বইটা দেখে বাবলি দপ করেজ্বলে উঠবো! কিন্তু কিছু বলতে পারবে না। বাবর কল্পনা করে মজা পেল, ভেতরের চাপা আক্ৰোশে বাবলি শুধু এঘর ওঘর করছে। এক সময় হয়ত সে টেলিফোন করবে। টেলিফোন তাকে করতেই হবে। আজ রাতেই সে করবে। যাক, একটা ভাল চাল দেয়া গেছে। বইটা কিনে বড় উপকার করেছে সে নিজের।
কে একজন খুব লম্বা লম্বা পা ফেলে বাথরুমে ঢুকল। লোকটার একটা হাত এখনি ট্রাউজারের বোতামে। বড্ড জোর লেগেছে বোধ হয়। প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার পর অনাবিল তৃপ্তিতে চোখ তুলেই লোকটা আয়নায় দেখতে পাবে MAKE LOVE NOT VVAR হাঃ হাঃ। বাবর কি বাইরে অপেক্ষা করবে লোকটা ফিরে আসা পর্যন্ত?
আচ্ছা, দেখা যাক না। লোকটা বেরিয়ে এলে তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। লেখাটা দেখে প্ৰতিক্রিয়া কী হয়েছে।
চকিতে বাবরের মনে পড়ল শ্যারণ টেটকে হত্যা করার পর হত্যাকারীরা বড় বড় করে লিখে গিয়েছিল PIGS — শুয়োরের দল। সব শালা শুয়োর। উদ্দেশ্যহীন একটি হত্যা—একটি নয়, এক সঙ্গে চারটি। যারা হত্যা করেছে তারা স্বীকার করেছে নিহতদের সঙ্গে আগে তাদের কোনো পরিচয় ছিল না। প্রথম দৃষ্টিতে প্ৰেম! হাঃ প্রথম দেখাতেই মৃত্যু, রক্তপাত, হত্যা। প্রথম দেখাতে যদি প্রেমে পড়া সম্ভব হয়, চিরকাল লোকে তো একে আদর্শ একটা ঘটনা বর্ণনা করে এসেছে, তবে প্রথম দেখাতেই কাউকে হত্যা করার ইচ্ছে হবে না কেন। আমাকে বোঝাও বাপ। হাঃ। যত সব কেঁদো শুয়োরের দল।
লোকটা বেরিয়ে এলো। মুখ তার লাল। বাবরের দিকে চোখ পড়তেই লজ্জায় দ্রুত চোখ নামিয়ে এলোমেলো পায়ে প্রায় দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। যেন বাথরুমে লেখাটা সে-ই লিখেছে। আরে, আরে, মজা দেখ। এই রকম অনুভূতি, এই রকম প্রতিক্রিয়া প্রবল হলে লোকে যাজক হয়, নেতা হয়, বিশ্বপ্রেমিক হিসেবে অভিনন্দন কুড়োয়, তার জীবনী পড়ে পরীক্ষা পাশ করতে হয়। তোমার পাপে আমি অনুতপ্ত, লজ্জিত। তোমার দুঃখে আমি কাঁদি। তোমার পতনে আমি রক্তাক্ত হই।–ব্যাস, এই তো কথা! যীশুখ্রিষ্টও এই বলেছেন। হযরত সারারাত জেগে খোদার কাছে মুক্তি চেয়েছেন মানুষের।
হাঃ খেলে যা। খেলে যারে খেলারাম। খেলে যা।
বাবর বারে এসে বিল শোধ করে বেরুল। পকেটে এখনো একরাশ টাকা। সেই হাজার টাকা থেকে একশ টাকাও এখনো পুরো ভাঙ্গেনি। হতরনকে একবার টেলিফোন করে দিতে হয়, আলতাফকে যেন না বলে গহনার টাকা সে দিয়েছে।
হ্যালো। আমি বাবর।
হতরন অধীর গলায় উচ্চারণ করলেন, আপনাকে অফিসে টেলিফোন করেছিলাম। ওরা প্ৰথমে বলল আছেন, তারপর বলল—
বেরিয়ে গেছিলাম। টেলেফোন করেছিলেন কেন?
কিছু না, এই এমনি। আপনাকে শুধু বলতে যে, বুলুর মা বলল..
বুলু কে?
