অবলীলাক্রমে বাবর বলল, আংকল।
মায়ের দিক থেকে না বাবার দিক থেকে?
মায়ের দিকে। বাংলা আমরা বলি মামা। বলে বাবর একটা বিগলিত বিশুদ্ধ হাসি দান করল সিসটারকে।
তিনি আবার জিগ্যেস করলেন, ভিজিটার্স বুকে আপনার নাম আছে?
কী বিটকেল সিসটার রে বাবা। একেবারে শকুন মার্কা। বাবর হাসির নির্মলতা আরো কয়েকমাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে জবাব দিল, বুকে নাম না থাকবারই কথা ম্যাডাম। আসলে আমি কয়েক মাস হলো ঢাকায় এসেছি। এর আগে করাচিতে থাকতাম। জাহেদার মা আমি পিঠেপিঠি ভাই বোন। অনেকদিন জাহেদাকে দেখি না। কেমন আছে ও?
তাল আছে। আমাদের এখানে কেউ খারাপ থাকে না।
তা বটে। তা বটে।
কিন্তু আপনার চেহারা খুব চেনা ঠেকছে।
এই রে সেরেছে। নিশ্চয়ই বুড়ি তাকে আগেও এখানে আসতে দেখেছে। করাচি থেকে সদ্য আসার মিথ্যেটা ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু বাবর জানে কী করে ফাঁদ থেকে বেরুতে হয়। সে মাথা ঝাঁকিয়ে স্বীকার করল অনেকেই এই কথা বলেন। আসলে ব্যাপার কী জানেন, আমি টেলিভিশনে কাজ করি তো তাই।
ও আপনি টিভিতে কাজ করেন? কী আনন্দজনক সাক্ষাৎ। খুব প্রীত হলাম। জাহেদা তো কোনোদিন বলেনি। তার মামা টিভিতে আছে।
কী জানি। দেখা পাব ওর?
ওর বলা উচিত ছিল।
সিসটার হাঁটতে শুরু করলেন শান বাঁধান লন চেরা পথ দিয়ে। বাবর পিছনে হাত যুক্ত করে বিনীত ভঙ্গিতে হাটতে লাগল তার পাশে।
ওর অবশ্যই বলা উচিত ছিল। আপনি হয়ত জানেন না, আমরা আমাদের কলেজে প্রতি মাসের শেষ শনিবার একটি করে সভার আয়োজন করি।
উত্তম করেন।
সে সভায় বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় একজন করে নিমন্ত্রিত হন। তিনি মেয়েদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন। এতে বাইরের জগৎ সম্পর্কে মেয়েদের একটা প্রত্যক্ষ জ্ঞান হয়। তাদের নতুন নতুন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ সঞ্চার হয়।
অবশ্যই। এ এক চমৎকার ব্যবস্থা।
জাহেদা যদি বলত, আপনাকেও একদিন ডাকতাম বক্তৃতা করতে।
আপনি আমাকে এখনো বাধিত করতে পারেন।
বাবর সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইল না, শিকারী কুকুরের মত পেট সরু করে সে তাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। কে জানে কী থেকে কী হয়।
ঐ যে, ল্যাজে ল্যাজে জোড়া দিয়ে বর্ধমান যাওয়া।
সিসটার ঘুরে দাঁড়ালেন।
দয়া করে একটা বক্তৃতা দেবেন?
আপনাদের আদেশের শুধু অপেক্ষা।
আমি চাই আপনার কাছ থেকে মেয়েরা জানুক, কীভাবে জনতার সামনে দাঁড়াতে হয়, কথা বলতে হয়, টিভি মাধ্যম হিসেবে কতটুকু উপযোগী, এই সব। সানন্দে তা জানাতে চেষ্টা করব।
আপনার ঠিকানা?
এই যে।
বাবর পকেট থেকে কার্ড বের করে দিল। বলল, এটা আমার ব্যবসার কাজে লাগে। বেঁচে থাকার, এই মর দেহটার সামান্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে ব্যবসা করতে হয়। ব্যবসা আমার মৃত্যু, শিল্প আমার জীবন।
কী সুন্দর কথা। সামনের মাসের পরের মাসেই হয়ত আমরা আপনাকে ডাকতে পারি।
আমি অবশ্যই সময় করব।
আপনি জাহেদার সঙ্গে দেখা করতে চান?
