তোমার বয়স হয়েছে।
তার মানে?
তুমি বুদ্ধিমতির মত কথা বলতে শুরু করেছ। আমি খুব খুশি হলাম। আমার কাছে কাল না এলে আজ একদিনে এতটা বড় হতে না।
বইটা ফেরত নিয়ে যাবেন।
যদি না নিই?
নিয়ে যাবেন।
আমি যা দিই ফিরিয়ে নিই না। বাবলি, তুমি শুধু শুধু রাগ করছি। যদি সত্যি চাও, আমি আর কোনোদিন তোমাকে ডাকব না, তোমার কথা মনে করব না। আমি কখনো কারো ওপর জোর করি না। সেটা আমার স্বভাবই নয়। বাবলি, শুনছ? হ্যালো।
হ্যালো। নিষ্প্রাণ গলায় বাবলি সাড়া দিল।
বাবর তখন আবার মুখর হলো, আমি অপর পক্ষের ইচ্ছার খুব বড় দাম দিই। আমার কোনো ইচ্ছা নেই। বলতে গেলে ইচ্ছা কী?–তা আমি জানি না। বিশ্বাস কর। কাল যা হয়েছে তা মনে কর অন্য কারো জীবনে হয়েছে। সে তুমি নও, সে আমি নই। আর যদি মনে কর বইটা ফিরিয়ে দিলে তোমার ভাল লাগবে, দিও।
বাবলি চুপ করে রইল।
কিছু বল। কথাও বলবে না? বেশ তো।
হ্যালো।
বল বাবলি।
আপনি–আপনি আমার এ কী করলেন?
আমি তো কিছু করিনি।
আমিও তো নিজে কিছু–
আমি জানি। আমরা কেউ কিছু করিনি। হবার ছিল হয়ে গেছে। মনে কর একটা স্বপ্ন দেখেছি। খারাপ স্বপ্ন। আসলে এই অনুতাপ হওয়াটাই খারাপ। অনুতাপ কখনো করবে না। অনুতাপ করে চেহারা বদলান যায় না। তোমাকে একটা কথা বলি জীবনে কাজে লাগবে। অনুতাপ কখনোই করবে না। অনুতাপ জীবনের শত্রু। ভাল না লাগে, ভুলে যাবে। যা করতে ইচ্ছে হয়, তাই করবে। আসলে আমি জানি, তোমার মন বলছে আমার সঙ্গে আবার দেখা হোক। কিন্তু লোক-ভয়, সমাজের ভয়, কত রকম ভয় তোমাকে ভাবিয়ে তুলছে। বাবলি একদিন এসো। যেদিন তোমার ইচ্ছে। যখন তোমার সময় হয়। আসবে? বাবলি। আসবে?
জানি না।
এও ভাল। ভুল জানার চেয়ে কিছু না জানা অনেক ভাল! এসো। কিন্তু! মন খারাপ কর না! আজ পড়াশোনা কর না। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। আমি হয়ত স্বপ্নে আসল।
কিছু বলল না বাবলি। অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর টেলিফোন বেখে দিল সন্তৰ্পণে। ঘুমের মধ্যে খুঁট করে একটা শব্দ হলো যেন, আর কিছু নয়। অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিক। বাতিটা জেলে দিল বাবর। নানা আকারের ছযা মুহোর্ত ইতস্তত সৃষ্টি হলো চারদিকে, নানা ঘনত্বে আলো! দেয়ালে নিগ্নে। মেয়েটায় মুখ যেন হেসে উঠল। হঠাৎ। অকাবণে বায়াফ্রার কথা মনে পড়লে তার। মনে পড়ল সেই কথাটা বায়াফ্রার গোটা একটা পুরুষ ভুলে যাচ্ছে কী করে খেতে হয়, চিবোতে হয়, জিহ্বা ব্যবহার করতে হয়। নতুন করে তাদের শেখাতে হবে। আর এই সৰ্ব্বগ্রাসী ক্ষুধা আর উলঙ্গ দেহে যুদ্ধের মধ্যেও রমণীরা সেখানে গর্ভবতী হচ্ছে, জন্ম দিচ্ছে চক্ষুসার উদরসর্বস্ব শিশুকে। সেই সব শিশুকে কি শেখাতে হবে সঙ্গম কী করে করতে হয়? উত্থিত শিশ্ন মুঠো করে ধরে বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে থাকবে তারা?
