নাহ কিছু বুঝা যাচ্ছে না। চিঠির প্রত্যেকটি কথা মনে আছে তার। সে লিখেছিল হুবহু এই রকম, ইংরেজি থেকে বাংলায় তরজমা করলে দাঁড়ায়–প্ৰিয় জাহেদা, কয়েকদিন দেখা হয় না। এর মধ্যে এক কাণ্ড হয়েছে। সেদিন টুরিজম ডিপার্টমেন্টে গিয়েছিলাম। সেখানে রাস্তার মানচিত্র দেখে মনটা উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল। ভাবছি উত্তর বাংলায় গাড়ি করে বেড়াতে গেলে কেমন হয়? তুমি যদি যেতে চাও তাই লিখলাম। পরে যে বলবে, আগে জানলে যেতাম, কেন তোমাকে নিলাম না ইত্যাদি, সে সুযোগ দিতে আমি রাজি নই। তাড়াহুড়া নেই, যখন খুশি জানিও। ভাল থেকো। মন দিয়ে পড়াশুনা কোরো। আমি মেধাবী ছাত্রীদের পছন্দ করি। পরীক্ষার ফল ভাল করে আমাকে সে আনন্দ দিও। ইতি বাবর।
ইতির পরে তোমারই লিখতে গিয়েও লেখেনি। কেবল জাহেদাই যে যাবে আর কেউ যাবে না, তেমন কোনো অঙ্গীকারও কোনো শব্দে নেই। তবু এ রকম হলো কেন?
চমকে উঠল বাবর। পেছনে কয়েকটি অধীর হর্ণ বেজে চলেছে। কখন সবুজ হয়ে গেছে বাতি। আটকে রেখেছে। সবার পথ সে। রাগ হলো বাবরের। দেবে না সে পথ। ভাণ করল তার গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। বনাত খুলে মিছেমিছি দেখল। আর আড়াচোখে পেছনে সবার বিরক্তি আর পাশ কাটিয়ে বেরুবার পরিশ্রম লক্ষ করল— করে তৃপ্তি পেল সে। বোঝ, বোঝ। তারপর বাতি আবার লাল হবার আগেই লাফ দিয়ে গাড়িতে বসে বেরিয়ে গেল সমুখে।
০৮. সারা দুপুর সুরাপান
সারা দুপুর সুরাপান করল বাবর।
হাঃ হাঃ। তুমি কোথায় আছ? অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝখানে, যেখানে আগেও ছিলে, এখন আছ এবং পরেও থাকবে। তার এক বন্ধুকে প্ল্যান্টার্স পাঞ্চ খেতে দেখেছে মাঝে মাঝে। সে নিজে কোনোদিন চেষ্টা করেনি। কোন কোন সুরা মিশিয়ে করে তাও জানে না। গেলাশের নিচের দিকটা লালচে, ওপরে সোনালি–অস্বচ্ছ, দয়াহীন একটি পানীয় বলে ওটাকে তার মনে হয়েছে। আজ সে আনিয়ে চেখে দেখল এবং পছন্দ করল!
আবার আনাল একটা। মাথার ভেতরটা নিমিষে শূন্য হয়ে গেল যেন। মনে হলো ফেরেশতার মত জ্যোতির্ময় তার দেহ। আদিতে ইবলিসও তো ফেরেশতাই ছিলেন। না, যদি আমাকে পছদন করতে বভলা হয়, আমি হতে চাইব মিকাইল, বৃষ্টির ফেরেশতা, কিন্তু ইস্রাফিলের শিঙ্গা আমি চাই। ওটা আমার খুব পছন্দ। বাবর নিজেকে যেন দেখতে পেল ঘন কালো মেঘের অন্তহীন স্তরে জ্যোতির্ময় দেহে দাঁড়িয়ে আছে নগ্ন নিরাভরণ মিকাইলের শিঙ্গা হাতে। নিচে লাল কার্পেটে আচ্ছাদিত নীল দেয়ালে জানালাবিহীন এক বিশাল হলে মেয়েরা আসে যায় এবং মাইকেল এঞ্জেলোর গল্প করে। সেই ছবিটা কি মাইকেল এঞ্জেলোরই আঁকা? ঈশ্বরের প্রসারিত তর্জনী থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের হাত–ব্যগ্র একটি হাত। মাঝে সামান্য দূরত্ব কিন্তু কী অসীম, অলংঘনীয়; অনন্ত তো দেখা যায় না। কিন্তু দেখা গিয়েছে। এখানে। বিবৰ্ণ ব্ৰাউন একটি অনন্ত, ঈশ্বর ও মানুষের আঙুলের মাঝখানে।
