কে?
লতিফা, লতিফা।
সেই যে আপনার ভাই-ঝি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। তার খবর শুনেছ? সে বিয়ে করছে।
মেয়েরা বিয়ে করে নাকি? তাদের তো বিয়ে হয়।
এটাকে বিয়ে করাই বলতে পার। ও নিজে সোধে বিয়ে বসছে।
কার সাথে?
আমারই এক ভাইপোর সাথে। ব্ৰিলিয়ান্ট ছেলে। ভালই তো। কবে বিয়ে?
এই সামনেই। তোমরা একে একে এভাবে বিয়ে করলে আমার কী অবস্থা বল তো। মনে হয় বুড়িয়ে যাচ্ছি।
বারে! বয়স হলে বুড়ো হবেন না?
তা ঠিক। না, ঠাট্টা নয়। তোমরাই আমার বয়সটা বাড়িয়ে দিলে। এই তো দ্যাখ না। দুদিন বাদে শাড়ি পরবে, তখন রীতিমত মহিলা। তোমাকে দেখে মনে হবে, নাহি সত্যি সত্যি সময় চলে গেছে।
আমি কোনোদিন শাড়ি পরব না।
কেন?
এমনি। আমার ভাল লাগে না।
আমারো ভাল লাগে না। তুমি ঠিক বলেছ। তোমার এই জামাতে তোমাকে যা ভাল লাগে, শাড়িতে তার অর্ধেকও লাগবে না।
জি না। শাড়িতেও আমাকে মানায়। সবাই বলে। মাঝে মাঝে শখ করে পরি।
তোমার নীল জামাটা কই?
কোন নীল জামা?
সেই যে, যেটা পরলে তোমাকে খুব ভাল দেখায়। একদিন আমার সঙ্গে নিউ মার্কেটে বই কিনতে গেলে, সেদিন পরেছিলে।
ও, সেইটা।
তাহলেই দ্যাখ, বলেছিলাম না তুমি আমাকে পছন্দ কর না?
এর মধ্যে ও-কথা কেন?
এই জন্যে যে, পছন্দ করলে আমার কথাটা মনে থাকত। আমি যখন যা বলি মনে রাখতে।
জাহেদা চুপ করে রইল কথা খুঁজে না পেয়ে।
বাবর বলল, আচ্ছা, সে যাকগে। এই জাফরান রংটাও খুব মানিয়েছে।
নতুন বানালাম। আজকেই পরেছি।
কী কাপড়?
সুতি।
দেখে তো অন্যরকম মনে হচ্ছে। বাহ দেখি।
বলে বাবর উঠে এসে জাহেদার কামিজের একটা কোণ হাতে নিযে দেখতে লাগল মনোযোগ সহকারে। আসলে, তার ভারি ইচ্ছে করছে আবার একটু স্পর্শ করতে। হাত সরিয়ে আনবার সময় ইচ্ছে করে একটু ছুঁয়ে দিল ঊরুটা। যেন একটা রাবার ফোমে এক মুহৰ্তের জন্যে হাত রেখেছিল সে। হাতটা ফিরিয়ে এনে আপন চিবুকে ছুঁইয়ে রাখল সে।
জাহেদা বলল, আজকাল কত সুন্দর প্রিন্ট বেরিয়েছে।
বাবর আরেকটা সিগারেট ধরালা।
আপনি এত সিগারেট খান?
কী করব? এছাড়া আর তো নেশা নেই।
তাই বলে একটার পর একটা?
তাছাড়া থাকি একা। সিগারেট বন্ধুর মত কাজ দেয়।
তা হোক। খাবেন না এত। এইতো আপনার এই ম্যাগাজিনেই পড়ছিলাম সিগারেট খেলেই ক্যান্সার হয়।
ক্যান্সার হলেই মৃত্যু, তাই না।
তাই তো। মৃত্যু কীসে হয় না বল। আমার কোনোদিন মৃত্যু হবে না। যদি এ ভরসা দিতে পার, ছেড়ে দেব সিগারেট।
সে ভরসা কেউ দিতে পারে?
আসলে কী জান—
আবার বক্তৃতা দেবেন তো? আপনাকে চিনি না? থাক। আপনার যদি মরতেই ইচ্ছে করে, খাবেন সিগারেট।
আচ্ছা, তুমি বলছি, তোমার কথা কি ফেলতে পারি? খাব আজ থেকে কম করে। এই এটা ফেললাম। আসলে আমার কথা হচ্ছে, যতক্ষণ বেঁছে আছি যা ভাল তাই করব। একবারের বেশি দুবার তো বাঁচব না। এই সামান্য কদিনের জন্য কী হবে এত বিধিনিষেধ মেনে আত্মাকে কষ্ট দিয়ে? যে লোকটা সিগারেট খায় না, কিম্বা শুধু সিগারেট কেন, যা করতে ইচ্ছে করে তা করে না সে যে আমার চেয়ে ভাল আছে, তার জীবন যে আদর্শ জীবন, সুখের জীবন তাও তো নয়?
