বড় ক্লান্তি লাগছে। ঘুম পাচ্ছে বাবরের। মনে হচ্ছে, একটা দিন, একটা জীবন যেন অপচয়ে নিঃশেষ হয়ে গেল আজ। খুব ধীরে গাড়ি চালিয়ে সে পথের পর পথ অতিক্রম করতে লাগল। পেছনে যার তাড়া আছে তাকে পথ করে দিতে লাগল ক্ৰমাগত। যাও সবাই এগিয়ে যাও। কারণ যাওয়াই তোমরা জীবনের মোক্ষ বলে মনে কর। সবাইকে পেছনে ফেলে। এগিয়ে যাওয়া। সেই জন্যই পথ তোমরা ক্রমশ প্রশস্ত করে তৈরি কর, নইলে পালা জমবে কেন? কাউকে পেছনে ফেলে যেতে কী সুখ মানুষ নামক জন্তু না হলে উপলব্ধি করা যায় না।
দিই আটকে?
একটা সাদা ফুরফুরে গাড়ি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ তাকে খেলাবার ইচ্ছে হলো বাবরের। চট করে ডাইনে কেটে গতি শ্লথ করল সে। ঘ্যাঁস করে ব্রেক করল সাদা গাড়ি। ঘাড়ের পরে উঁচু করে বাঁধা খোঁপার নিচে এক মহিলা চালাচ্ছিলেন। বিপ্লক্তিতে ভ্রুকুটি করে তাকালেন তিনি বাবরের দিকে। ভ্রুকুটি বোঝা গেল তার কালো চশমার ওপরে ভ্রু যুগলের আকস্মিক উর্ধ্ব বিন্যাসে। বাবর হাঃ করে হেসে নিজের গাড়ি সরিয়ে নিল। মহিলাটি তীরের মত বেরিয়ে গেলেন পেছনে সাদা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে! সমাজে অনুচ্চার্য একটি কথা মনে হতেই বাবার টিপে আপন হাসি সংবরণ করল।
বাসায় এসে দেখল দরোজা খোলা, খোলা মানে ভেজান। তালা লাগান নেই। অথচ কতদিন সে বলে গিয়েছে তালা লাগিয়ে রাখতে।
মান্নান, মান্নান।
পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিল ব্যাট। ডাক শুনে চোখ ডলাতে ডলাতে এলো।
দরোজা খুলে ঘুমাচ্ছিস? কতদিন এক কথা বলব? কত দিন বলতে হবে?
স্যার–
ইডিয়েট! ফের যদি দরোজা খোলা দেখি পাঁচ টাকা জরিমানা করব। লাট সাহেব হয়েছ। লর্ড লিনলিথগো?
স্যার–মান্নান কী যেন বলতে চাইল।
চুপ! কোনো কথা শুনতে চাই না। আউট।
দরাম করে দরোজা লাগিয়ে ভেতরে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বাবর। ড্রইংরুমের চারদিকে পর্দা টানা। প্ৰায় সন্ধ্যার মত অন্ধকার। তেমনি শীতল। দেয়ালে ঝোলান মাটির তৈরি নিগ্রো মেয়েটার মাথা। টেলিভিশনের ওপর একটা তেলাপোকা স্থানু হয়ে আছে। লাইফ ম্যাগাজিনের খোলা পাতায় হাঁ করে বিকট গোলাপি মুখ দেখাচ্ছে এক শিম্পাঞ্জী। ড্রামের দুই বীটের মাঝখানে তুরিত স্তব্ধতার মত টানটান হয়ে আছে। সারাটা ঘর। বাবর একবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। চোখ বুজল। তারপর ক্লান্ত পায়ে ড্রইয়ং রুমের দৈর্ঘ্যটা কোণাকোণি পার হয়ে খাবার ঘরের পাশ দিয়ে জাল ঢাকা করিডোর অতিক্রম করে শোবার দরোজায় ঠেলা দিল।
নিভাঁজ বিছানা কোল বাড়িয়ে ডাকল তাকে। এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে দেখল সে। ছবির মত সাজানো বালিশ, চাদরের হালকা নকসা, পায়ের কাছে সরু কার্পেটের কোমলতা, পাশে পরিষ্কার ছাইদানি, ঘাড় নামানো পড়ার বাতি।
উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল বাবর পায়ে-পায়ে মোকাসিন জোড়া খুলে ফেলতে ফেলতে। মুখ গুঁজে পড়ে থাকল ঠাণ্ডা পাউডার নীল বালিশের ওপর। উপলব্ধি করতে পারল, কী উত্তপ্ত হয়েছিল তার সারা দেহ এতক্ষণ। মুখ আরো গুঁজে দিয়ে, মায়ের কোলে শিশুর মত মাথা ঘষতে ঘষতে সে কয়েকটা অব্যয় ধ্বনি সৃষ্টি করল। তখন আরো ভাল লাগল। সে ঘুমে উচ্চারিত ছড়ার মত বলে যেতে লাগল–আহ, ইস, ইস, ইস।
মোজা জোড়া বড্ড অস্বস্তিকর লাগল তার পায়ে। সে মোজা খোলার জন্যে পাশ ফিরে হঠাৎ দরোজার দিকে চোখ পড়তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। এক হাত রইল তার গুটিয়ে আনা পায়ের পাতায়, আরেক হাত পাঁজরের নিচে। ঠোঁট ফাঁক হয়ে এলো কিছু বলার জন্যে কিন্তু বলতে পারল না। কুয়াশার মধ্যে সূর্যোদয়ের মত সেখানে ফুটে উঠতে লাগল, ধীরে, অতি ধীরে একখণ্ড চাপা হাসির আলো।
দরোজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে জাহেদা। জাফরান রংয়ের পাজামা পরনে। গায়ে সাদার ওপরে বড় বড় জাফরান সূর্যমুখী জামা। চোখে একটা ভয়।
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। একটা শ্লথ বিদ্যুৎ যেন এর চোখ থেকে ওর চোখে ক্ৰমাগত ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে লাগল। কিম্বা একটি প্রজাপতি, বাগানে যে কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, কোন ফুলে বসবে।
বাবার উঠে বসল। বলল, তুমি? তুমি কখন?
বাবার উঠে গিয়ে জাহেদার কাঁধ স্পর্শ করে বলল, কখন এলে?
তাকে হাত ধরে বিছানার পাশে লাল চামড়ায় ঢাকা মোড়ার ওপর বসিয়ে, নিজে বিছানায় বসে, আবার বলল, কতক্ষণ এসেছ?
এই প্রথম জাহেদকে সে স্পর্শ করেছে। এখন মনে হচ্ছে জাহেদার এক মুঠো রেণু তার আঙুলে জড়িয়ে গেছে। বাবর আঙুলগুলো একটার ডগায় আরেকটা তখন অনবরত ছোঁয়াতে লাগত।
জাহেদা বলল, সকালে।
সকালে এসেছ? আমি যে তোমার কলেজে গিয়েছিলাম।
আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে। নইলে সিসটার খোঁজ করবেন।
কী ব্যাপার?
পাঁচটার পর সিসটার ঘরে ঘরে দেখে যে।
তা নয়। আমি ভাবতেই পারিনি তুমি আসবে।
এলাম।
দুপুরে খাওনি?
না।
এ ভারি অন্যায়। মান্নানকে বললেই পারতে। বলা উচিত ছিল তোমার। কেন বলনি?
ও বলল আপনি আসবেন, এক্ষুণি আসবেন।
আমি খুব লজ্জিত, দুঃখিত। একটু খবর দিয়ে আসতে হয় না?
জাহেদা চুপ করে রইল। তারপর বলল, ফ্ৰীজ থেকে একটা কোকাকোলা খেয়েছি।
যাহ, শুধু ঐ খেয়ে দুপুর কাটায় নাকি? আমি এক্ষুণি ব্যবস্থা করছি। এক মিনিট।
না, না, আমি এখন যাব।
অসম্ভব। আগে খাবে, তারপর।
না, যেতে হবে যে!
তাহলে চল, কোথাও বসে খাই।
বাইরে যাব না।
সেই তো বলছি। মান্নান এক্ষুণি পরোটা বানিয়ে দেবে। ওমলেট দিয়ে খাও। আচ্ছা, স্যাণ্ডউইচ। কোন্ড বীফ আছে। আমি নিজে করে দিচ্ছি।