একবার দেখা হলে ভাল হতো। দরকার ছিল।
আসলে আমাদের নিয়ম কী জানেন? বুকে নাম না থাকলে এবং নিকট আত্মীয় যদি না হন তাহলে প্রিন্সিপ্যালের কাছে দরখাস্ত করতে হয়। তিনি সন্তুষ্ট হলে কেবলমাত্র একবার সাক্ষাতের অনুমতি দিতে পারেন। তবে আপনার জন্যে—
না থাক। আমার জন্যে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভাঙ্গা হোক চাই না। এটি শিক্ষামন্দির। এর নিয়ম কানুন বড়রাই যদি না মানি কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই বা কেন মানবে?
এক জাহেদার জন্যে বক্তৃতার সুযোগ নষ্ট করতে চায় না বাবর। বক্তৃতায় আরো কত নতুন জাহেদার সঙ্গে আলাপ হবে। এখন বরং নিয়মনিষ্ঠ তরুণদের জন্যে উৎকণ্ঠিত একজন প্রৌঢ়ের অভিনয় করাই সুবিবেচনার কাজ। এতে মানমীয়া ভদ্রমহিলার চোখে তার মর্যাদা বাড়বে। চাই কী হয়ত সামনের মাসেই তাকে বক্তৃতা করতে ডাকবেন।
বাবর আরো যোগ করল, আমাদের পয়গম্বর বলেছেন, যা নিজে করতে পার না, তা অপরকে উপদেশ করবে না।
মূল্যবান কথা।
অতএব থাক। আপনি জাহেদাকে বলবেন, আমি এসেছিলাম। পরে একদিন দরখাস্ত করেই দেখা করব। বিদায় দিন।
চোর-দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো বাবর। হাসল। সিসটার জানে না, দরখাস্ত ছাড়াই তার মেয়েরা কত দেখা করছে। সে নিজেও কতবার এসেছে। আজ প্রথম মুখোমুখি হয়ে গোল বলে! তবে শিক্ষা-মন্দির কথাটা বলেছে। যুৎসই। নিজেকেই বড় রকমের প্রশংসা করতে ইচ্ছে করল তার। বক্তৃতা দেবার জন্যে এখনিই তার জিভে চুলচুল করতে শুরু করে দিয়েছে।
সেই ঝোঁকে বেশ কিছুদূর হাওয়ায় ভেসে গেল বাবর। পাক মোটর্সের ক্রসিংয়ে দপ করে লাল বাতি জ্বলে উঠল। যেন হোঁচট খেল সে। হঠাৎ মনে হলো সিসটারের সঙ্গে আলাপ করতে করতে কলেজের ভেতরে অনেক দূর চলে গিয়েছিল, অনেকক্ষণ ছিল। জাহেদা কি একবারও তাকে দেখেনি? দেখতে পায়নি? কোনো ক্লাশ, কোনো কামরা, কোনো বারান্দা থেকে? আর তার নিজেরও যে কী হয়েছিল, চারদিকে একবারও সে তাকিয়ে দেখেনি। আসলে ঐ বক্তৃতার প্রস্তাবটাই সব মাটি করেছে।
বোধ হয় জাহেদা ইচ্ছে করেই তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। হয়ত বাবলিকে সে-ই চিঠিটা দেখিয়েছে। কেন এড়িয়ে যাচ্ছে? কেন দেখিয়েছে? দেখিয়েছে? জাহেদাকে তো আজ পর্যন্ত সে ছুঁয়েও দেখেনি। শুধু কথা বলেছে। তাও শুধু সিনেমা, ফ্যাশন আর চেনা মানুষদের নিয়ে। কোনো ইঙ্গিত নয়, কোনো আমন্ত্রণ নয়, কিছু নয়। আর জাহেদার বয়স এমন কিছু নয় যে বাবরের মনে কী আছে তা বোঝার ক্ষমতা তার হয়েছে। চিঠিতে কিছু ছিল? বাবলি কেন চিঠিটা পড়ে এমন হিংসুটে হয়ে উঠল?
