মিসেস নাফিস তাকে বলেছিল, আপনি ও রকম হাসেন কেন?
কই, নাতো।
আপনি হয়ত লক্ষ করেননি। ভালই দেখায়।
কথাটা শোনার পর থেকে কয়েকদিন চেষ্টা করেছিল বাবর হাসিটাকে সংযত করতে। বদলে আরো বেড়েছে। এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে সে। আবার হাসল। কিনল বইটা। বলল সুন্দর একটা প্যাকেট করে দিন।
উপহার দেবেন?
হ্যাঁ।
কিন্তু ব্ৰাউন প্যাকেট ছাড়া যে নেই। সরি স্যার।
ঠিক আছে। খোলা থাক।
বইটা নিয়ে সোজা বেরিয়ে গেল।
সুলতানা বলল, আরে আপনি? কী মনে করে? হঠাৎ?
এই এলাম।
ও তো অফিসে গেছে।
জানি। বাবলিও তো কলেজে?
হ্যাঁ। বসবেন না?
না। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেদিন বাবলি বলছিল ভিয়েতনাম সম্পর্কে খুব ইন্টারেস্টেড। জানতে চায়। এই বইটা ওকে দেবেন।
আচ্ছা।
আর বলবেন, ফেরত দিতে হবে না। ওকে দিলাম।
পেলে খুব খুশি হবে। এক কাপ চা দিই?
না দিলেই বাধিত করবেন।
সুলতানা ভেঙ্গে পড়ল। হাসিতে। বলল, কথা শিখেছেন বটে! আচ্ছা বাবলি এলেই বইটা দেব।
দেবেন। চলি। আবার আসব। এসে অনেকক্ষণ গল্প করব। চলি তাহলে।
গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে বাবর তাকিয়ে দেখল পর্দা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সুলতানা। গালের এক পাশে রোদ এসে পড়েছে ছোট্ট একটা চৌকো বিস্কুটের মত। তেমনি সুস্বাদু দেখাচ্ছে। সুলতানা মন্দ নয় দেখতে। আরেকবার তাকে দেখল বাবর এবং চোখে পড়তে পড়তে বিদায়ের হাসি ফুটিয়ে তুলল। যেতে যেতে মনে পড়ল বাবলিদের ঘরে একটা বড় ছবি আছে। সেখানে গালে গাল ঠেকিয়ে হাসছে সুলতানা আর বাবলি। বাবলিকে যদি চুমো দিয়ে থাকি তাহলে তা সুলতানার গালেই দেয়া হলো। ল্যাজে ল্যাজে জোড়া দিয়ে বর্ধমান যাওয়া আর কী? না, হাসি নয়। ল্যাজে ল্যাজে জোড়া দিয়েই কত কী হয়ে গেল। লতিফাকে চিনল তো ঐ করে। জাহেদাকেও। ম্যাজিকের বাক্সের মত। একটার পেট থেকে আরেকটা। শেষ নেই। অনন্ত। এক মেয়ের মারফত আরেক মেয়ে। এক মেয়ে থেকে আরেক মেয়েতে।
একেক সময় বাবরের মনে হয় আসলে ওদের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। জাহেদা, বাবলি, লতিফা, টুনি, রিক্তা, জলি, পপি, সুষমা, মমতাজ, আয়েশা, ডেইজি-সব এক। এক মাপে এক ছাচে, এক রংয়ে বানানো। পেছন থেকে কতদিন সে একজনকে আরেকজন মনে করেছে। চুলের সেই একই বিন্যাস, কাপড়ের সেই একই নকশা, কথার সেই একই ঢং। এমনকি যাদের সঙ্গে তার কখনও আলাপ হয়নি, পথে ঘাটে ভিড়ে, বাজারে দেখা, তারাও ঐ ওদের মত। ওদের ভাবনাগুলোও যেন এক। এক তাদের প্রতিক্রিয়া। এক তাদের পছন্দ।
কেবল একটা তফাৎ আছে। খোলা গায়ের গন্ধটা। কারো গায়ে লেবুর গন্ধ। কারো গায়ে দৈয়ের। খবর কাগজের। বন্ধ সবুজ পানির। মিষ্টি কফি-সিরাপের। পনিরের। কী করে যে ঐ বিচিত্র বিভিন্ন বস্তুর গন্ধ যে ওরা সংগ্রহ করেছে কে জানে। রিক্তার পিঠে মুখ রাখলেই তার মনে হতো। সদ্য খোলা খবরের কাগজে সকাল বেলা নাক ড়ুবিয়ে আছে সে। জিগ্যেসও করেছিল, কাগজে গড়াগড়ি দিয়ে এসেছ নাকি?