সিগারেট কিনতে, প্রস্রাব করতে এবং বাইরের বাতাস নিতে বাবর বেরুল। সিগারেট কিনতে গিয়ে উল্টা দিকের কাউন্টারে দেখল সারি সারি প্রসাধনী সাজানো। মৃত সুন্দর সব শিশুদের বিয়োগ স্মরণে নির্মিত মিনারের মত দাঁড়িয়ে আছে লিপস্টিকের পেন্সিলগুলো। একটা থেকে আরেকটার দূরত্ব সুসম। এক উচ্চতা, এক বোধ, এক নিস্তব্ধতা। প্রত্যেকটির মাথায় ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার বৃত্তাকার বর্ণলেখ। সেই সব বর্ণে মৃত শিশুদের সহাস্য দুর্বোধ্য কাকলি প্রস্তরীভূত হয়ে আছে। দেখাতে বলল। যখন হাতে নিল তখন আর কিছু মনে হলো না। বাবর হাসল। এবং নিতান্ত চক্ষুলজ্জার খাতিরেই একটা কিনল।
তারপর এলো বাথরুমে। ঝাঁঝাল অনিশ্চিত একটা সুগন্ধ বাতাসে ঝকঝকে শাদা শাদা পাত্র ন্যাপথালিনের বল নিয়ে অপেক্ষা করছে। কোথায় যেন অপারেশন থিয়েটারের সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্য আছে। তেমনি যেন মৃত্যুকে স্মরণ করায়। নিঃসঙ্গ করে তোলে সহসা। বোতাম খুলে চোখ তুলে তাকিয়ে বাবর দেখতে পেল নিজেকে ঝকঝকে আয়নায়। সমস্ত মুখ ফোলা ফোলা লাগছে, মনে হচ্ছে দীর্ঘ একটা স্বপ্নহীন ঘুম থেকে এইমাত্র উঠেছে সে। গালে হতে দিয়ে দেখল। এরই মধ্যে কর্কশ হয়ে এসেছে, কালচে দেখাচ্ছে। গলার উপর হাত রেখে অনুভব করল সেখানে জীবন স্পন্দিত হচ্ছে টিপ টিপ করে। ঠোঁটের দুপাশে ময়লা জমে শুকিয়ে আছে। বাবর পকেটে হাত দিল রুমালের জন্য। রুমালের বদলে হাতে ঠেকল সদ্য কেনা লিপস্টিকটা।
বের করল সে। আস্তে আস্তে তার ক্যাপ খুলে নিচের চাকতি ঘুরিয়ে দিতেই মাথা উঁচু করে উঠল। লাল মাথাটা। ঘুমের মধ্যে প্রস্রাব পাওয়া শিশ্নের মত। কার্তিকের কুকুরের মত। লাল, দৃঢ়, মসৃণ, আলো ঠিকরাচ্ছে, যেন আমন্ত্রণ করছে। বাবর তার নিচের দিকে তাকাল। শেষ বিন্দুটা এখনো মাথায় জ্বলজ্বল করছে, এখনো যথেষ্ট হয়নি বলে পড়ছে না। বাবর একটা আলতো টোকা দিয়ে ফোটোটাকে ফেলে দিল এবং সেখানে ছোঁয়াল লিপস্টিকের লাল মাথা। সঙ্গে সঙ্গে একটা শিহরণে কুঞ্চিত হয়ে উঠল যেন তার সমস্ত স্নায়ু। দ্রুত হাতে সরিয়ে নিতেই দেখল। লাল দাগ পড়েছে। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল সে। বাবলির কথা মনে পড়ল। বাবলির ঠোঁটের রং ঠিক এই রকম–আবছা লাল।
চারদিকে তাকিয়ে দেখল বাবর। না, কেউ নেউ। কান পেতে শুনল। না কেউ আসছে না। দ্রুত হাতে আয়নার ওপর লিপস্টিক দিয়ে লিখল MAKE LOVE NOT VVAR তারপর পেছনে আরেকটা দরোজা খুলে কমোডের মধ্যে ফেলে দিল লিপস্টিকটা। চলে আসছিল, দেখে ক্যাপটা হাতেই রয়ে গেছে। সেটা আরেকটা কমোডে ফেলে দিল। সাদা পোর্সিলিনে লেগে টং করে শব্দ করে উঠল, যেন চমকে উঠল একটি নিস্তব্ধতা।