না।
বাবর হাসল। আহার এবং সঙ্গম কাউকে শেখাতে হয় না। বায়াফ্রার ওরা ঐ চমকপ্ৰদ কথা ছেড়েছে নিছক সহানুভূতি আদায়ের উপায় হিসেবে। অর্থাৎ আমাদের খাদ্য দাও, আমাদের বাঁচিয়ে রাখা। আমন কাব্য করে না বললে আমার গোলার দরোজা আমি খুলে দেব কেন?
কথা। শুধু কথা। কথা তার জীবিকা। কথা তার পন্থা। টিভিতে সে সুন্দর করে কথা বলে দুটো পয়সা আসে বলে। বাবলি জাহেদা ওদের সঙ্গে কথা বলে সঙ্গমে তাদের সম্মত করতে। সে যেমন চুরি ডাকাতি করে বাঁচতে চায় না, তেমনি ধর্ষণে বিশ্বাস করে না।
সেই গল্পটা মনে পড়ে গেল বাবরের। নতুন বিবাহিত স্বামী স্ত্রীকে বলছে, দ্যাখ, চাঁদ উঠেছে, আকাশে। কত তারা চিকমিক করছে, কী মিষ্টি বাতাস দিচ্ছে। স্ত্রী শুনে যাচ্ছে। স্বামী বলেই
চলেছে, বাগানে ফুল ফুটেছে, আর দ্যাখ—। তখন তাকে থামিয়ে স্ত্রী উত্তর করল, বুঝছি, তুমি আমারে করবার চাও।
অশিক্ষিতা হলেও গল্পের এই নায়িকাটি বুদ্ধিতে প্রখরা। সে জানে কথার পরিণামে কী আসবে।
এতটুকু বুদ্ধি আমাদের অনেক নাগরিকই রাখেন না। পল্টনে যখন বক্তৃতার তুবড়ি ছোটান নেতারা, কজন বোঝে, পরিণামে নতুন উপায়ে শোষণই হচ্ছে বক্তার লক্ষ্য?
রশিদ ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টেলিফোন এলো।
স্যার, দশটা পঁয়ত্ৰিশে যেতে পারবেন, ফেরার সীট দুপুরে নেই, বিকেলেও নেই, লাস্ট ফ্লাইটে আছে, রাত সাড়ে নটায়। এতক্ষণ আপনার ফোন এনগেজড ছিল।
হ্যাঁ। তাহলে ঐ টিকিটাই করে রাখুন। আমি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি।
কী নামে হবে?
কেন? আমার নামে।
ও-কে স্যার।
০৯. পতেঙ্গা এয়ারপোর্ট
পতেঙ্গা এয়ারপোর্ট থেকে সোজা শহরে এসে টেলিগ্রাফ অফিসে ঢুকল বাবর। একটা ফরম নিয়ে খসখস করে লিখল–কী লিখবে আগে থেকে ভাবা ছিল তারা—
এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম
জাহেদা ইসলাম
সেইন্ট মেরি কলেজ হোস্টেল
ইস্কাটন, ঢাকা
ফাদার সিরিয়াসলি ইল, কাম শার্প।
–মাদার।
পয়সা গুণে দিল বাবর। গলা বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, টেলিগ্রামটা আজকেই পাবে তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
কখন পাবে? এই ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে।
ধন্যবাদ।
বাইরে বেরিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল বাবর, হাসল। একটা সিগারেট ধরাল যত্ন করে। জাহেদা আজ সকালে টেলিফোন করেছিল। তখন তাকে সে বলেছিল। এই রকম একটা নিয়ে। তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল জাহেদা।
না, না, বাবার অসুখ বলে দরকার নেই।
দূর পাগল অসুখ বললেই সত্যি সত্যি অসুখ হয় নাকি? ওসব কুসংস্কার।
যদি কেউ ধরে ফেলে।
কারো সাধ্য নেই। চাটগাঁ থেকে টেলিগ্রাম আসবে। তোমার বাবা তো ওখানেই থাকেন। কেউ ধরতে পারবে না। বলে বাবর আর বেশি সময় দেয়নি জাহেদাকে। চট করে যোগ করেছে, কাল আটটার মধ্যেই আসা চাই। কেমন? এখন রাখি।
