রুটির ওপর পুরু করে মাখন লাগাল বাবর। আবার সন্তৰ্পণে সমস্ত মাখন চেছে তুলে ফেলল। এমনিতেই মোটা হয়ে যাচ্ছে সে। এত মাখন খাওয়া কাজের কথা নয়। পোচ করা ডিম দুটিকে মনে হলো যেন কোনো সৰ্পনারীর স্তনযুগল। বাবর কাটার আঘাতে তা ভাঙলো। গড়িয়ে পড়ল গাঢ় হলুদ রস, যেন এক জণ্ডিস রোগাক্রান্ত মানুষের বীর্য যা শীতল রক্ত মানুষের জন্ম দেবে।
এই উপমাটা আলতাফকে একদিন সে নাশতা খেতে খেতে বলেছিল। তারপর থেকে সপ্তাহখানেক নাকি আর আলতাফ ডিমের পোচ মুখে তুলতে পারেনি।
আলতাফ বলেছিল, তোমার একটা বড় দোষ কি জান? তুমি সেক্স ছাড়া কিছুই ভাবতে পার না। সৰ্বক্ষণ ঐ এক কথা ভাবছি, সব কিছুতেই ঐ এক জিনিস দেখছ।
কেন নয়? মানুষের জীবনে বড় সত্য কী বল?
আলতাফ বলেছিল, তুমি বল।
আসলে আলতাফ অতশত বোঝে না। হিসেবটা বোঝে। আসবাব-পত্রের শখ আছে। আর মা বলতে অজ্ঞান।
বাবর বলেছিল জীবনে একটা ঘটনাই সত্য। তা হচ্ছে মৃত্যু।
বলে যাও।
মৃত্যু কীসে সম্ভব?
সব কিছুতেই। অসুখে-বিসুখে, ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে আত্মহত্যায়, আর কত কিছুতে।
আমি তা বলছি না। মূলত মৃত্যু দুপ্রকারে আসতে পারে। এক ক্ষুধায়। আর এই কাজটা যাকে ভাল বাংলায় যৌনসঙ্গম বলে, তার অভাবে।
ক্ষুধায় না হয় মানুষ মরে স্বীকার করি, কিন্তু ঐ কাজ না করলে মানুষ মরবো কেন? বহু চিরকুমার আছে। পথে ঘাটে।
আমি ব্যক্তিবিশেষের কথা বলছি না। মনে কর যদি কোনোক্রমে আজ গোটা মানুষের মধ্যে যৌনসঙ্গম বন্ধ করে দেয়া যায়, তাহলে? নতুন মানুষ জন্মাবে না। এক পুরুষ পরে পৃথিবীতে মানুষ নামে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব থাকবে না।
তোমার সব অদ্ভুত কথা।
অদ্ভুত শোনালেও অবাস্তব নয়। আমি বলছিলাম ক্ষুধা আর যৌনজীবন মানুষকে যুগ থেকে যুগ বংশ থেকে বংশ আবিষ্কার থেকে আবিষ্কারে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার দুটি শক্তির নাম। এ ছাড়া তৃতীয় কোনো শক্তি নেই। আমি যেমন ক্ষুধাকে জয় করবার জন্যে কাজ করছি, তেমনি ঐ দ্বিতীয়টার জন্যেও সময় দিচ্ছি।
বাবর পয়সা দিয়ে বেরিয়ে এলো।
আহার্যে সে আজকাল আর আগের মত স্বাদ পায় না। ক্ষুধা হয়। কিন্তু খেতে ইচ্ছে করে না। খেতে বসে কিন্তু ডিশ পছন্দ হয় না। আগে কত অল্প সময়ে মেনু দেখে বলে দিতে পারতএইটে খাবে। এখন মেনু নিয়ে দীর্ঘ সময় কেটে যায়, মনস্থির করা যায় না। আগে এমন হতো ক্ষুধা বোধ হবার মুহূর্ত থেকে স্পষ্ট দেখতে পেত, চোখের সমুখে খাদ্যের ছবি। কল্পনায় উত্তপ্ত সুঘ্রাণ এসে নাকে লগত তার। এমনকি পরিবেশটাও ভেসে উঠত চোখেটেবিল, সাদা চাদর, সবুজ ন্যাপকিন, ঝকঝকে প্লেট, বুদবুদ জড়ান ঠাণ্ডা পানি। এখন সেই প্রখর মনটা আর নেই। কোনো রেস্তোরাঁই পছন্দ হয় না তার। কোনো সার্ভিসই যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক বলে মনে হয় না। বকশিস দেয়াটা বাহুল্য বোধ হয়। এখন সে মাত্র একটি সিকি বকশিস করেছে।
