আবার সব ফাঁকা হয়ে গেল। মেয়েরা আবার তাদের পরের ক্লাশে গিয়ে বসল। আবার শুধু রইল সে। তার সিগারেট আর কাঠবাদাম গাছটা। ছেলেবেলার মত আবার একা হয়ে গেল সে।
সে না হয় জাহেদাকে দেখতে পায়নি। জাহেদাও কি তাকে দেখেনি? দেখে এগিয়ে এলো না কেন? রাগ হলো তার। ক্রমশ এই বিশ্বাসটা হতে লাগল যে, জাহেদা তাকে দেখেও কাছে আসেনি।
তখন আর বসে থাকা গেল না। চাপা আক্রেনশটাকে প্ৰচণ্ড গতিতে রূপান্তরিত করে সে বেরিয়ে গোল কলেজ থেকে। শুনুক জাহেদা তার গাড়ির শব্দ, শুনুক ক্লাশে বসে থেকে। জাহেদা তার গাড়ির শব্দ চেনে। কতদিন এমন হয়েছে হোস্টেলে গাড়ি রাখতে না রাখতেই ছুটে এসেছে সে।
আপনার গাড়ির আওয়াজ পেলাম।
পৃথিবীর সমস্ত শব্দ শহরের এই বিভিন্ন গ্রামের কোলাহল সমুহ এখন ছাপিয়ে উঠুক। তার গাড়ির শব্দ, বধির করে দিক যে দেখেও কাছে আসে না, বইয়ের পাতায় চোখ রেখে যে নিস্তব্ধ ক্লাশে বসে থাকে এবং নীল জামা পরে চিত্ত হরণ করে।
খেলে যা, খেলারাম খেলে যা।
আপিসে এলো বাবর। এয়ারকন্ডিশন করা নিজের কামরায় ঢুকতেই শরীরটা যেন স্বচ্ছন্দ ঝরঝরে হয়ে গেল, তার ভারি আরাম বোধ হলো। চুপ করে বসে রইল। কিছুক্ষণ। তারপর কফি বানাতে বলল।
কোনো টেলিফোন?
না।
কেউ এসেছিল?
না।
ডকুমেন্টগুলো সব ফটোস্ট্যাট করা হয়ে গেছে?
জি।
একতাড়া ডকুমেন্টের ফটো-নকল নিয়ে এলো রহমান। প্রত্যেকটা ভাল করে দেখল। তারপর নিজ হাতে আলমারিতে বন্ধ করে রাখল। জিগ্যেস করল, আলতাফ একটা করে কপি নিয়ে গেছে তো?
হ্যাঁ স্যার, আমি নিজে অ্যাটাচিতে তুলে দিয়েছি।
আজকের কাগজগুলো দিন।
কফি খেতে খেতে প্ৰত্যেকটা কাগজ দেখল বাবর। কাগজ দেখা মানে দেশ বিদেশের খবর দেখা। ওটা দ্বিতীয় কিম্বা তৃতীয় পর্যায়ের জিনিস। প্রথমে সে দেখে দুয়ের পাতায় টেন্ডারের বিজ্ঞাপন। কোথায় সরকারি বেসরকারি কে কোন কাজ করতে চাইছে, কোন যন্ত্র চাইছে, কোন নির্মাণের জন্যে আহবান জানিয়েছে।
না, আজ কিছু নেই। কাগজগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝের ওপর। পিয়নকে ডেকে বলল, টেবল এত এলোমেলো থাকে কেন? লাল নীল পেন্সিল নেই কেন? পেন্সিল কাটা হয়নি। কেন? পেপার ওয়েট উপুড় হয়ে আছে কেন? কেন? কেন? কেন?
