাঁয়ে যাব। কালই ফিরব। রিটার্ন টিকিট চাই।
কাল কখন?
ধরুন, যাব দশটা এগারটা নাগাদ, ঘণ্টাখানেক পরে।
আচ্ছা, আমি একটু পরেই জানাচ্ছি।
যে করেই হোক সিট দিতে হবে।
আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব স্যার।
ব্যবসার কাজে ভীষণ দরকার। না হলেই নয়। কাউকে ক্যান্সেল করিয়ে হলেও–
ও-কে স্যার।
টেলিফোন রেখে দিল বাবর। অধীর হয়ে পায়চারি করল বার কয়েক। হাঁ করে শিম্পাঞ্জির ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন এ জন্তু এর আগে সে কখনো দেখেনি। তারপর বসল। ঠিক সেই জায়গায় যেখানে এতক্ষণ জাহেদা বসেছিল। এতক্ষণ বসে থাকার ফলে সেখানে একটা কুলোর মত গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। গর্তটা নিখুঁতভাবে মিলিয়ে সেখানে নিজের নিতম্ব স্থাপন করল বাবর। হেলান দিল সোফার পিঠে। পা টান করে দিল সমুখে। ভাবতে লাগল জাহেদার কথা। আশ্চর্যজনকভাবে জাহেদার মুখটাকে মনে হলো অবিকল বাটপাতার মত।–তেমনি সবুজ, সপ্ৰাণ, পাতলা, তীক্ষ্ণধার।
সমস্ত কামরায় ঝনঝনি তুলে বেজে উঠল টেলিফোন।
হ্যালো।
ওপার থেকে তখুনি সাড়া এলো না। বাবর আবার অধীর গলায় বলল, হ্যালো।
তখন বাবলির গলা শোনা গোল।
আমি বলছি।
বল।
চুপ করে রইল বাবলি।
কই, বল। আমি শুনছি।
এটা কী করেছেন?
কোনটা?
বই।
ওহ, বই? হ্যাঁ, বইটা বেশ ভাল, পড়।
নিজেকে খুব চালাক মনে করেন?
কে না করে? কেউ নিজে বলে, সে বোকা?
বলে। চালাক যারা তারাই বলে। আর যারা বোকা তারা নিজেদের চালাক ভাবে। বুঝেছেন?