আবার সে এলো জাহেদার হোস্টেলে। দারোয়ান তাকে দেখে এগিয়ে এলো। বলল, আপা এখনো ফেরেনি।
আমি জানি।
হোস্টেলের সঙ্গেই কলেজ। বাবর গাড়ি ভেতরে ঢুকিয়ে কলেজের মাঠে গিয়ে থামল। এই কাঠবাদাম গাছটা তার ভারি পছন্দ। কেমন শান্ত, সহনশীল, শীতল, ছেলেবেলার বন্ধুর মত। বাবর একটা সিগারেট ধরাল। তাকিয়ে রইল অজস্র সচ্ছল ডালপালার দিকে। আলতাফ রাওয়ালপিণ্ডি থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত কোনো কাজ নেই। পিণ্ডি থেকে কাজ ঠিক মত গুছিয়ে আনতে পারবে কি-না ও, তাই বাঁ কে জানে। বরং সে নিজে গেলেই পারত। কিন্তু যাতায়াতটা বেশি পছন্দ করে আলতাফ, হোটেলে থাকা, ট্যাকসিতে করে ছুটোছুটি করা ফেরার সময় বাড়ির জন্যে জিনিসপত্র কেনা। বাবরের জন্য গতবার ও সুন্দর একটা স্কাফ এনেছিল। লাল জমিনের ওপর সবুজ কলকে তোলা। ঠিক এই বাদাম গাছটার মত সবুজ। আর সবচে বিস্ময়কর যে, কোনো গাছে এক মাত্রার সবুজ থাকে না, অসংখ্য মাত্রার সবুজ মিলে একটা বর্ণের সৃষ্টি হয়। কাছে এলে, একটা একটা করে পাতা লক্ষ করলে তবে বোঝা যায় প্রকৃতির এই কারিগরিটা। এদিক থেকে মানুষের সঙ্গে একটা আশ্চর্য মিল আছে। অমিলও কি নেই? কাছে এলেও মানুষের সব রং তো চোখে পড়ে না।
আমাকে কে কতটুকু জানে? বাবর ভাবল এবং হাসল। বাবর কি সেই জন্যেই এমন একেকটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় যাতে আরো অচেনা হয়ে যায় অপরের কাছে? এতে সে মজা পায়। মনে মনে হাসার সুযোগ হয় আরো। নিজেকে এক নির্বোধের পৃথিবীতে চতুর কোনো যাদুকর বলে মনে হয় তার।
আমি জীবনের যাদুকর এক নির্বোধ পৃথিবীতে।
বাক্যটা নিজের কাছেই খুব চমকপ্ৰদ মনে হলো বাবরের। তার কবরের ওপর লিখে দিলে হয়। বাবর যেন চোখেই এখন দেখতে পেল তার কবর, তার মাথার মার্বেলে লেখা ঐ পরিচিতি, ঐ ঘোষণা, ঐ শব্দ সমূহের অন্তরালে প্রবহমান অট্টহাসি।
আরেকটা সিগারেট ধরাল সে। সিগারেটেও আজকাল আর তেমন স্বাদ নেই। কত রকম ব্ৰাণ্ড বদলেছে, দেশী, বিদেশী, কিন্তু কোনোটাই তাকে তার ক্রীতদাস করতে পারেনি। এখন সে যে সিগারেট খাচ্ছে তার নাম একজন জলদস্যুর নামে রাখা, যে নিউইয়র্ক শহরের পত্তন করেছিল বলে জানা যায়।
কোথায় একটা ঘণ্টা বাজল। নড়েচড়ে বসল বাবর। চোখে কালো চশমা পরে নিল। হাত দুটো জড় করে রাখল স্টিয়ারিংয়ের ওপর।
না, জাহেদাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বাতাসে টুপটাপ করে পড়তে থাকা ফুলের মত মেয়েরা সবুজ মাঠটাকে ভরে ফেলল। কেউ দাঁড়াল। কেউ হাসল। কেউ কেউ একজোট হবার জন্যে হাত টানাটানি করতে লাগল। কেউ অন্য ক্লাশে ঢুকল। এর মধ্যে জাহেদা কই? বাবরের চোখের সমুখে লাল নীল সবুজ হলুদ বেগুনি সাদা কালোর নৃত্য চলছে অত্যন্ত মন্থর তালে। জাহেদা আজ কী রংয়ের জামা পরেছে কে জানে? জাহেদার একটা নীল জামা আছে তার ভারি পছন্দ। আজ যদি সেই নীল জামায় তাকে দেখা যায়, বাবর নিজেকেই একটা শর্ত দিল, আজ তাহলে সে ঠিক এগারটায় জাহেদার কথা মনে করতে করতে ঘুমুতে যাবে।