না, নাতো। কেন বল তো।
এমনি।
কী যে সব অদ্ভুত কথা। খবর কাগজ! হি হি হি।
আয়েশাকে সে বলেছিল, আজ নিশ্চয়ই দৈ খেয়েছ।
কী যে বলেন। দৈ আমি কবে খাই? দৈ খেলেই আমার গায়ে চাকা চাকা দাগ হয়।
কিন্তু দৈায়ের গন্ধ পাচ্ছি যে।
তাহলে আপনি খেয়েছেন।
আজ অন্তত বছরখানেক দৈ খাওয়া দূরে থাক, চোখে দেখিনি। সত্যি দৈায়ের গন্ধ পাচ্ছি।
যান ঠাট্টা ভাল লাগে না।
আয়েশা খুব রাগ করেছিল। আয়েশা এখন কোথায়? গেল বছর খুলনা থেকে একটা চিঠি দিয়েছিল, তারপর চুপ? একবার গেলে হতো খুলনায়। নিশ্চয়ই জাঁদরেল একটা গিনী হয়েছে আয়েশা। স্বামীকে একেবারে নখে করে রেখেছে। মেয়েদের এক উচ্চাশা স্বামীকে নখের ডগায় রাখা আর পরপুরুষকে পায়ের তলায়।
যা খেলে যা।
আরেক বার যাবে জাহেদার কলেজে?
এবার কেমন যেন একটু সংকোচ হতে লাগল তার। ব্যাটা দারোয়ানটা লম্বা লম্বা সালাম দেয়। ঘুঘুর মত চোখ রাখে। গলায় আবার একটা রূপের ক্রুশ। যিশু হে, তোমার দুঃখ আমি অঙ্গে ধারণ করে এই পাপের পৃথিবীতে মৃত্যুর আশায় বসে আছি–এই রকম একটা নির্মীলিত ভাব।
আচ্ছা, এই শেষবার যাওয়া যাক। না পেলে তখন আবার ভাবা যাবে। বাবর উলটো দিকে গাড়ি ঘোরাল কলেজের উদ্দেশে।
দারোয়ান নেই। গাড়িটা পথের উপর রাখল বাবর। তারপর ধীরে ধীরে ফটকের কাছে গেল। ফটকটাও বন্ধ। শুধু পেটের কাছে চোরদরোজার পাল্লাটা কুকুরের জিভের মত ঝুলে আছে। ঢুকবে?
বাবর অতি কষ্টে চোর-দরোজার ভেতর দিয়ে নিজেকে চালান করে ওপারে নিয়ে গেল। মেরুদণ্ড খাড়া করতেই মুখোমুখি হয়ে গেল এক সহাস্য শুভ্ৰবসনা সিসটারের।
ইয়েস? কী প্রয়োজন?
মাননীয় ভদ্র মহিলা কী এক কৌশলে চোখে ভ্রুকুটি এবং ঠোঁটে হাসি একই সঙ্গে সৃষ্টি করে জিগ্যেস করলেন। এঁরা আবার কিছু কিছু বাংলাও জানেন। বাবর এক মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিল–বাংলায় জবাব দেবে না।
সে তার সবচে মার্জিত ইংরেজি বের করে বলল, প্রয়োজন খুবই সামান্য। আমি আপনারই একজন ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই।
সিসটারও এবার ইংরেজিতে শুরু করলেন।
কে সে?
নাম বললে চিনবেন?
এখানে আমাদের সব মেয়েকেই চিনি। চোর-দরোজা দিয়ে ঢুকে এখন পিঠটা টনটন করছে। বাবর বাঁ হাতে একবার বহু সহস্র বছর আগে খোয়ান ল্যাজের শূন্যস্থলে টিপে ধরে বলল, জাহেদা।
ও জাহেদা? বি.এ সেকেন্ড ইয়ার? হোস্টেলে থাকে?
হ্যাঁ। সেই বটে।
আপনি তার কে হন জানতে পারি?