বুঝি না বাবা আপনার কথা।
বুঝবে। বয়স হলে বুঝবে। এখন তো ছেলেমানুষ। বড় হও। তখন বুঝবে।
আমি এখন কিছু কম বুঝি না?
কী বোঝ।
কী আবার? সব কিছু। কটা বাজে দেখুন তো।
পৌনে পাঁচটা। তোমার ঘড়ি কী হলো?
বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। উঠি।
আর একটু বস।
উহুঁ। তাহলে হোস্টেল থেকে বের করে দেবে।
দিক, আমার এখানে এসে থাকবে।
আপনি মেয়েদের হোস্টেল খুলেছেন নাকি?
ভরসা দাও তো খুলি।
জাহেদা হেসে উঠল, বলল, মেয়েদের ঝামেলা অনেক। মাথার ঘিলু নাড়িয়ে দেবে। জিজ্ঞেস করবেন আমাদের দারোয়নকে।
সে বেটা সেই জন্যই বোধহয় গলায় ক্রুশ বেঁধেছে।
জাহেদা দ্রুত স্লিপার পরে নিল। দরোজার কাছে গেল। গিয়ে একবার ইতস্তত করল।
বাবর বলল, আমার চিঠি পেয়েছিলে?
ঘাড় কান্ত করে নীরবে হ্যাঁ বলল জাহেদা। আর সেই সঙ্গে ভারি উদ্বিগ্ন দেখাল তাকে। বাবর জিগ্যেস করল, কোনো গোলমাল হয়েছে নাকি?
না।
তাও ভাল। আমি ভাবলম চিঠিটা সুপারের হাতে পড়েছে বুঝি।
ও চিঠি পড়লেই কী।
আমিও তাই বলি। তবে তোমার কাছে শুনেছিলাম যে বেটি নাকি একটা শকুন। কেবল ছোঁক ছোঁক করে বেড়ায়। চিঠি খুলে খুলে পড়ে।
এটা পড়েনি। কিন্তু–
কী কিন্তু?
যাব কেমন করে?
আনন্দে লাফিয়ে উঠল বাবরের হৃৎপিন্ড। যাবে তাহলে জাহেদা। যাবে তার সঙ্গে। এত সহজে রাজি হবে সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। খুশিতে প্ৰায় জড়িয়ে এলো তার উচ্চারণ। কোনো মতে বলল, যাবে কী করে মানে? গাড়িতে যাবে।
সে নয়। হোস্টেল থেকে বেরুব কী করে?
পারবে না?
না।
কিছু একটা বলে? মাত্র তিন চার দিনের জন্য।
তিন-চার-দিন!
হ্যাঁ। যেতে একদিন, আসতে একদিন, একদিন দুদিন ঘোরাফেরা।
তাহলে থাক। অসম্ভব। বেরুনোই যাবে না।
খুব যাবে। আমি ব্যবস্থা করব।
কীভাবে?
দ্যাখ না তুমি।
তবু শুনি।
আমি একটু ভেবে দেখি।
আসলে বাবর আগে থেকেই ভেবে রেখেছে কী করে জাহেদাকে সে হোস্টেল থেকে বের করবে। চিঠিটা লেখার সময়ই ভেবে রেখেছে সে।
বলল, ভেবে দেখি কেমন? আমরা পরশু দিন সকালে রওয়ানা হবো। তুমি সকালে তৈরি হয়ে একটা স্কুটার ডেকে সোজা আমার বাসায় চলে এসো। আটটার মধ্যে। ঠিক আটটার সময় বেরুতে হবে। নইলে সন্ধ্যের আগে রংপুর পৌঁছন যাবে না।
উদ্বিগ্ন শংকিত চোখে নীরবে জাহেদা কথাগুলো শুনল। তার একটা মন রাজি হতে চাইছে না, আরেকটা মন কীসের আকর্ষণে যে এগিয়ে যাচ্ছে তা সে নিজেও জানে না, বারণও করতে পারছে না। কোনোমতে ঢোকা গিলে সে শুধু উচ্চারণ করল, আচ্ছা।