আমার মেয়ে। ঐ যার বিয়ে। বুলুর মা বলল, আপনাকে নাকি ঠিক মত আমি যত্ন করিনি। এক কাপ চা খেয়ে গেলেন না। আপনার মত দয়ালু, মহৎ লোক পৃথিবীতে আছে বলেই—
বাবর যোগ করল, পৃথিবী এখনো চলছে, তাই না?
জি? হতরন সাহেব যেন হকচাকিয়ে গেলেন।
বাবর বলল, আমি আপনার কথাটাই শেষ করে দিলাম–আমার মত মহৎ, দয়ালু, না দয়ালু আগে বলেছেন, দয়ালু, মহৎ লোক পৃথিবীতে আছে বলেই পৃথিবীটা এখনো আছে, চলছে।
জি।
হতরন সাহেবের ঢোক গেলার শব্দটা পর্যন্ত স্পষ্ট শুনতে পেল বাবর। তখন বলল, আসব। নাকি চা খেতে। বলুন তো আসি।
জি।
হতরন এবার সত্যি সত্যি বিমূঢ় হয়ে গেছেন। বাবরের খুব মজা লাগল তখন।
কি আসব?
আসবেন না কেন? সে তো আপনার অনুগ্রহ।
নাহ, এখন আসব না।
কেন, কেন?
এখন মাল খাচ্ছি।
জি!
মাল! মানে মাদ। হুইঙ্কি। খেয়েছেন কখনো?
জি, ওসব মানে আমি, আমার, আমি গোঁড়ামি পছন্দ করি না, তবে খাইনি কোনোদিন। খান আপনি খান। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম আপনার এই উপকারের কথা সারা জীবন মনে থাকবে। বলতে গেলে বাপের কাজ করলেন আপনি।
বাপের কাজ আর কাকে কাকে দিয়ে করালেন।
মানে?
বাবরের ভারি রাগ হলো লোকটার ওপর। চটছে না কেন? এখন যদি তাকে দুটো কড়া কথা শোনাত, টেলিফোন ঠাস করে রেখে দিত তাহলে বোঝা যেত তার পৌরুষ আছে। মানুষ এত ভীরু হয় কী করে? নিজেকে এতটা বিকিয়ে দেয় সে কীসের অভাবে? কীসের তাড়ায়?
কিছু না, কিছু না। বলল বাবর।
নইলে বুলুর মা খুব মাইণ্ড করবেন। আমাকে বারবার করে বলে দিয়েছেন।
দুস সাহেব। আপনার বৌ মাইণ্ড করবে। আস্তে বলুন। লোকে কী ভাববে।
জি।
যান, মাথা ঠাণ্ডা করে শুয়ে থাকুন গে। রোজার দিন।
জি।
কি, রোজা আছেন তো?
জি, আছি। থাকব না কেন?
পরকালের রসদ যোগাড় করছেন?
কী যে বলেন।
এ কালের রসদ তো অনেক হয়েছে কী বলেন।
জি?
না, কিছু না। আর শুনুন, আলতাফকে বলবেন না ঐ টাকার কথাটা।
জি না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, তাকে বলবই না। বলার কোনো সুযোগই হবে না। যে উপকার আপনি করলেন—
তার বিনিময়ে এই ঠাস করে রেখে দিলাম টেলিফোন-মনে মনে বলতে বলতে লাইন কেটে দিল বাবর। ওহ, কৃতজ্ঞতা! ল্যাজ থাকলে আদুরে কুত্তার মত তিরতির করে এখন নাড়াত হতরন। কুঁই কুঁই করত। আর পা শুঁকত। মানুষের আবার কত বড় কথা—আমরা পশু নই, মানুষ। বাবার তাকে টাকা দিয়ে নিজের জন্য আর একটা প্রমাণ সংগ্ৰহ করল, মূলত পশুর সঙ্গে মানুষের কোনো তফাৎ নেই। বরং মানুষ পশুরও অধম। এতক্ষণ একটা পশুকে খোঁচালেও সে থাবা বের করে দাঁত খিচিয়ে উঠত। আর হতরন বেমালুম সব হজম করে। গেল। মানুষ যে বুদ্ধি বিবেচনা রাখে! কত ধানে কত চাল হয় তার হিসেব বোঝে!–তাই।