নিঃশব্দে বেয়ারা সব ঠিক করতে থাকে, ত্ৰস্ত হাতে সাজায় গোছায়, পেন্সিলগুলো সরু করতে নিয়ে যায় কম্পিত হাতে।
বাবর উঠে পায়চারি করে। একবার জানালার কাছে। স্বচ্ছ শাদা পর্দার ভেতর দিয়ে নিচে রাজপথ দেখা যাচ্ছে। হারমোনিয়ামের চাবির মত দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি গাড়ি। এত ওপর থেকে পেট্রল পাম্পটাকে মনে হচ্ছে অতিকায় একটা লিপস্টিক। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলে বাবর।
জাহেদা কি তাকে দেখেনি। কাঠবাদামের গাছটার নিচে দাঁড়ালে কলেজের যে কোনো কোণ থেকেই চোখে পড়ার কথা। কিম্বা নাও পড়তে পারে। হয়ত জাহেদা লাইব্রেরীতে গেছে। কমনরুমে আছে। অথবা বান্ধবীদের সাথে টুক করে বেরিয়ে চীনে দোকানে এসেছে খাবার খেতে। চায়নিজ খেতে ভারি ভালবাসে জাহেদা।
কথাটা মনে হবার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল একটা তাগিদ অনুভব করল বাবর সেই রেস্তোরাঁয় যাবার জন্যে। বেরুতে যাবে এমন সময় বেজে উঠল টেলিফোন।
হ্যালো।
বাবার সাহেব?
বিরক্ত হলো বাবর। ব্যাটা হতরন আবার টেলিফোন করতে গেল কেন? তাকে তো তার মেয়ের গহনার দরুন টাকা দেওয়াই হয়েছে।
সরি, বাবার সাহেব নেই।
তবে যে এর আগে যিনি ধরছিলেন তিনি বললেন আছেন।
ছিলেন, বেরিয়ে গেছেন।
কখন আসবেন?
জানি না।
বাসার নম্বর কত?
বাবর ঠাস করে টেলিফোন রেখে দিল। কামরার বাইরে এসে রহমানকে বলল, লাইন দেবার আগে শুনে নিতে পারেন না আমার কাছে?
সারা উনি তো—
আমি জানি উনি কে। উনি হলেই লাইন দিতে হবে কোনো মানে নেই।
আচ্ছা স্যার।
বাবর বেরিয়ে গেল। রহমান কী করে জানবে ভেতরে কত কী হয়ে গেছে। হতরন এখন আর তাদের কোনো কাজেই আসবে না।
লিফটে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেকে ভাল করে দেখে নিল বাবর। মাথার বাঁ পাশে চুল সরে গিয়ে এক চিলতে টাকি বেরিয়ে পড়েছে। হাত দিয়ে টেনে দেবার চেষ্টা করল। ফলে আরো ফাঁক হয়ে গেল। হেয়ার স্প্রে ব্যবহার করার দোষই এই। চুল ভারি হয়ে যায়। কবার ফাটল ধরলে আর রোধ করা যায় না। ক্রমশ বাড়তেই থাকে। আর স্প্রে না দেয়া পর্যন্ত এই অবস্থা। বাসায় যাবে? কিন্তু জাহেদা যদি চায়নিজ থেকেও বেরিয়ে যায়?
বাবর উর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি চালিয়ে রেস্তোরাঁয় এসে ঢুকল। না, নেই। ফ্যামিলি রুমে উঁকি দিয়েই বুকটা হিম হয়ে গেল তার। নীল কামিজ পরে জাহেদা বসে আছে। এক পা এগুল। তখন পেছন ফিরে দেখল মেয়েটা। উঃ, কী বীভৎস চেহারা। ঈশ্বর তুমি এখনো আছ স্বীকার করি। পেছনটা অবিকল জাহেদার মত দেখতে।
যাবার উদ্যোগ করতেই বাটলার সসম্ভমে জিগ্যেস করল, বসবেন না স্যার?
না। পরে কখনো।
একবার ভাবল তাকে জিগ্যেস করে, এই রকম বর্ণনার কোনো মেয়ে আরো কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে এসেছিল কি-না। পরে অন্য রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে আর থামল না। সোজা গাড়িতে বসে দম নিল। সিগারেটও ফুরিয়ে গেছে।
কন্টিনেন্টালে সিগারেট কিনতে গিয়ে চোখে পড়ল একটা বই। এর আগেও বহুদিন চোখে পড়েছে। আজ যেন বিশেষভাবে পড়ল। বইটার নাম যুদ্ধ নয় প্ৰেম : জ্বলন্ত ভিয়েতনাম। ঘন কালো চকচকে প্রচ্ছদে গাঢ় লাল রংয়ে লেখা MAKE LOVE NOT WAR–শেষ শব্দটা অজস্র খণ্ডে খণ্ডিত। হাসল বাবর, যেমন সে মাঝে মাঝেই হাসে, একা হাসে।
